• বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
অবসর সময়ে সন্তানকে সময় দিন

সংগৃহীত ছবি

ফিচার

অবসর সময়ে সন্তানকে সময় দিন

  • প্রকাশিত ২১ মার্চ ২০২০

সেরাজুম মনিরা

 

দশ বছরের মেয়ে তৈয়বা। বাবা-মা দুজনেই কর্মজীবী। বাবা সাংবাদিক, মা ডাক্তার। তৈয়বার বাবা অফিসের জন্য বাসা থেকে বের হন সকাল ১০টায়। আর তার মা বিভিন্ন সময় হাসপাতারে যান। কখনো সকালে। আবার কখনো বিকালে। মাঝে মাঝে নাইটেও ডিউটি করেন। তৈয়বার সারা দিন কাটে বাসার গৃহপরিচারিকা রোজিনার সঙ্গে। রাতে দুজনই বাসায়  ফেরেন। এদিকে সারা দিন একা থাকা তিতিরের ঘুম পায় আরো আগে। তাই বাবা-মাকে খুব কম সময়ই কাছে পাওয়া হয় এই শিশুর।

এমন তৈয়বার গল্প এ সময় নতুন কিছু নয়। শহুরে সংস্কৃতি যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের রূপান্তর এখনকার চিত্র। এই অবস্থায় একা বড় হচ্ছে পরিবারের ছোট্ট সদস্যটি। আবার অন্য বাস্তবতাও আছে। যেখানে বাবা-মা হয়তো বাড়িতেই থাকছেন, কিন্তু ভীষণ ব্যস্ত তারা মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ আর টেলিভিশন নিয়ে। এ ক্ষেত্রে শিশুর একমাত্র সম্বল হয়ে ওঠে মোবাইল ফোন কিংবা কম্পিউটারে ভিডিও গেমস।

কিন্তু এসব কিছু একটি শিশুর মনোজগৎকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা গবেষণাসাপেক্ষ। শিশুবিশেষজ্ঞ ডালিয়া পারভীন মনে করেন, একটি শিশুর সুষ্ঠু বিকাশের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে দরকার আনন্দময় শৈশব। সে এই শৈশব পাওয়ার অধিকার  রাখে। যেখানে বিশেষ ভূমিকায় থাকবেন মা-বাবাসহ পরিবারের অন্য স্বজনরা। আর শিশুর চাওয়ার দিকে যদি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে চাই অনেক কিছু। তৈয়বার মতো শিশুর চাই বিশাল মাঠ, তাজা বাতাসে ভরপুর সবুজের ছড়াছড়ি। যেখানে থাকবে অনেক গাছপালা, পাখির কলকাকলি।

সমাজের নবীন সদস্য সব সামাজিক দীক্ষা পাবে সমাজ থেকেই। এমন শৈশবই কাম্য সবার। শিশুদের মোবাইল ফোনে আসক্তি নিয়ে অনেক গবেষণা চলছে বিশ্বজুড়ে। গবেষকরা জানাচ্ছেন, এ ধরনের শিশু হয়ে উঠতে পারে খিটখিটে মেজাজের। অনেক সময় তাদের খাদ্যে অরুচি জন্মায়। যাতে ব্যাহত হয় শিশুর সঠিক বিকাশ। শিশুর স্কুলে যাওয়ার আগের সময়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ এ কারণেই। স্কুলে একটি কাঠামোগত শিক্ষা পায় শিশু।

কিন্তু জীবনের মৌলিক বিষয়ের শিক্ষা আসে পরিবার থেকেই। তাই শিশুর জন্য চাই পর্যাপ্ত সময়। এটি বাবা-মাকেই নিশ্চিত করতে হবে। শিশুকে পুরো সময়ের জন্য সময় না দিয়ে একটি বিশেষ সময়ে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া। এটি ঠিকমতো করা গেলে তা শিশুর জন্য খুব উপকার হবে। তবে একটি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন তাহলো, মানব শিশু খুবই মনোযোগী। তাকে ছোট ভাবার সুযোগ নেই। মানুষে মানুষে সম্পর্কের শিক্ষা শিশু খুব ছোটবেলা থেকেই পেয়ে থাকে। তাই কোয়ালিটি টাইমের মতো নিয়মিতই শিশুকে সময় দিতে হবে। শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করে তাকে নিয়ে বাইরে যেতে হবে। তাকে খালি ঘরে রাখা যাবে না। সবার সঙ্গে মিশতে দিতে হবে।

তার খেলাধুলায় অংশগ্রহণ জরুরি। তাকে পরিচিত করানো উচিত পরিবারের সব স্বজনের সঙ্গে। শিশু যেন বুঝতে পারে, পরিবারই সব পরিচিতির কেন্দ্র। তার আনন্দেই পরিবারের আনন্দ। তার দুঃখ পরিবারের দুঃখ। সব মিলিয়ে শিশুর জন্য নির্ভরযোগ্য একটি পরিবেশ তৈরি করা আমাদের সবারই দায়িত্ব। শিশুর টয়লেট, খাওয়া, খেলা এসবে যে শিশুরও অংশগ্রহণ জরুরি, সেটি শিশুকে বোঝাতে হবে মা-বাবাকে। শিশুর অন্য আসক্তি কমিয়ে তাকে একটি স্বনির্ভর সত্তা হিসেবে তৈরি করার দায়িত্ব পরিবারের। তাহলেই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের জন্য বিষয়টি ভালো হবে।

শিশুকে সময় দিন। তার সঙ্গে খেলা করুন। গল্প পড়ে শোনান। এই ছোট ছোট কাজ আপনার শিশুকে টিভি দেখা এবং ভিডিও গেম খেলা থেকে বিরত রাখবে। প্রথমে শিশুর রুম থেকে টিভিটি সরিয়ে ফেলুন। যেসব শিশুর রুমে টিভি থাকে, তাদের টিভি দেখার প্রতি আগ্রহ বেশি থাকে। কখনো শিশুদের একা একা টিভি দেখতে দেবেন না। এতে সহিংস ও যৌনবিষয়ক অনুষ্ঠান দেখার ঝুঁকি তৈরি হয় শিশুদের। বাইরের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ তৈরি করুন। ছোট থেকে গল্পের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে ভিডিও গেম খেলার নেশা কমে যাবে।

মূলত টিভিতে ছোট শিশুদের জন্য শিক্ষণীয় কোনো কিছু দেখায় না। ছোট শিশুদের জন্য টিভি দেখা সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই নয়। টিভি দেখা সময়টিতে আপনার শিশুকে অন্য কোনো কাজ যেমন ছবি আঁকা অথবা কোনো খেলা ইত্যাদি করতে দিন। টিভি অথবা ভিডিও গেমের স্কিনের দিকে তাকিয়ে থাকার চেয়ে এগুলো তার মানসিক বিকাশে সহায়তা করবে। যেসব শিশু দিনে চার ঘণ্টার বেশি সময় টিভি দেখে, তাদের ওজন বৃদ্ধির হার বেশি থাকে। তিনভাবে তাদের ওজন বৃদ্ধি পায়। এক. দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা (কোনো শারীরিক কর্মকাণ্ড না করা)। দুই. টিভি দেখার সময় অতিরিক্ত ক্যালরি খাবার যেমন-চিপস, চকলেট, কোল্ড ড্রিংকস গ্রহণ। তিন. খাবার সঠিকভাবে হজম না হওয়া। অতিরিক্ত টিভি দেখা শিশুদের ঘুমের সমস্যা তৈরি করে। বিশেষ করে রাতে টিভি দেখার কারণে অনিয়মিত ঘুমের চক্রের মধ্যে পড়ে যায় শিশুরা। টিভি শিশুর চিন্তা করার ক্ষমতা হ্রাস করে দেয়।

শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা যা দেখে তাই অনুকরণ করে। যার ফলে টিভিতে তার প্রিয় চরিত্র যা করে, তাই করার চেষ্টা করে। যা শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। যেমন সুপারম্যানের চরিত্র দেখে অনেক শিশু ছাদ থেকে ওড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে অকালে প্রাণ হারায়। আবার কিছু শিশু টিভিতে ভয়ংকর, অবাস্তব কাহিনী দেখে ভীত হয়ে যায়। অতিরিক্ত ভিডিও গেম খেলা শিশুদের নেশায় পরিণত হয়, যা তাদের অসামাজিক হিসেবে গড়ে তোলে। গেম খেলার নেশায় শিশুরা বাইরের জগৎ থেকে দূরে সরে যায়। বন্ধু তৈরির সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো শৈশবকাল। আর এই সময়টি বন্ধুদের না দিয়ে ভিডিও গেমে দেওয়ার কারণে আপনার শিশু একসময় বন্ধুশূন্য হয়ে পড়ে। ভিডিও গেমের আসক্তি অতিরিক্ত হয়ে গেলে একসময় তা আর নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। শিশুরা সারাক্ষণ নতুন নতুন ভিডিও গেম এবং তার ভার্সনের কথা চিন্তা করতে থাকে। একপর্যায়ে এটি মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সবচেয়ে বড় কথা, যা করছেন আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যই করছেন। সেহেতু সন্তানকে এখন থেকেই সময় দিন। তার অভিভাবক হওয়ার পাশাপাশি তার বন্ধু হন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads