• বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads

ফিচার

‘বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন’-এর অনন্য উদ্যোগ

  • প্রকাশিত ২৮ মার্চ ২০২০

শাহ আমীর রাজন

 

 

দেশে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার আগে থেকেই সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। করোনার বিস্তার রোধে সংস্থাটি মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামের যেসব স্থানে জনসমাগম বেশি, সেসব স্থানে জীবাণুনাশক ছিটানো এবং মাস্ক-অ্যাপ্রোন-গাউন তৈরি ও বিতরণের কাজ করছে।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের ঢাকা কেন্দ্রের সমন্বয়ক ও স্বেচ্ছাসেবক সালমান খান ইয়াসিন বলেন, ‘আমরা এখন প্রতিদিন গড়ে ৬০০ মাস্ক তৈরি ও বিতরণ করছি। প্রতিদিন ৭০ থেকে ১০০ লিটার জীবাণুনাশক ছিটানো হচ্ছে। আমরা এখন অ্যাপ্রোন বানানো শুরু করেছি। জানি না কতটুকু পারবো। তবে আমাদের টার্গেট আছে প্রতিদিন ৭০০ অ্যাপ্রোন তৈরি করার।’

দুস্থ শিশুদের মধ্যে ‘এক টাকায় আহার’ বিতরণ করে সুনাম অর্জন করা সংস্থাটির এই স্বেচ্ছাসেবক আরো বলেন, ‘চিকিৎসকদের দেওয়ার জন্যে আমরা যে গাউন তৈরি করছি তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছে। একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান আমাদের সহযোগিতা করছে। তারা প্রায় ২৫শ গাউন স্পন্সর করছে।’

সংস্থাটি আরও কী ধরনের কাজের প্রস্তুতি নিচ্ছে সে সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যদি পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়, তখন মানুষের বহুবিধ সহায়তার প্রয়োজন হবে। নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। লকডাউনের মতো পরিস্থিতি যদি তৈরি হয় তবে খাদ্য সরবরাহের দিকটি আমাদের বিবেচনায় আছে। আমরা কারো কাছে সরাসরি সহায়তা চাই না। যদিও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তাতেই আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আরো বেশি সহায়তা প্রয়োজন। আশা করছি, মানুষ এগিয়ে আসবেন।’

মাত্র এক টাকায় আহার! চিন্তা করা যায়? কিন্তু সত্যিই তাই। বাংলার পথে পথে এই আহার চলে খোলা আকাশের নিচে, স্টেশনের প্লাটফর্মে। এদের কেউ অভুক্ত থাকে সারারাত, কেউবা আরো বেশি। মাত্র এক টাকায় এক প্যাকেট খাবার পেয়ে কেউ খুশিতে আত্মহারা হয়, কেউবা দৌড়ে গিয়ে লাইনে দাঁড়ায়।

এ প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাশ। কিশোর কুমার দাস। চাকরির সুবাদে ঘুরছেন দেশ-বিদেশ। বর্তমানে আছেন সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে। কর্মজীবনে সফল এই পেশাদার কর্মকর্তার জীবনের পেছনের গল্পটা এমন নয়। শৈশব কেটেছে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে।

২৪ বছর আগের চট্টগ্রাম নগরীর কালুরঘাটের এক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠান শেষে খাবার বিতরণ হচ্ছিল। তখন ১৪ বছরের কিশোর অন্যদের মতো লাইনে দাঁড়িয়েছিল এক প্লেট খাবারের আশায়। কিন্তু সেখানে অসংখ্য মানুষের ভিড় ঠেলে ফিরে আসতে হয়েছিল খালি হাতে। তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, একদিন এমন কিছু করবেন যাতে সুবিধাবঞ্চিত মানুষরা খাবারের জন্য কোনো কষ্ট না পায়। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে কলাপাতার ওপর সামান্য খাবার পেয়েছিলেন একবার। তা নিয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে ছুটেছিলেন বাড়িতে। মা-কে নিয়ে একসঙ্গে খাবেন তাই। পথে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে সব খাবার নষ্ট হয়ে যায়। আজ তার ক্ষুধার কষ্ট নেই। কিন্তু, ভোলেননি সেই অতীত। অতীতকে স্মরণ করেই তিনি দাঁড়িয়েছেন দেশের শত শত ক্ষুধার্ত সুবিধাবঞ্চিতের পাশে। তারই প্রতিষ্ঠিত বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন এখন প্রতিদিন দুই বেলা ‘এক টাকায় আহার’ বিতরণ করে দেশের হাজার পথশিশুর মধ্যে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের রামুতে প্রতিদিন দুপুরে ও রাতে শিশুরা সংগ্রহ করে এক টাকায় আহার।

এ বিষয়ে কিশোরের বক্তব্য, শিশুরাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় খাবারের জন্য। খাবার জোগাড় করতে অনেকেই বাধ্য হয় শিশুশ্রমে, চুরি করতে। পড়াশোনার কথাতো চিন্তাই করতে পারে না তারা অন্ন সংস্থানের চিন্তায়। এজন্যই বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ‘এক টাকায় আহার’ প্রকল্প চালু করে।

খাবার বিতরণের সঙ্গে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, প্রতীকী এই এক টাকা নিয়ে শিশুদের মধ্যে স্বাবলম্বি হওয়ার আগ্রহ সৃষ্টির প্রত্যাশা রয়েছে আমাদের। শিশুরা যাতে ভিক্ষা বা দান নির্ভর না হয় সেটাই এই এক টাকা মূল্য নির্ধারণের উদ্দেশ্য। নিয়মিত খাবার মেন্যুতে থাকে ভাত, সবজি আর ডাল। তবে কেউ অনুদান দিলে খাবারের মেন্যুতে মুরগির মাংস, মাছ, ডিম, খিচুড়ি আর পোলাও দেয়া হয়। কোনো কোনোদিন করা হয় মিষ্টান্নের ব্যবস্থাও। শুক্রবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, রামু ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ ও রাজবাড়ীতে বিতরণ করা হয় এক টাকার খাবার।

চট্টগ্রামে খাবার বিতরণের জন্য খোলা হয়েছে ‘ফুডভ্যান’। ঢাকার বিমানবন্দর রেলস্টেশন ও গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে প্রতিদিন বিতরণ করা হয় এসব খাবার।

স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত লেকদের জন্যই এই খাবার দেওয়া হয়। শিশুরা ছাড়াও অনেক দরিদ্র, শ্রমজীবী এই খাবার খেয়ে উপকৃত হন। নিয়মিত খাবার বিতরণের পাশাপাশি বন্যার্তদের মাঝে বিতরণ করা হয় খাবার। রমজান মাসে সেহরি ও ইফতার বিতরণ করা হয়।

কিশোর জানান, আমি নিজে শৈশবে একজন সুবিধাবঞ্চিত শিশু ছিলাম। তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কোনোদিন যদি টাকা উপার্জন করতে পারি, তাহলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আমিও কিছু করব।

কিশোর কুমার ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর শুরু করেছিলেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন

কষ্টের শৈশবের কথা জানিয়ে কিশোর কুমার দাশ বলেন, ‘আমার নিজের শৈশবের কোনো ছবি নেই। এখন বিদ্যানন্দের উদ্যোগে ১০ হাজার শিশুর ছবি তুলে তা প্রিন্ট ও লেমিনেটিং করে শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। শিশুদের অধিকার আছে তাদের শৈশবকে স্মরণীয় করে রাখার। আমি কিছু শারীরিক জটিলতা নিয়ে জন্ম নিয়েছিলাম। আমি কিছু মনে রাখতে পারতাম না। আরো নানা কারণে আমার শৈশবটা আসলে আনন্দময় ছিল না। কিন্তু, আমার অন্য ভাইবোনরা ছিল খুব মেধাবী, জীবনের ওই সময়টা ছিল খুব হতাশার। বাবা ছিলেন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। উনি অবসরে যাওয়ার পরে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় টাকার অভাবে। তখন আমি কেবল এসএসসি পাস করেছি। যদিও ভাইবোনদের লেখাপড়া চলছিল। তখন কতোজনকে ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছি, কিন্তু পড়ার জন্য আমি অর্থের সংস্থান পাইনি। শেষ পর্যন্ত দুই বছর পর একজন শিক্ষকের সহযোগিতায় আমি লেখাপড়ার করার সুযোগ পাই আবার। এরপর কম্পিউটার সায়েন্স-এ ভালো একটা ফল নিয়ে পাশ করলাম চুয়েট থেকে।

২০০৬ সালে বিডিকমে চাকরি পান কিশোর। এরপর আর পিছিয়ে থাকতে হয়নি। দ্রুতই পদোন্নতি পেয়েছেন সর্বত্র। বিডিকম থেকে এয়ারটেল। আরো একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। ২০১১ সাল থেকে পেরুতে একটি বহুজাতিক কোম্পানির হেড অব মার্কেটিং পদে আছেন কিশোর কুমার।

২০১৩ সালের আগস্টে বড় বোন শিপ্রা দাশের সঙ্গে আলাপ করেই সিদ্ধান্ত নেন কিছু একটা করবেন সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য। ওই বছরই নারায়ণগঞ্জের বন্দরথানার সাব্দি গ্রামে পাঁচজন ছাত্র নিয়ে স্কুল শুরু করেন শিপ্রা।

শিপ্রা জানান, আমাদের গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। এখন আমরা বিদ্যানন্দের স্কুল ও বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম চালাচ্ছি বেশ কয়েকটি জেলায়। চট্টগ্রাম এবং ঢাকার মিরপুরে বিদ্যানন্দের শাখা খোলা হয়েছে। বিদ্যানন্দের প্রতিটি শাখায় সংগ্রহ করা হয় হাজার হাজার বই। সেখানে শিশুরা পড়াশুনা করতে পারে সারা দিন। এছাড়া বিদ্যানন্দের উদ্যোগে এখন চলছে একটি এতিমখানা। এজন্য কক্সবাজারের রামুতে ১৮ শতক জায়গা দিয়েছেন এক ব্যক্তি। সেখানে বাঁশঝাড় পরিচ্ছন্ন করে গড়ে তোলা হয়েছে এতিমখানা।

কিশোর জানান, পরিকল্পনা এবং শুরুটা ব্যক্তিগত উদ্যোগে হলেও এখন তিনি সঙ্গে পেয়েছেন আরো ক’জন সহযোদ্ধা ও স্বেচ্ছাসেবী। টাকারও একটি বড় অংশও দিয়েছেন তিনিই। এখন অনেকেই সেখানে আর্থিক অনুদান দিচ্ছেন। অনেকে দিচ্ছেন সময় ও শ্রম। ফাউন্ডেশনের রয়েছে কয়েকজন শাখা প্রধান।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমারের স্বপ্ন, একদিন বাংলাদেশের সব স্কুলে ও বিভিন্ন জায়গায় এক লাখ সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে প্রতিদিন এক টাকায় খাবার বিতরণ করবেন।

বর্তমানে বিদ্যানন্দের বিভিন্ন শাখায় স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। কিশোর আশা করেন, তার মতো আরো অনেক তরুণ সুবিধাবঞ্চিতদের সেবাই এগিয়ে আসুক।

সংগঠনের কর্মীরা জানান, আমরা প্রতি দিন কতভাবেই না কত টাকা অপচয় করি, একটি সিগারেট কিনি ১০ থেকে ১৫টাকায়। একটি লিপস্টিক কিনি হাজার টাকায়, শ’টাকায় খাই সামান্য বার্গার। আসুন যে যতটুকু পারি এদের পাশে দাঁড়াই, সাহায্য করি।

আগে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খাবার বিতরণ হলেও বর্তমানে ‘এক টাকায় আহার’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads