• শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ১০ মাঘ ১৪২৬
জাবির লেকে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে অতিথি পাখি

ছবি : বাংলাদেশের খবর

ফিচার

জাবির লেকে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে অতিথি পাখি

  • শাহিনুর রহমান শাহিন, জাবি প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

ভোরের সূর্যটা পূর্ব আকাশে ওঠার অনেক আগেই কিচিরমিচির কলতান ক্যাম্পাসের চারদিকে। মনোমুগ্ধকর ডাকে ঘুম থেকে জেগে তুলছে ঘুমিয়ে থাকা আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের। অতিথিদের শ্রুতিমধুর ডাকে হৃদয়ে ওঠেছে মুগ্ধকর স্পন্দন। হাজারো পাখির মিলনমেলা, পাখি পাখা ঝাপটানো অবাক করে সবাইকে। সারাদিন পাখির কলকাকলিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও পথচারী সহ সবার মনে দোলা দেয় উৎফুল্লতা। যেদিকে তাকানো যায় শুধু দৃষ্টিনন্দন বৈচিত্র্যময় অতিথি পাখির বিচরণ। যেন পাখির স্বর্গরাজ্য পরিণত হয়েছে পুরো ক্যাম্পাস! 
    
বলছি নয়নাভিরাম সবুজ শ্যামল প্রকৃতির লীলাভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকে হাজারো অতিথিদের মিলনমেলার গল্প! ইট পাথর আর কংক্রিটের শহর ঢাকা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমটার দূরে সাভারের কোলঘেঁষে স্নিগ্ধ সবুজ ক্যাম্পাসটির অবস্থান। লাল ইটের রাজ্যের মাঝে যেন এক টুকরো সবুজ স্বর্গ। চারদিকে শীতের আমেজ। শীত আসা মানেই প্রাকৃতিক সৌন্দের্যের লীলাভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দূর দেশের পাখিদের আগমন শুরু হওয়া। এই দূরদেশী পাখিদের ক্যাম্পাসিয়ানরা আদর করে “অতিথি পাখি” বলে ডাকে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবারের মত এবারও সুদূর সাইবেরিয়া, হিমালয়, নেপাল, মঙ্গোলিয়া, সিনচিয়াং ও চীনের আশপাশের শীত প্রধান দেশ থেকে এসেছে হাজারো শীতের অতিথি পাখি। বাংলাদেশে আসা পাখিদের ৮-৯ শতাংশ এই ক্যাম্পাসে আসে। এবার পাখিদের আগমন হয়েছে কেমন জানি অন্যভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন থাকার কারণে ক্যাম্পাস অনিদির্ষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকার মুহুর্তে নিরব ক্যাম্পাসে অনেকটা অনুপ্রবেশ ঘটেছে তাদের। একদমেই ক্যাম্পাসের প্রাণভোমরা শিক্ষার্থীবিহীন ফাঁকা ক্যাম্পাস আগন্তুক প্রবেশ পরিযায়ী পাখিদের। পরে অল্প কিছু দিনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফেরায় এক আনন্দঘন পরিবেশে প্রাণ ফিরে পেয়েছে জাবি ক্যাম্পাস। এর সাথে পালক বিছিয়ে দিয়েছে অতিথিরা। এখন যেন জাবি ক্যাম্পাস পাখির রাজ্য। দিনব্যাপী ক্যাম্পাস মুখর থাকে পাখির কলকাকলিতে। ক্যাম্পাসে ১৮-২০ টি লেকের মধ্যে প্রধানত ৪/৫ টি লেকে ছোট ছোট আসর বসিয়ে আছে শত শত পাখি। আপন খেয়ালে পানিতে ডুবছে তো ফূড়ুত করে উড়াল  দিচ্ছে আকাশে, কেউ আবার পালকের ভিতর মুখ গুঁজে পোহায় মিষ্টি রোদ। 

অতিথি পাখিদের ভালোবাসার টানে ক্যাম্পাসবাসীদের পাশাপাশি  প্রতিদিন ভীড় করছে অসংখ্য দর্শনার্থী। ছুটির দিন গুলোতে ভীড় যেন চোখে পড়ার মতো। রাজধানী থেকে পাখিপ্রেমীরা হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসা অতিথিদের দেখতে কাজের ফাঁকে একটু সময় পেলেই চলে আসে এই সবুজ ক্যাম্পাসে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট বড় প্রায় ১৮/২০ টি লেক রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম লেক গুলোতেই এবার পাখি বসেছে। প্রীতিলতা হলের পেছনের লেক, চৌরঙ্গী সংলগ্ন লেক, সুইমিং পুল সংলগ্ন ও প্রশাসনিক ভবন সংলগ্ন লেকে পাখির আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। 

জলচর কিংবা ডাঙ্গাবাসী নয় ডানায় ভর করে আসা এই পাখি গুলোর নামও বাহারি। পাতিসরালি,বড় সারলি,পাতারি, ফ্লাইক্যাচার,গার্গেনি,পান্তামু খী,পাচার্ড,ছোট জিরিয়া,মুরগ্যাধি,কোম্বডাক,খয়রা ,বামুনিয়া হাস,লালা গুড়্গুটি অন্যতম।
   
প্রানীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোঃ কামরুল হাসান জানান, "১৯৮৬ সালে পাখি আসা তথ্য পাওয়া গেলেও ১৯৮৮ সাল থেকে নিয়মিত আসছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান ১৯৮ প্রজাতির পাখি মেলে যার মধ্যে আছে প্রায় ৭০ প্রজাতির দূরদেশী পাখি। নভেম্বরের মাসের শুরুতে পাখি আসা শুরু হয়। সবচেয়ে লেকে বেশি পাখি দেখা যায় ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে। মার্চের শেষে তারা আবার আপন ঠিকানায় পাড়ি জমায়। 

পাখিদের নিরাপত্তার জন্য প্রশাসন পক্ষ থেকে দেখা গেছে একাধিক ব্যবস্থা। লেকের পাশ দিয়ে লোহার তারের ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন পোষ্টার দিয়ে লেখা আছে পাখিদের বিচরণ ক্ষেত্র, লেকের ভেতরে প্রবেশ  ও লেকের পাড়ে পার্কিং নিষেধ অযথা হর্ণ বাজাবেন না, পাখিদের দিকে ঢিল ছুড়বেন না ইত্যাদি। তবে পাখিদের অাবাস্থলে যে ধরনের নিরাপত্তা প্রয়োজন তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়াও লেকে ময়লা, খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ, কচুরিপানার স্তূপ রয়েছে। পাখিদের নিরাপদ আবাস্থল, মানসম্মত খাবার ও সার্বক্ষণিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন শিক্ষার্থীরা। 
শুধু ক্যাম্পাসবাসী নয় দূর দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা এখানে এসে এই পাখি গুলোর প্রেমে পড়ে যায়। কেউবা তাদের আবেগ গুলো ভাগাভাগি করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে মনের ভাব প্রকাশ করে,”অতিথির সাথে একদিন”, “অতিথি পাখির কলতানে মুখরিত আমরা” এইভাবে।

আর যারা পাখি প্রেমী তারাতো নিঃসন্দেই এই অতিথিকে নিয়ে কবিতা বানিয়ে ফেলে।

শীতের এই দূরদেশী পাখি গুলো জাবির অতিথি। তাদের প্রতি আন্তরিক হওয়া সবার দায়িত্ব কেননা এই অতিথি পাখি গুলো সবার মনে অনাবিল আনন্দ দেয়। এছাড়াও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তাদের অবদান তো আছেই! শহুরে জীবনের কষাঘাত থেকে একটুখানি আপন মনে পাখিদের নিয়ে সময় কাটানোর জন্য এখনই উপযুক্ত সময়। পাখি ডেকে যায় পাখিপ্রেমীদের পাখা ঝাপটানোর সাথে সুমিষ্ট সুরে!

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads