• মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৭ কার্তিক ১৪২৬
ads

ফিচার

সুঁই-সুতার বুননে চিত্রকর্ম

  • সালেহীন বাবু
  • প্রকাশিত ১৯ অক্টোবর ২০১৯

ইলোরা পারভীন। একজন গৃহিণী। কাজ করেন সূচিশিল্প নিয়ে। যে কোনো ছবি সুঁই-সুতার জাদুকরি বুননে যার হাতে জীবন্ত হয়ে ওঠে, সেই প্রখ্যাত সূচিশিল্পী মিজ ইলোরা পারভীন।

বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের বাড়ি নড়াইলে তার জন্ম। একই গ্রামে হওয়ায় এস এম সুলতান যখন ছবি আঁকতেন, তখন ইলোরা ছিলেন ছোট। এই ছোট্ট মেয়েটি মুগ্ধ হয়ে এই গুণী শিল্পীর চিত্রকর্ম বসে বসে দেখতেন। ভাবতেন, কাকু কীভাবে এত সুন্দর ছবি আঁকছেন, এটা উঁচুনিচু হচ্ছে কী করে, এই যে আলো-ছায়া, এত রঙের খেলা! এই কৌতূহলটা ভেতরে থেকে গেল ইলোরার। 

এরই মধ্যে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পাস করার পর বাড়ি যান ইলোরা। গিয়ে দেখেন এস এম সুলতান মারা গেছেন। সেখানে তার শিষ্য দুলাল চন্দ্র সাহা ছিলেন। ইলোরা দাদাকে তার সেই পুরোনো কৌতূহলের ব্যাপারে খুলে বললেন।

দুলাল চন্দ্র সাহা ইলোরাকে বললেন, ‘তুমি সুতা দিয়ে করতে পার। কালকে আস। আমি তোমাকে সাহায্য করব।’ পরের দিন ফ্রেম, সুতা, বঙ্গবন্ধুর প্রচ্ছদের বইটি নিয়ে গেলেন তিনি। দাদা ইলোরাকে একটি ছবি এঁকে দিয়ে বললেন, এবার তুমি সুঁই-সুতা দিয়ে সেলাই কর। দুলাল চন্দ্র সাহা বললেন, ‘তুমি যখন কাজ করবা তখন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসে করবা। একটা দূরত্ব রেখে করবা। একই আলোতে করবা। যদি আলাদা জায়গায় করি তাহলে ছবির ওপর ওই আলো-ছায়ার প্রভাব পড়বে।’

এভাবেই ১৯৯৯ সাল থেকে সুঁই-সুতার শিল্পে ছবি আঁকা শুরু করলেন ইলোরা। সেই হিসেবে ২১ বছর ধরে কাজ করছেন এই শিল্পী। এ পর্যন্ত মোট ৫৫টির মতো ছবি করেছেন। এগুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবার ছবি, মুক্তিযদ্ধের ছবি, বিভিন্ন দেশের জাতির পিতার ছবি, বাংলাদেশের শিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লার ছবি। ক্রিকেটারদের মধ্যে ছবি করেছেন মাশরাফি, সাকিব আল হাসানের।

বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন উপলক্ষে ইলোরা ৭ ফুটের একটি ছবির কাজ করছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চিন্তা করলাম বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আছে। তাই আমি ৭ ফুটের একটি ছবি করছি। এটা আমার গিফট। জন্মদিন যেহেতু সেহেতু সুতার রং লাল নির্বাচন করেছি। তারপর লাল কাপড়ের ওপর ৭ ফুটের বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতা আর তার পাঁচ ছেলেমেয়ে। মোট ৭ জনের ছবি। ছবিটি প্রায় শেষের দিকে। দেশ স্বাধীন করার জন্য বঙ্গবন্ধু যে অবদান রেখেছিলেন, তার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আমি তার ছবি করি। এই মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই হয়েছে। তিনিই স্বাধীন করেছেন।’

সূচিশিল্পে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ইলোরা বলেন, ‘প্রতিটি জাতির একটা নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব ঐতিহ্য থাকে। একটা ভিত থাকে। আমাদের দেশের সংস্কৃতির যে গোড়া সেটাই সূচিশিল্প। এখন তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিয়েছেন। সুইচ দিলেই ফ্যান, এসি সব চলে। একসময় আমাদের দাদি-নানিদের ফ্যান ছিল না। তখন তারা গাছের নিচে বসে একটি পাটি বিছিয়ে বসে গল্প করতেন আর কাঁথা সেলাই করতেন। এই যে ঐতিহ্য, এটা যেন বিলুপ্ত না হয়ে যায়। এটা আমি আধুনিকায়ন করেছি। আমি সূচিশিল্পকে এজন্য ধারণ করি যেন আমার দেশের শিল্প-সংস্কৃতি হারিয়ে না যায়। এভাবেই এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে চাই। আমার ভিত যেন হারিয়ে না যায়।’

স্বাভাবিক চিত্রকর্মের সঙ্গে সূচিশিল্পের চিত্রকর্মের পার্থক্য বিষয়ে ইলোরা বলেন, ‘রঙের ব্যাপারে একটা ফর্মুলা থাকে। হলুদ-নীল মেশালে একটা রং হবে, লাল-কালো মেশালে আরেকটা রং হবে। কিন্তু সুতায় এলে কোনো রং নেই। এটা আমার চিন্তা-ভাবনা করে করতে হবে। আমার একদম ভালো লাগা নিয়ে করতে হবে, একদম ওর ভেতরে মিশে যেতে হবে। এখানে আমাকে নিজের সবকিছু আবিষ্কার করতে হবে যে রংটা আলো-ছায়ার কাজ কীভাবে করব। যেমন একটা ছবির কাজ আমি ঘরের বাইরে বসে করছি। কিছুক্ষণ পর যখন আমি ছবিটি ঘরের ভেতর গিয়ে করব, তখন দুই অবস্থানের মধ্যে আলো-ছায়ার পার্থক্য থাকবে। রংও পরিবর্তন হয়। আমার সুতার ভেতরও ওই একই কালার চলে আসে।’

সূচিশিল্পের একটি চিত্রকর্ম তৈরি করতে কয়দিন লাগে- এমন প্রশ্নের জবাবে ইলোরা বলেন, ‘প্রথমদিকে আমার একটা ছবি সেলাই করতে ছয় মাস-সাত মাস সময় লাগত। আর এখন সময় কমে আসছে। এখন আমি সময় ভাগ করে নিয়েছি। আমি প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা সেলাই করি। এভাবে ১০-১২ ঘণ্টা প্রতিদিন করলে ২২-২৯ সাইজের একটি ছবি করতে আমার দেড়-দুই মাস লেগে যায়। ছবি আঁকতে যথেষ্ট ধৈর্য, সময়, চিন্তা করতে হয়। এখন আমি যখন একটা মুখ, হাত করি- একা বসে কাজ করি। এটা অনেকটাই সেনসিটিভ। যেমন আমি কিছুদিন আগে মাশরাফি বিন মুর্তজার ছবির কাজ করছিলাম। দেখি একটি চোখ আঁকাবাঁকা হয়ে গেছে। পরে এটি ঠিক করতে পারছিলাম না। একসপ্তাহ পর সুঁইয়ের একটি ফোঁড় দিলাম। দেখলাম সব ঠিক হয়ে আছে। চিত্রশিল্পীদের ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে। তারা ইচ্ছে করলে ছবি পরিবর্তন করতে পারে। এই সুঁই-সুতা দিয়ে ছবি আঁকতে গেলে কোনো স্বাধীনতা নেই। যা করতে হবে খুব ভেবেচিন্তে। আমি ছবিটা এঁকে নিই। বা যে ছবিটি আঁকব তা একটা স্ট্যান্ডের ওপর রাখি। সেলাই করতে গিয়ে এমন কিছু কিছু জায়গা আছে, যেখানে লাইনে লাইনে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমি যে ফ্রেমে করি, এজন্য আগে ছাপ দিয়ে নিই। তাহলে ফ্রেমের ভেতর লাইন থাকে। আমি যে ফোঁড় দিচ্ছি, চিন্তা করি- পরের ফোঁড় ওভাবে দিই। অনেকে বলেন, আপনি শেখান না কেন? এটা একদম নিজস্ব মেধা দিয়ে করতে হবে।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads