• শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব

সংগৃহীত ছবি

ফিচার

ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব

  • প্রকাশিত ১৮ জানুয়ারি ২০২০

সেরাজুম মনিরা

 

 

আকাশে রঙের ছটা, উড়ছে হাওয়ায় ঘুড়ি। বিভিন্ন রং ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে। কতই না রং খেলা করছে আকাশে। এমনই এক দৃশ্যের দেখা মেলে সাকরাইন উৎসবে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব ঘিরে আগন্তুকের মনে রয়েছে নানা কৌতূহল। তাই তো উৎসবটিতে শামিল হতে পুরান ঢাকায় ভিড় জমান অনেক পর্যটক।

পৌষ মাসের ঠিক শেষের দিনটিতে উৎসবে মাতেন সবাই। পৌষসংক্রান্তির শেষ দিনেই পালিত হয় সাকরাইন উৎসব। প্রতিবছর ১৪ বা ১৫ জানুয়ারি পৌষসংক্রান্তিকে ঘিরে লোকজন ঘুড়ি উৎসবে মেতে ওঠে। এদিন নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি পিঠাপুলি খেয়ে ঘুড়ি উড়িয়ে উৎসব পালনের এই রীতি বহু পুরনো। প্রায় ৪০০ বছর ধরে এদেশে পালিত হচ্ছে সাকরাইন উৎসব।

ঘুড়ি উৎসব এদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী একটি উৎসব। এখন খোলা মাঠের স্বল্পতায় সবাই বাসাবাড়ির ছাদেই সাকরাইন উৎসবটি পালন করে থাকে। পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জমজমাটভাবে সাকরাইনে ঘুড়ি উৎসব পালিত হয়।

ঘুড়ি উড়ানোর জন্য এলাকার সবচেয়ে বড় দালানটি খুঁজে বের করা হয়। সেখানে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ জন ঘুড়ি উড়ানো প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে কে কার ঘুড়ি কাটতে পারে সেই প্রতিযোগিতা চলতে থাকে ছাদগুলোতে। তাদের উৎসাহ জোগাতে উপস্থিত থাকেন বয়স্করাও। ঘুড়ি কাটলে ভো-কাট্টা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে যায় চারদিক।

এই উৎসবে নারীদের অবদান চোখে পড়ার মতো। তারা পরিকল্পনা করেন কীভাবে উৎসবকে আরো সুন্দর করা যায়। চালের গুঁড়া দিয়ে ঘুড়ি তৈরি আঁঠা তৈরি করে থাকেন মায়েরা। দুধপুলি, সেমাই, চিতই পিঠা, মালপোয়া, চুষি, পাটিসাপটা, দুধ চিতইসহ মিষ্টি ও ঝাল খাবার উৎসবের আমেজকে আরো বাড়িয়ে তোলে।

সাকরাইন উৎসবে ঘুড়ি উড়াতে প্রয়োজন হয় চিকন সুতা ও পাতলা কাগজের ঘুড়ি। ঘুড়ি যত হালকা হবে সেটি উড়বেও দ্রুত। এ উৎসবে ঘুড়ি উড়ানোর বদলে অন্যের ঘুড়ির সঙ্গে টেক্কা দিতেই ব্যস্ত থাকেন প্রতিযোগীরা। সুতায় সুতায় প্যাঁচ লাগিয়ে কাটার চেষ্টায় মেতে থাকেন তারা।

আবার কেটে যাওয়া এসব ঘুড়ির অপেক্ষায় ছোটরা চিকন বাঁশ নিয়ে ঘুড়ে বেড়ায়। এই চিকন বাঁশকে লগি বা লগগি বলে। তারা প্রথম দিন ঘুড়ি ধরে জমায় এবং দ্বিতীয় দিন এ ঘুড়িগুলো উড়ায়। এ প্রতিযোগিতায় সুতাটাই অন্যতম। ঘুড়ির সুতাকে মজবুত ও ধারালো করতে মাঞ্জা দেওয়া হয়।

নির্ধারিত সময়ের পর রিল থেকে সুতা নাটাইয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়। শিরিষের আঁঠার জন্য সুতার সঙ্গে সুতা যেন না লেগে যায় তার জন্য রিল থেকে নাটাইয়ে সুতা যাওয়ার মধ্যপথে দুজন সুতায় চূর লাগিয়ে দেয়। মাঞ্জা দেওয়া শেষ হলে এ সুতা শুকানোর জন্য সব সুতা ছেড়ে দিয়ে ঘুড়ি উড়ানো হয়। এ সময় তারা কারো সঙ্গে কাটাকাটি খেলে না। সাকরাইনের ৩ থেকে ৪ দিন আগে মাঞ্জা দেওয়া হয়।

সাকরাইন উৎসবের জন্য পাতলা কাগজ বা পলিথিন দিয়ে ঘুড়ি তৈরি করা হয়। ছোটরা পলিথিনের ব্যাগ কেটে নারকেল পাতার শলা দিয়ে ঘুড়ি তৈরি করে। আর বড়দের জন্য দোকানিরা পাতলা কাগজ ও বাঁশের পাতলা চটি দিয়ে ঘুড়ি তৈরি করে। এদিন আকাশে উড়ে চোখদ্বার, মালাদ্বার, পঙ্খীরাজ, চশমাদ্বার, কাউঠাদ্বার, চাপালিশ, চানদ্বার, এক রঙা ইত্যাদি ঘুড়ি।

এমনকি জাতীয় পতাকার রঙেও ঘুড়ি তৈরি করা হয়। তবে ঘুড়ির চেয়েও চোখ ধাঁধানো হয় এর লেজ। অনেক আকৃতির ও রং-বেরঙের হয়ে থাকে। ঘুড়ির সঙ্গে সঙ্গে নাটাইগুলোর নামও বেশ মজাদার। বাটিওয়ালা, মুখবান্ধা, মুখছাড়া ইত্যাদি। পাতলা ঘুড়ি ভালো হলেও নাটাই যত ভারী হবে ঘুড়ি উড়াতে তত ভালো হয়।

পুরান ঢাকার ঘুড়িপ্রেমীরা সারা দিন ঘুড়ি উড়িয়ে সন্ধ্যায় সব ঘুড়ি, নাটাই, সুতা, লগি সব উপকরণ দিয়ে আগুন জ্বালান। এ সময় তারা আতশবাজি পোড়ায় ও মুখে কেরোসিন তেল নিয়ে আগুন দিয়ে চমৎকার এক ধোঁয়ার কুণ্ডলী তৈরি করে, যা গোল হয়ে আকাশের দিকে উড়ে যায়। সেই সঙ্গে ফানুসও উড়ানো হয়। পুরান ঢাকার এ উৎসব ছড়িয়ে পড়ে পুরো রাজধানীজুড়ে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads