• বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads

ফিচার

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

জন্মের ১৯৬তম বছর

  • প্রকাশিত ২৫ জানুয়ারি ২০২০

সেরাজুম মনিরা

 

 

আজ ২৫ জানুয়ারি, বাংলা সাহিত্যের অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মদিন। ১৮২৪ সালের এই দিনে যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই বাঙালি কবি ও নাট্যকার। তাকে বাংলার নবজাগরণ সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব গণ্য করা হয়।

বাঙালি কবি মধুসূদনের হাত ধরেই আজকের বাংলা কাব্যের আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছে। বাংলা কাব্যে আধুনিকতা, বাংলা মহাকাব্যে বিপ্লবের সুর-ছন্দ। কুসংস্কার ধর্মান্ধতার প্রতিবাদে বিদ্রোহের অগ্নিশিখা কবি মধুসূদনের রচনায় খুব সচেতনভাবেই উঠে এসেছে।

সাগরদাঁড়ি গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ‘কপোতাক্ষ নদে’র সঙ্গে মিলেমিশে শিশু মধুসূদন ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠেন। আজকালের সাক্ষী হয়ে এখনো ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে মধুসূদনের স্মৃতিবিজড়িত কপোতাক্ষ নদ। মূলত ‘কপোতাক্ষ নদ’ রচনা করে কবি মধুসূদন তার জন্মভূমির একটি নদীর এবং স্বদেশের প্রতি অপার প্রেম গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ দেখিয়েছেন এবং প্রকাশ করেছেন। এই কবিতায় স্বদেশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কৃতজ্ঞতাবোধ, মমত্ববোধের মধ্য দিয়ে কপোতাক্ষ নদের যে জল, তার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

পিতা রাজনারায়ণ দত্তের কাছ থেকে শিশু মধুসূদন মেধা মনন জ্ঞান আহরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনি তার মাতা জাহ্নবী দেবীর কাছ থেকেই পাঠ শিক্ষা নিয়েছিলেন। যা পরবর্তী সময়ে কবি প্রতিভা বিকাশে মেধা সমৃদ্ধিতে প্রেরণা জুগিয়েছিল। ছেলেবেলায় নিজ গ্রামের এক পাঠশালায় শিশু মধুসূদনের শিক্ষাজীবন শুরু হয়। কিন্তু গায়ের পাঠশালায় শিশু মধুসূদন বেশিদিন লেখাপড়া শিখতে পারেননি। কারণ, পিতা রাজনারায়ণ দত্ত কর্মের জন্য তার পরিবার-পরিজন নিয়ে কলকাতায় খিদিরপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। এখানে এসে কিশোর মধুসূদনকে প্রথমে লালবাজার গ্রাম স্কুল পরে হিন্দু কলেজের জুনিয়র শ্রেণিতে ভর্তি করে দেওয়া হয়। সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর।

কলকাতায় হিন্দু কলেজে পড়ার সময় রিচার্ডসন ও ডিরোজিও নামে দুইজন ইংরেজ পণ্ডিতের সঙ্গ পেয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে, কবি মধুসূদন তার এই প্রিয় দুই পণ্ডিতের অন্ধভক্ত ছিলেন।

ছাত্র হিসেবে মধুসূদন বরাবরই ভালো ছিলেন, কৃতী ছাত্র হওয়াতে তিনি বৃত্তিও পেয়েছিলেন। এমনকি তিনি নারী শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে বিগত ১৮৪২ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। আর এ জন্য তিনি স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। হিন্দু কলেজে পড়া অবস্থায় কবি মধুসূদনের জীবনে এক বাক পরিবর্তন হয়। তিনি ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিলেন। এ সময় কবির মনেপ্রাণে বিশ্বাস জন্মেছিল, ভবিষ্যতে বড় কবি হতে হলে ইংরেজি সাহিত্যচর্চার কোনো বিকল্প নেই।

কবি মধুসূদন বিগত ১৮৪৩ সালে ৯ ফেব্রুয়ারি তার বাপ-দাদার ধর্ম হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নতুন করে মাইকেল মধুসূদন দত্ত নাম ধারণ করেন। কবি মধুসূদন কলকাতার শিবপুরে বিশপস কলেজে ভর্তি হন। এরপর বিশপস কলেজ ত্যাগ করে তিনি ১৮৪৮ সালে মাদ্রাজে চলে যান। সেখানে তিনি একটি বিদ্যালয়ে ইংরেজি শিক্ষকতার পদে চাকরি নেন। এখানেই থাকা অবস্থায় তিনি ইংরেজিতে কবিতা ও প্রবন্ধ লিখে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। ১৮৫৫ সালে জানুয়ারিতে মধুসূদন কলকাতা আসেন। কলকাতায় আসার পর তিনি দেশীয় শিল্প-সাহিত্য-ভাষা-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি নিজেকে একান্তে চর্চায় মনোনিবেশ করেন।

১৮৬২ সালে ৯ জুন কবি মধুসূদন ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। সেখানে ব্যারিস্টারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। ১৮৬৭ সালে কবি মধুসূদন বিদেশ ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন এবং কলকাতার হাইর্কোটে ব্যারিস্টারি হিসেবে যোগ দেন। এ সময়ে তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। কিন্তু তা যথাযথ ধরে রাখতে পারেননি।

১৮৫৮ সাল থেকে ১৮৬২ সাল পর্যন্ত মাত্র ৫ বছরের মধ্যে কবি মধুসূদন একে একে রচনা করেন- তিলোত্তমাসম্ভব, মেঘনাদবধ, ব্রজাঙ্গনা কাব্য, বীরাঙ্গনা কাব্য এবং শর্মিষ্ঠা নাটক, পদ্মাবতী নাটক, একেই কি বলে সভ্যতা, কৃঞ্চকুমারী নাটক, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো ইত্যাদি নাটক ও প্রহসনসহ বিভিন্ন কাব্য ও কবিতা।

কবি মধুসূদন তার জীবদ্দশায় বেশকিছু মহাকাব্য রচনা করেছিলেন। অমিত্রাক্ষর ছন্দে তিনি প্রথম রচনা করেছিলেন ‘তিলোত্তমাসম্ভব’ নামে মহান কাব্যটি। কবি মধুসূদনের দ্বিতীয় মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ মহাকাব্য’ বাংলা সাহিত্যে নতুন সংযোজন হয়ে বাংলা মহাকাব্যকে প্রাণ দিয়েছিল। ১৮৬১ সালে কাব্যটির রচনা শেষ হয়েছিল এবং একই সালে কাব্যটি দুই খণ্ডে প্রকাশিতও হয়েছিল।

‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য’ কবি মধুসূদনের তৃতীয় কাব্য। এই কাব্যটি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ রচনার আগে লেখা হয়েছিল। কবি এই কাব্যে রাধাকে মানুষের পৃথিবীর বুকে একজন অতীব মানবী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি এখানে দেখাতে চেয়েছেন, রাধা মানবী হওয়া সত্ত্বেও একজন সাধারণ নারী। ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’ কবি মধুসূদনের চতুর্থ ও শেষ কাব্য। ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’টি মূলত পত্র-কাব্য হিসেবেই অধিক পরিচিত। বাংলা সাহিত্যে ইহা পত্রাকারে রচিত এ ধরনের কাব্য এটিই প্রথম।

বহু প্রতিভার অধিকারী কালজয়ী মহাকবি মধুসূদন কাব্যসাহিত্যকে যেমন সমৃদ্ধ ও বিকাশ ঘটিয়েছেন তেমনি আবার নাট্যসাহিত্যকেও সমানভাবে সমৃদ্ধ ও শৈল্পিক করে তুলেছিলেন। ‘শর্মিষ্ঠা নাটক’ কবির প্রথম বাংলা রচনা। এটি বিগত ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত হয়। গ্রিক পুরাণের কাহিনী অবলম্বনে কবি মধুসূদন রচনা করেছিলেন ‘পদ্মাবতী নাটক’। এই নাটকটি ১৮৬০ সালে প্রকাশিত হয়। ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ এবং ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’ নামে দুটি ব্যঙ্গাত্মক প্রহসন প্রকাশিত হয় ১৮৬০ সালে। ‘কৃঞ্চকুমারী’ ও ‘মায়াকানন’ নামে কবি আরো দুটি নাটক রচনা করেছিলেন।

‘চতুর্দশপদী কবিতাবলি’ (সনেট) কবি মধুসূদনের এক বিস্ময়কর অমর সৃষ্টি। সনেটের জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যাকাশে বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। পাশ্চাত্য সনেটের অনুসরণে রচিত সনেট বাংলা সাহিত্যে একদিকে যেমন নতুন, অন্যদিকে এক নব অধ্যায় সৃষ্টি করেছে।

কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের সৃষ্টি সাহিত্যকর্ম, বাংলা সাহিত্যকে/কাব্যকে সাহিত্য ভুবনে আলোকিত করবে সবসময়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads