• সোমবার, ৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ফিচার

আমরা করব জয়

  • সালেহীন বাবু
  • প্রকাশিত ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

এমপিউটি! প্রকৃতিগতভাবে কিংবা কোনো দুর্ঘটনায় পড়ে, কমপক্ষে হাতের কবজি কিংবা পায়ের গোড়ালি হারিয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় এ শব্দটি। সোজা বাংলায় বলতে গেলে হাত কিংবা পা কাটা। তাদের নিয়েই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আয়োজন করা হলো ফুটবল ম্যাচ।

শারীরিক এমন অবস্থা নিয়ে মাঠে নামাটা কষ্টসাধ্য। কিন্তু প্রতিবন্ধিত্বের শৃঙ্খলে প্রতিনিয়ত গঞ্জনা সহ্য করে দিনাতিপাত করার যে ব্যথা তার কাছে এই প্রচেষ্টা কিছুই না। আর তাই মাঠে নামাটা তাদের কাছে স্বপ্ন জয়ের সমতুল্য।

গত সোমবার বাফুফে আর্টিফিশিয়াল টার্ফে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রীতি ম্যাচে অংশ নেন ফুটবলাররা। সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে থাকা এসব এমপিউটি ফুটবলারদের একত্র করাটা ছিল চ্যালেঞ্জের। তবে সবার আগ্রহ ছিল বলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ছাদের নিচে আবদ্ধ হয়েছেন সবাই। স্বপ্ন দেখছেন বহু দূর যাওয়ার।

এই ফুটবল খেলায় খেলেছেন বাস্তব জগতের তারকারা। বাস্তব জগতের তারকা মানে তারা জীবনে তাদের প্রতিবন্ধকতাকে ছুড়ে ফেলে একজন সাধারণ ফুটবলারের মতো দাপিয়ে বেড়িয়েছে পুরো মাঠ। এক পায়ের ফুটবলও এত আনন্দময় হয়ে উঠতে পারে! দুর্ঘটনায় যারা এক পা হারিয়েছেন তারাই ফুটবল খেলেছেন আরেক পায়ে। সঙ্গে ছিল স্ক্র্যাচ। তাতে কি দুই দল গোল দেওয়ার জন্য মরিয়া ছিল। তাদের মধ্যে আনন্দ খেলা করছিল। খুশির ঝিলিক দেখা যাচ্ছিল প্রত্যেকটি খেলোয়াড়দের। তারা নানান বয়সের নানান পেশার। কেউবা বা ছাত্র, কেউবা হকারি করে, কেউ বা অটোরিকশা চালায়। এক দুর্নিবার কারণে ছুটে এসেছিল তারা মাঠে। সবাই একসঙ্গে খেলেছিল। এমপিউটি ফুটবলারদের দল গঠনে সারা দেশে বাছাই করা হয় ৫০ জন। সেখান থেকে বাছাইকৃতরা অংশ নেন এই ম্যাচে।

এই খেলার নিষ্পত্তি হয়েছিল কিশোরগঞ্জ থেকে আসা বায়েজিদ বোস্তামীর গোলে, যিনি ক্র্যাচ নিয়ে খেলতেই চাননি। ১৬ বছর বয়সী এই কিশোর নাকি ক্র্যাচ ছাড়া এক পায়ে খেলতে অভ্যস্ত। দুই পায়ের সাংবাদিকদের চ্যালেঞ্জ করে বসেন, ‘আসেন আপনারা, আমার এক পায়ের দৌড়ের সঙ্গে পারেন কি না দেখি!’ সত্যি তাই। গোল করে ক্র্যাচ ফেলে তিনি উদ‌যাপন করেছেন মাঠের এ মাথা থেকে ও মাথায় অবিশ্বাস্য এক দৌড় দিয়ে।

এরপর বলেছেন, ‘ছয় বছর বয়সে আমি এই ফুটবল খেলতে গিয়েই পা হারিয়েছি। বল রাস্তায় চলে গিয়েছিল, সেটা আনতে গিয়ে ট্রাক চলে যায় আমার পায়ের ওপর দিয়ে। তবে এখন ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেটটা বেশি খেলি।’ এত বড় দুর্ঘটনার পরও তার জীবন থেমে থাকেনি।

লালমনিরহাটের রহমতউল্লাহ বাবু পাঁচ বছর আগে পা হারিয়েছেন বাসে উঠতে গিয়ে। কিন্তু হারায়নি তার ক্রীড়া অনুরাগ। ফুটবল, অ্যাথলেটিকস, বাস্কেট বল, সুইমিং সবই তার প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গী।

জামালপুরের ছেলে নাফিউর। ছোটবেলাতে অদম্য সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে ছেলেটি। সেই জামালপুর থেকে ছুটে এসেছে ছেলেটি। ফুটবল খেলেছে সে। জানায়, অনেক ভালো লাগছে। সবাই আমরা এক হয়েছি। এ দেশে আমরাই প্রথম খেলছি। ফুটবল আমার প্রিয় খেলা। আমার পায়ে সমস্যা আছে তাতে কি। আমাকে কেউই ফুটবল খেলা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। কোনো বাধাই আমার কাছে বাধা নয়।

শহীদুল ইসলাম অটোরিকশা চালান। পরিবারের আয়ের একমাত্র মানুষ তিনি। ফুটবল খেলার টানে ছুটে এসেছেন মাঠে। খেলেছেন সবার সঙ্গে। বলেন, আমরা আরো খেলতে চাই। এ এক নতুন এক অভিজ্ঞতা।

আবদুল গণি একজন হকার। হকারি করে চলে তার সংসার। তার পরেও খেলতে চলে এসেছেন। বলেন, স্যার আমার খেইল্যা ভালো লাগছে। এভাবে সবাই কেলা দেখবো ভাবতে পারিনাই।

আর বাংলাদেশের এই এমপিউটি ফুটবল টিমের প্রতিষ্ঠাতা হলেন মো. মহসীন। যার অক্লান্ত পরিশ্রমে এই টিম তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। মহসীন হুইলচেয়ার ক্রিকেট টিমেরও ক্যাপ্টেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে সে জয় করেছে ছোটবেলা থেকেই। তাই কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও তার সাহায্যে এগিয়ে যান মহসীন। স্বপ্ন দেখেন তার হুইলচেয়ার ক্রিকেট টিম যেমন দেশের জন্য আন্তর্জাতিক সম্মান বয়ে এনেছে। ঠিক তেমনি এই ফুটবল টিম যদি পৃষ্ঠপোষকতা পায় তাহলে এই টিমও দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনবে বলে মনে করেন তিনি।

আয়োজনটিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম মুর্শেদী, এমপি। পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স গ্রুপের চিফ এইচআর ও করপোরেট কমিউনিকেশন কর্মকর্তা মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম ও বাংলাদেশ সুইটস ম্যানুফাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ও মুসলিম সুইটসের পরিচালক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান রকি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। এমপিউটি ফুটবল নিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানান, ইমেগো স্পোর্টস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ইমেগো স্পোর্টসের কো-ফাউন্ডার রেজওয়ান উজ জামান। পৃথিবীব্যাপী এমপিউটি ফুটবলারদের আছে বেশ বড়সড় একটি সংগঠন। নিয়মিতভাবে আয়োজিত হয় তাদের বিশ্বকাপও। বাংলাদেশে এই ফুটবলের যাত্রা সবে শুরু হলেও, বাফুফে আশ্বাস দিয়েছে সর্বোচ্চ সহযোগিতার।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads