• শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ইলেকট্রনিক বার্তা

প্রতীকী ছবি

ফিচার

ইলেকট্রনিক বার্তা

  • প্রকাশিত ১৯ নভেম্বর ২০১৯

এক.

জিহান দেশের স্বনামধন্য একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করে। এখানে কাজের প্রেশার অনেক বেশি। কিন্তু পছন্দের কাজ হওয়ায় এটি জিহানের কাছে প্রেশার মনে হয় না; বরং প্লেজার-এর বিষয়। জিহানকে লিনাক্সসহ নানা অপারেটিং সিস্টেমে কাজ করতে হয়। অফিসে বসেই বন্ধ, চালু, রিস্টার্ট করা যায় শত-সহস্র কিলোমিটার দূরের সার্ভার! লিনাক্সের এসব কমান্ড নিয়ে, যন্ত্র নিয়ে কাজ করতে জিহান ভালোবাসে। জীবন না থাকলেও যন্ত্র কমান্ড শোনে, নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করে, নিয়মমাফিক চলে। মানুষের সমাজের মতো নিয়ম না মানার চল, কথা না রাখার রীতি যন্ত্রের সমাজে নেই।

কোনো মানুষ ভালোবাসে অন্যদের সঙ্গে আড্ডা জমাতে, কেউ ভালোবাসে ভবঘুরে হয়ে প্রকৃতির মাঝে বুঁদ হয়ে থাকতে, জিহান ভালোবাসে যন্ত্রের সঙ্গে কাজ করতে। প্রকৌশল বিভাগে কাজ করায় মাঝে মাঝে তাকে রাতে কাজ করতে হয়। রাতের কাজগুলোকে বলে ‘প্ল্যানড ওয়ার্ক’। রাতের বেলায় কাজ করার ক্ষেত্রে সে অন্যরকম আনন্দ পায়। এক ধরনের ঘোরের মধ্যে চলতে থাকে কাজ। আঁধার রাতে কাচের তৈরি অফিস ভবনের পঞ্চম তলায় একাই কাজ করে জিহান। কাচের ভবন থেকে বাইরে তাকালে রাতের শহর দেখা যায়। জিহানের ল্যাপটপের একপাশে রাখা থাকে পিৎজা, হেজেল বাদাম দেওয়া কাপুচিনো কফি; অন্যদিকে থাকে কেক আর কোল্ড ড্রিংক-এর ক্যান। খাবার ও পানীয় চলতে থাকে; সঙ্গে চলতে থাকে বিভিন্ন সার্ভারে ঢুকে নানা কমান্ড। কখনোবা রাতের কাজে সঙ্গী থাকে; তবে শারীরিকভাবে তারা উপস্থিত থাকে না। স্কাইপে-এর মাধ্যমে তাদের সঙ্গে জিহানের চ্যাটিং চলতে থাকে কাজের অগ্রগতি নিয়ে। সেসব ইঞ্জিনিয়ার বসে থাকে মালয়েশিয়া, সুইজারল্যান্ড বা নরওয়েতে। এমন ছন্নছাড়া জীবনেরই প্রেমে পড়ে গেছে জিহান।

আজ রাতে জিহানের ‘প্ল্যানড ওয়ার্ক’ আছে। পঞ্চমতলায় একমনে একাকী কাজ করে চলেছে সে। হঠাৎ তার ইনবক্সে একটি ই-মেইল এল। এত রাতে কে ই-মেইল পাঠাল দেখতে গিয়ে জিহান বেশ অবাক হলো। অদ্ভুত নামের এক ব্যক্তি ই-মেইল পাঠিয়েছে। ভদ্রলোকের নাম উষ্টা-বিষ্টা! নানারকম স্প্যাম মেইল আসে জিহানের অ্যাকাউন্টে। সেসব ই-মেইলের বিষয়বস্তু খুব মজার। যেমন : কোনো লটারিতে নাকি সে মিলিয়ন ডলার পেয়ে বসে আছে, বিদেশের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নাকি তার লক্ষকোটি ডলার পড়ে আছে অথবা কোনো এক প্রতাপশালী জমিদারের সে নাতি এবং উত্তরাধিকার সূত্রে ঘর-বাড়ি-দ্বীপ পেতে যাচ্ছে অচিরেই! এসব ই-মেইল এখন আর খুলেও দেখে না জিহান; কিন্তু আজকে কেন যেন তার আগ্রহ হলো। ই-মেইল খুলে ইংরেজিতে যা লেখা দেখল, তা পড়ে জিহান হতভম্ব। চিঠির তর্জমা করলে দাঁড়ায় এমন :

জনাব জিহান,

বিভিন্ন অপারেটিং সিস্টেমের প্রতি তোমার উদারতা, নানা সার্ভারের প্রতি তোমার দয়ার্দ্র মনোভাব, হরেক রাউটার-এর প্রতি তোমার উষ্ণ আচরণ, সুইচের প্রতি তোমার মমতা, সর্বোপরি যন্ত্রের প্রতি তোমার ভালোবাসা দেখে আমরা আপ্লুত। আমি তোমাদের সৌরজগতের প্লুটো গ্রহেরই এক স্বল্পবেতনভোগী কলেজশিক্ষক। এ ছাড়া আমাকে একজন একনিষ্ঠ আন্দোলনকারীও বলতে পারো। পৃথিবীবাসীরা প্লুটোকে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সময় মর্যাদাক্ষুণ্নের জন্য আমি এ গ্রহে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। যা হোক, তোমাকে আমার বাসায় একদিনের অতিথি হিসেবে পেলে ধন্য হব। তোমাকে আমাদের কিছু প্রযুক্তি দেখাতে চাই এবং সেইসঙ্গে একটি বিশেষ অনুরোধ করতে চাই। তুমি আঠারো ঘণ্টার মধ্যে সম্মতি দিলে কৃতার্থ হব। এ গ্রহের আসার ব্যবস্থা আমিই করব।

ইতি,

তোমার ভিনগ্রহী শুভাকাঙ্ক্ষী

প্র. উষ্টা-বিষ্টা, এমটিটিএফ, জিটিপি।

পুনশ্চ : শুধু আমি নই; আমার স্ত্রী কষ্টা-দষ্টা এবং আঠারোটি ছেলেমেয়ে তোমার প্রতীক্ষায় দিন গুনছে। আশা করি, তুমি একটি পরিবারকে হতাশায় নিমজ্জিত করবে না। একটি ছোট অনুরোধ, তুমি তোমার নিজের জন্য তিন বেলার খাবার সঙ্গে নিয়ে এলে চিরকৃতজ্ঞ হব। কারণ, আমরা অ্যানার্জি ট্যাবলেট খেয়ে বাঁচি। তবে অ্যানার্জি ট্যাবলেটে যদি তোমার অ্যালার্জি না থাকে, তাহলে খাবারের চিন্তা করতে হবে না।

স্প্যাম মেইলের এমন বিষয়বস্তু জিহান আগে কখনো দেখেনি। লেখাটি পড়ে সময় নষ্ট করার জন্য জিহান কিছুটা অনুতপ্ত। ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারত যদি ই-মেইলে সংযুক্ত ছবিটা তার চোখে না পড়ত। ছবি খুলতেই জিহানের মাথা ঘুরে গেল। এ কী অবস্থা! কতগুলো এলিয়েন চোখ গোলগোল করে তাকিয়ে আছে। ‘এটাই কি তবে উষ্টা-বিষ্টা এবং কষ্টা-দষ্টা দম্পতির পুরো পরিবারের ছবি?’ জিহান নিজেকেই প্রশ্ন করল। আবার উত্তরও দিল সে নিজেই, ‘এ হতে পারে না। কোনো ফাজিল ছেলে হয়তো বেকুব বানানোর জন্য অ্যানিমেশন মুভি থেকে এই স্টিল ছবিটা তৈরি করে পাঠিয়েছে।’ কিন্তু অ্যানিমেশন মুভির বিশাল ভক্ত জিহান এমন দৃশ্য বা প্রাণী আগে কখনোই দেখেনি!

সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। তাই ই-মেইল বন্ধ করে কাজে মনোযোগ দিতে যাবে, এমন সময় জিহান দেখল, সেখানে ছবি ছাড়াও একটি ভিডিও সংযুক্ত করা আছে। ভিডিওটির সাইজ খুব কম দেখে ডাউনলোড করল সে। অফিসের নেটওয়ার্ক (ল্যান)-এর মাধ্যমে ডাউনলোড করতে এক সেকেন্ডের কম সময় লাগল। কিন্তু ভিডিওটি ওপেন করে তার দৈর্ঘ্য দেখে জিহান চরমভাবে বিস্মিত হলো। আশি ঘণ্টার ভিডিও! ভিডিও চালু করল সে। বিস্ময়ের ওপর বিস্ময়! উষ্টা-বিষ্টা পরিবারের পুরো একদিনের সম্পূর্ণ কার্যক্রম ভিডিওতে আছে। অদ্ভুত সব যন্ত্রপাতি; বিচিত্র পরিবেশ; সর্বোপরি আজব দেখতে এলিয়েন পরিবার! ঝকঝকে ভিডিওর কোয়ালিটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ মানের ভিডিওকে হার মানাবে। জিহান এটুকু বুঝতে পারছে, এটি কোনো দুষ্টলোকের স্প্যাম ই-মেইল না; তবে এটি সে বুঝতে পারছে না কীভাবে পৃথিবীর ই-মেইল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এটি পাঠানো হলো। তাছাড়া ভিডিওতে এলিয়েনদের ভাষা অন্যরকম, সেক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষায় কীভাবে ই-মেইল লেখা হলো! যাহোক, পরে ভেবেচিন্তে রিপ্লাই দেবে, এটি ভেবে জিহান কাজে মনোনিবেশ করল।

দুই.

রাতে কাজ করায় পরদিন জিহানের আর অফিস নেই। তবে ঘুমের পর তার আর ই-মেইলের কথা মনে রইল না। অবশ্য মনে পড়ল দুদিন পরই। তাড়াতাড়ি ল্যাপটপ নিয়ে বসল জিহান। ভিনগ্রহ বেড়ানোর কথা কল্পনা করতেই তার মন ফুরফুরে হয়ে উঠছে। মেইল অ্যাকাউন্টে ঢুকে উষ্টা-বিষ্টার ইলেকট্রনিক বার্তাটি খুঁজে বের করল সে। রিপ্লাই অপশনে গিয়ে গুছিয়ে বড়সড় একটা উত্তর লিখল। তারপর সেন্ড বাটনে ক্লিক করতেই লেখা উঠল, ‘টাইম আউট!’ জিহান আবার চেষ্টা করল। কাজ হলো না। কয়েকবার চেষ্টা করল। বারবার একই লেখা দেখাচ্ছে, ‘টাইম আউট।’ হঠাৎ জিহানের মনে পড়ল, চিঠিতে আঠারো ঘণ্টার মধ্যে রিপ্লাই দেওয়ার কথা লেখা ছিল! সেদিনের পর থেকে জিহানের মনে এক ধরনের হাহাকার তৈরি হয়েছে। নানাভাবে চেষ্টা করেও উষ্টা-বিষ্টার সঙ্গে সে আর যোগাযোগ করতে পারেনি। আবার উষ্টা-বিষ্টার কাছ থেকেও অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বার্তা আসেনি। কে জানে, উষ্টা-বিষ্টা জিহানকে ভুল বুঝল কি না। কারণ যা-ই হোক, মহাবিশ্বের ইতিহাসের প্রথম মানুষ এলিয়েনের সাক্ষাৎকারপর্বটি হয়তো পিছিয়ে গেল হাজার বছরের জন্য!

লেখক: আসিফ মেহ্দী

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads