• সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১ আশ্বিন ১৪২৫
ads
বৃদ্ধাশ্রমে ঈদ

ছবি : সংগ‍ৃহীত

ফিচার

বৃদ্ধাশ্রমে ঈদ

  • সালেহীন বাবু
  • প্রকাশিত ১৭ আগস্ট ২০১৯

কাঙ্ক্ষিত ঈদুল আজহা পালিত হলো। সবাই কোরবানি দিয়েছেন। ঈদের পরদিন থেকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। পরিবারের সঙ্গে সবাই এই খুশির দিনগুলো কাটিয়েছেন। এভাবেই পরিবারে ছড়িয়ে পড়েছে খুশির আমেজ। অথচ যাদের পরিবারে থেকে ঈদ আনন্দ করার কথা তাদের অনেকেই পরিবার ছাড়া। যারা পরিবার গড়ে দিয়েছেন, সংসারের হাল ধরে সংসারকে একটি পর্যায়ে নিয়ে গেছেন আজ তারা কোথায় ঈদ করছেন?

তারা আজ পরিবার থেকে যোজন যোজন দূরে। ঈদ করছেন নতুন বাড়িতে। যে বাড়িতে তাদের কষ্টের হাহাকার আর বুকফাটা কান্না দেখার কেউ নেই। এমনকি  ঈদের দিনও তাদের চোখ বারবার ভিজেছে। বলছি বৃদ্ধাশ্রমের কথা। বর্তমানে তথাকথিত আধুনিক যুগে যৌথ পরিবার ধারণাটি যেন অনেকটা স্বপ্নের মতো হয়ে গেছে। অনেকেই এখন একসঙ্গে থাকাটা মহা অসুবিধা মনে করেন। ফলে যৌথ পরিবারের ধারণাটা এখন পুরোপুরি ভেঙে গেছে। পরিবার ও সমাজ এমনকি ব্যক্তিবিশেষে হচ্ছে নানাবিধ পরিবর্তন। চাহিদার বৈচিত্র্যায়নে মানুষের দিকদর্শনে আসছে বিভিন্নমুখী নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য। জীবনবোধ সংসারকে করছে দিকভ্রান্ত ও ভিন্নমুখী।

বৈশ্বায়নের প্রভাব, শিক্ষার প্রসার, প্রয়োজনের তাগিদে প্রতিযোগিতা, সামাজিক সমস্যা, অর্থনৈতিক চাপ, দৃষ্টিভঙ্গি, প্রযুক্তির অত্যাধিক উন্নয়ন ও ব্যবহার ইত্যকার অবস্থা মানুষকে সংঘবদ্ধ অবস্থা থেকে ঠেলে দিচ্ছে একক জীবন চালনার দিকে। ওইসব একক ব্যক্তিদের দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। এই অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের একটা বড় অংশের শেষ ঠিকানা হয় বৃদ্ধাশ্রমে।

রাজধানীর অনেক জায়গায় গড়ে উঠেছে বৃদ্ধাশ্রম। এসব বৃদ্ধাশ্রমে সরেজমিন ঈদের দিন গিয়ে দেখা যায় অনেক ভিড়। অনেকেই তার বাবা-মাকে দেখতে এসেছেন। কোরবানির মাংস রান্না করে নিয়ে এসেছেন। অশ্রুসিক্ত চোখে সেই বৃদ্ধ মা-বাবা খাচ্ছেন। কেউ আবার অনেককে দেখতে আসেননি।

কথা হয় একটি বৃদ্ধাশ্রমের বৃদ্ধ মাসুম জোয়ারদারের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। প্রায় দুই বছর হলো বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় হয়েছে এই বৃদ্ধের। এ নিয়ে পরিবার ছাড়া চতুর্থ ঈদ। এই চারটি ঈদে তাকে কেউ দেখতে আসেনি। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে এই বৃদ্ধ বলেন, ‘এই দেশে আমাকে দেখার মতো কেউ নেই। আমার দুই ছেলে এক মেয়ে। ছোট ছেলে ছাড়া সবাই দেশের বাইরে। ছোট ছেলে যারপরনাই ব্যস্ত। ওর পরিবার আবার আমেরিকা থাকে। ঈদের দুদিন আগে ও আমেরিকা চলে গেছে। যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে দেখা করে যায়নি। হয়তোবা ব্যস্ত ছিল।’ বলতে বলতে কেঁদেই ফেললেন তিনি। হয়তো তিনি নিজেই নিজেকে বুজ দিচ্ছিলেন, তার সন্তান হয়তো ব্যস্ততার কারণে আসেননি। আদতে কি তাই। ছেলেটির কি সময় হয়নি বাবাকে একটিবার দেখার। এই প্রশ্নের উত্তর নেই।

মাসুম জোয়ারদারের পাশেই আরেক বৃদ্ধ শুয়ে আছেন। মনে হলো, কিছুটা অসুস্থ। কামাল উদ্দীন (ছদ্মনাম) নামের ওই বৃদ্ধ বলেন, ‘আমার বুকজুড়ে রাজ্যের দুঃখ। মনে পড়ে সুখের সেদিনগুলোর কথা। যখন আমার সন্তান খুব ছোট, ওই সময় সন্তানকে কোলে-কাঁধে করে ঈদগাহে নিয়ে যেতাম। নামাজ পড়তাম সঙ্গে নিয়ে। আজ সেই আদরের ছেলে জীবিত থেকেও কাছে নেই। এর চেয়ে কষ্ট পৃথিবীতে আর নেই। আর কি বলব। ঈদের দিনও ছেলেটি এলো না। সকাল থেকেই পথ চেয়ে বসেছিলাম।’

৭০ বছরের বৃদ্ধ শফিক মোস্তফা (ছদ্মনাম) এক সন্তানের জনক। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। কোনোমতে দুঃখ-কষ্টের মধ্যে সংসার চালিয়েছেন। একমাত্র সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেন। ছেলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। শফিক মোস্তফা বলেন, ‘আজ ৭ বছর ধরে বৃদ্ধাশ্রমে আছি। ছেলে মাঝে মধ্যে ফোনে খবর নিলেও দেখতে আসে না। আমি আমার সেই আদরের ছেলেকে নিয়ে ঈদের আনন্দ আর উপভোগ করতে পারি না। ভেবেছিলাম বৃদ্ধ হলে ছেলে আমার পাশে থেকে একটু সেবা-যত্ন করবে। কিন্তু তা আর ভাগ্যে জুটল না।’

কথা হলো নাসরীন আক্তার নামের এক বৃদ্ধার সঙ্গে। ঈদের দিন থেকে তিনি কিছুই মুখে দিচ্ছেন না। বৃদ্ধাশ্রমে এবারই তার প্রথম ঈদ। বিলাপ করতে করতে নাসরীন বলেন, ‘আমার ছেলে কীভাবে আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়া গেল। আমার ছয় সন্তান। কারো ঘরে আমার থাকার জায়গাটা হলো না। একটি সন্তানও আমাকে দেখতে এলো না। অথচ এই সন্তানদের জন্য প্রত্যেক ঈদে সকালে সেমাই, পায়েস বানিয়েছি। নিজের হাত দিয়ে খাইয়ে দিয়েছি। আমি ঈদে কিছু নেইনি। টাকা জমিয়ে ওদের জন্য আলাদা জামা কিনে দিয়েছি। আর আজ আমার কেউ নেই। হয়তো আমারই দোষ।’

এমন অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা এখন আশ্রয় নিয়েছেন বৃদ্ধাশ্রমে। ছেলে-ছেলে বউদের সঙ্গে অনেকেই থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্বার্থপর আচার-আচরণ, আবার কারো বা অসম্মানজনক আচরণে সন্তানদের সঙ্গে থাকা হয়ে ওঠেনি। বৃদ্ধাশ্রমে জীবন তো কেটে যাচ্ছে। কিন্তু এ জীবনের ভার অনেক বেশি। মাঝে মাঝে যখন সন্তানদের শৈশবের কথা মনে পড়ে, আদর-সোহাগভরা আনন্দময় দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, তখন বৃদ্ধাশ্রমের প্রবীণ মানুষের অন্তর হাহাকার করে ওঠে। আদরের সন্তানদের থেকে দূরে এসে থাকতে হবে, এমন নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, তা তারা কখনোই ভাবেননি। তবে এখনো তারা সন্তানদের ও আপনজনদের পথ চেয়ে থাকেন।

ভাবেন, হয়তো তারা দেখতে আসবে, একটু সময় কাটাবে। অন্তত ঈদের দিনে প্রিয় খাবারগুলো নিয়ে আসবে। কিন্তু তাদের এমন আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে আর পূরণ হয় না। মানুষ দিন দিন কেমন হূদয়হীন হয়ে যাচ্ছে। আদরের সন্তানরা তো এখন সেই হূদয়হীন সমাজেরই সদস্য। বস্তুবাদী এই সমাজের সদস্যরা এখন ভোগ-বিলাসে মত্ত। নৈতিকতা, মানবিকতা, শ্রদ্ধা, সম্মান, ত্যাগ-তিতিক্ষার মতো গুণাবলি থেকে এখন তারা বঞ্চিত। ফলে বিষণ্নতায় ভারাক্রান্ত এখন বৃদ্ধাশ্রমের বাবা-মায়েরা।

যে বাবা-মা এত কষ্ট করে দিনের পর দিন লালন-পালনের মাধ্যমে সন্তানদের বড় করে তোলেন, মানবিক বিবেচনায় তাদের জন্য সন্তানদের এখন কোনো কর্তব্য নেই বলে মনে হয়। যে অভিভাবকরা সন্তানদের আদর-সোহাগে লালন-পালন করে বড় বড় ডিগ্রিধারী করছেন, তাদেরও ভেবে দেখা প্রয়োজন, হূষ্টপুষ্ট সন্তানদের তারা কতটা প্রকৃত মানুষ করতে পেরেছেন?

কাঙ্ক্ষিত বোধোদয় না ঘটলে আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে দুঃখের মাত্রা যে বাড়তে থাকবে তা প্রায় নিশ্চিত। সমাজ আধুনিক হোক। তাতে কারো কোনো আক্ষেপ নেই। কিন্তু বাবা-মার প্রতি অর্পিত দায়িত্ব থেকে আমরা যেন অনেকটাই দূরে। তাদের পথের বোঝা মনে করে বাসায় রাখি না। নিয়ে যাই বৃদ্ধাশ্রমে। সেখানে রেখে আসি। ব্যস ঝামেলা শেষ।

এই বৃদ্ধাশ্রম নিয়েই একটা ছোট গল্প আছে। ছেলেসন্তান তার বউয়ের চাপে মাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসতে বাধ্য হয়। ছেলেটি চিন্তা করে মা না থাকলেও অসুবিধা নেই। বউয়ের মন রক্ষা করতে হবে তো। ছেলেটি মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখার পর বেশ কয়েক মাস আর তার খোঁজ রাখেনি। ঈদের দিন ছেলেটি তার দুই বাচ্চাকে নিয়ে চুপি চুপি মার সঙ্গে দেখা করতে যায়। তার মা অশ্রুসিক্ত চোখে তাকে আদর করে। ছেলেটি খেয়াল করে তার মায়ের হাতটি ঘামে ভিজে গেছে। ছেলেটি রুমে লক্ষ করে দেখে তার মার বিছানা থেকে ফ্যানটা কিছুটা দূরে। যার কারণে তার মায়ের ঠিকমতো বাতাস লাগে না। ছেলেটি লজ্জায় পড়ে যায়। মাকে বলে, ‘মা তুমি আমায় ফোন দিলে আমি ভালো একটা টেবিল ফ্যান কিনে নিয়ে আসতাম।’ উত্তরে মা বলে, ‘তুই ব্যস্ত থাকিস বাবা, তাই ফোন দেইনি।’ বলেই ছেলেটির মা তার দুই নাতিকে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকে। ছেলেটি জিজ্ঞাসা করে, মা তুমি ওদের কাছে পেয়েও এত কাঁদছ কেন? মা বলে, ‘বাবা, আমি ওদের পেয়ে খুশি। আমি কাঁদছি এই ভেবে, তুমি তো আমার মতো গরম সহ্য করতে পার না। হাঁপিয়ে যাও, অস্থির হয়ে যাও। যখন তুমি আমার মতো বৃদ্ধ হবে তখন তোমার ছেলেমেয়ে যদি তোমাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে তখন তুমি কীভাবে থাকবে?’ ছেলেটি কিছু বলতে পারল না। মায়ের সঙ্গে সঙ্গে সেও কাঁদতে লাগল।

আমরা ভুলে যাই বাবা-মার আত্মত্যাগের কথা। তাদের ভালোবাসার কথা। তাদের দূরে সরিয়ে দিই। এটা চিন্তা করি না আমরাও বাবা-মা। আমরা যা করছি আমাদের সন্তানরাও তা শিখবে। আমাদের পরিণতিও এরকম হবে। ভুলে গেলে চলবে না প্রকৃতি কাউকে ক্ষমা করে না।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads