• বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads

ফিচার

জংধরা যন্ত্রাংশ যখন আবেগী ভাস্কর্য

  • সালেহীন বাবু
  • প্রকাশিত ২৮ মার্চ ২০২০

লোহালক্কড়, সে যে ধাতব পদার্থ। কঠিন জিনিসে ব্যবহার হয়।

স্পর্শমাত্রই আমাদের মাঝে এক কঠিন-শীতলতার অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। কঠিন দৃঢ়তা আর স্থায়িত্বের কারণেই মানবসভ্যতায় এর এত কদর। বিশাল বিশাল স্থাপত্য ও নির্মাণ কাঠামোর পরম নির্ভরতা এই ধাতু। শরীরে যেমন কঙ্কাল লুকিয়ে থাকে, তেমনি এই সভ্যতার অন্যতম ভিত লোহার কাঠামোটিও যেন আকাশছোঁয়া ভবনে লুকিয়ে রাখা।

আমাদের এই যন্ত্রসভ্যতায় লোহা তো আরো অবিচ্ছেদ্য উপাদান। এই ধাতুর সঙ্গে যুক্ত অনমনীয়-কাঠিন্যের অনুভূতিটি আমরা চাইলেও যেন মুছে ফেলতে পারি না।

তবে শিল্পীরা শত শত বছরের এই অনুভব-বন্দিত্ব ঠিকই ঘুচিয়ে দিতে পারেন। তারা এই কঠিন ধাতুকেই মানব অনুভূতির বাহন করে তুলতে পারেন। যাকে বলা যায় কঠিন ধাতুকে কোমল অনুভূতির সঞ্চার। মাঝে মাঝে মানুষের মধ্যে যে আকাড়া ও তীব্র অনুভূতির বিস্ফোরণ ঘটে, তাকেও ধাতব কাঠামোতে ফুটিয়ে তোলা যায়। প্রাণনিঃসাড় এই লোহালক্কড় দিয়ে কীভাবে আবেগী শিল্প তৈরি করা যায়। সেই শিল্পকে কীভাবে মানুষের কাছে আবেগের বিষয়বস্তু করা যায়, সেই অসাধ্য সাধন করেছেন যুক্তরাজ্যের শিল্পী পেনি হার্ডি। এক অর্থে এ কাজটিই অনন্য সফলতার সঙ্গে সম্ভব করেছেন এই শিল্পী।

ভালো কোনো লোহা নয়; বরং জংধরা ও ফেলনা যন্ত্রাংশ দিয়ে গড়া এ শিল্পীর ‘ব্লাউন অ্যাওয়ে’ সিরিজের ভাস্কর্যগুলো আমাদের মাঝে আশ্চর্য সজীবতার অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়। যেন তারা আর লোহালক্কড়ের কোনো শরীর নয়, জীবন্ত মানুষ।

তার একটি ভাস্কর্যে দেখা যায়, প্রবল বাতাসের বিপরীতে ধনুকের মতো বেঁকে গিয়ে একজন মানুষ কী অদ্ভুত চিন্তায় অনুভবে মগ্ন। যেন বাতাসের তোড়ে জামার মতো এবং মাথার দিঘল ও তরঙ্গময় চুলের মতো তার শরীরটাই পেছনের দিকে একটু একটু করে খুলে খুলে উড়ে যাচ্ছে। অনুভূতির তোড়ে বাতাসের সঙ্গে একাত্ম হতে হতে এক সময় সেই বাতাসেই যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকা।

তার আরেকটি ভাস্কর্যে দেখা যায়, তরুণ-তরুণীর এক জুটি মুখোমুখি ভীষণ অনুরাগ প্লাবিত হয়ে দাঁড়ানো। এই অনুভূতির তীব্র টানে তাদের পেছন থেকে একের পর এক টুকরো অদৃশ্য থেকে উড়ে এসে জোড়া লাগছে আর তাদের শরীরটাকেই ধীরে ধীরে আকৃতি দিচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের ডেভনের বাসিন্দা পেনিড হার্ডি বলেন, ‘ফেলনা যন্ত্রপাতির বিভিন্ন অংশ দেখে শুধু যান্ত্রিকতার কথা মনে হয়। ফেলনা জিনিসকে আবার ব্যবহার করে এক নতুন ও সজীব জগৎ গড়ে তোলার আনন্দই আলাদা। ’

পুরো বিশ্বের নামি দামি শিল্পীরা যাখন রংতুলিতে, নিখুঁত ভাস্কর্যে নিজেদের শিল্প তুলে ধরেছেন সেখানে ফেলে দেওয়া জংধরা ও ফেলনা যন্ত্রাংশ থেকে ভাস্কর্য শিল্প তৈরি করার পরিকল্পনা হার্ডির ছিল ছোটবেলা থেকেই। এ শিল্পী জানান, ছোটবেলা থেকেই আমি ছবি আঁকতাম। তখন আমি রংতুলি দিয়ে ছবি আঁকতাম। ভাবতাম এমন কিছু দিয়ে যদি শিল্পকর্ম তৈরি করা যায় যা আমরা সচরাচর ব্যবহার করি না। এরকম কোনো জিনিস আছে কিনা ভাবতে লাগলাম। একদিন বিকালে খেলতে গিয়ে দেখলাম বাড়ির পাশে অনেক জংধরা ও ফেলনা যন্ত্রাংশ পড়ে আছে। তখন থেকেই ভাবা শুরু করলাম কী করা যায়। প্রথমে সেগুলো দিয়ে ছোটখাটো জিনিস বানাতে লাগলাম। পরে মনে হলো বড় কিছু বানাবো। এভাবেই শুরু করলাম। প্রথমে অনেকেই আমার এই বিষয়টিকে নিয়ে তামাশা করতো। যদিও আমাকে এ বিষয়ে আমার পরিবার আমাকে সম্পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। তবে তারা চাইতো আমি ভালো কিছু দিয়ে শিল্পের কাজ করি। কিন্তু আমি জানতাম শিল্পের জন্য উপকরণ মুখ্য নয়; বরং তার উপস্থাপনাটাই সবচেয়ে জরুরি।

বর্তমানে পৃথিবীর অনেক জায়গায় পেনিড হার্ডির শিল্পকর্ম আছে। ভবিষ্যতে এই শিল্পগুলো নিয়ে একটি মিউজিয়াম করতে চান। যদিও এই শিল্পের ওপর আলাদা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। কেউ এ ধরনের শিল্পকর্ম করতে চাইলে পেনিড তাদের সহায়তা করবেন বলে জানান।

পেনিডের শিল্পে বাস্তব জীবনের রাগ-অনুরাগ, ব্যক্তির অভিব্যক্তি, নারীর প্রতিমা, অভিমান, পরিবেশে মানুষের প্রভাব ফুটে উঠেছে। তার শিল্পের মাধ্যমে মানুষ তার পারিপার্শ্বিক প্রতিচ্ছবিই দেখতে পায়। 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads