• মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৫
ads
‘বাংলাদেশেও শ্রীলঙ্কার মতো ঘটনা ঘটানোর অনেক চেষ্টা চলছে’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

ছবি : সংগৃহীত

সরকার

‘বাংলাদেশেও শ্রীলঙ্কার মতো ঘটনা ঘটানোর অনেক চেষ্টা চলছে’

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত ২৬ এপ্রিল ২০১৯

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে উন্নয়ন-অগ্রগতির অন্তরায় এবং একটি বৈশ্বিক সমস্যা আখ্যায়িত করে এর বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

শেখ হাসিনা বলেন, কে কোথায় সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে লিপ্ত সেটা শুধু গোয়েন্দা সংস্থাই নয়, আমাদের দেশবাসীকেও সতর্ক থাকতে হবে এবং এদের খুঁজে বের করে সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানাতে হবে। কারণ, আমরা দেশে শান্তি চাই। শান্তিই দিতে পারে উন্নতি। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ হলেই দেশ এগিয়ে যাবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা-রাজশাহী রুটে প্রথম বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন বনলতা এক্সপ্রেসের উদ্বোধনকালে প্রদত্ত ভাষণে তিনি একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপির নাতি ছোট্ট শিশু জায়ান চৌধুরীর কলম্বোয় বোমা হামলায় মৃত্যুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, কয়েক দিন আগে ২১ তারিখে শ্রীলঙ্কায় যে ঘটনা ঘটল তাতে আমরা বাংলাদেশের কয়েকজনকে হারিয়েছি। সবচেয়ে দুর্ভাগ্য অনেকগুলো শিশু সেখানে মারা যায়। যেখানে আমাদের বাংলাদেশের শিশু জায়ানকে হারাতে হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশেও এই ধরনের ঘটনা ঘটানোর অনেক চেষ্টা চলছে। তবে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে যাচ্ছে।

এ সময় ১৫ আগস্টের কালরাতের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময় বিদেশে থাকায় আমরা দুই বোন প্রাণে বেঁচে গেলেও সেদিন বঙ্গবন্ধু পরিবারের আর কেউ বাঁচেনি। শেখ ফজলুল হক মনির ছোট ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিমের মেয়ের প্রথম সন্তান এই জায়ান। তাকে এভাবে আজকে জীবন দিতে হলো। আমরা চাই না এ ধরনের কোনো শিশুর মৃত্যু। খবর বাসস।

শেখ হাসিনা বলেন, আজ যেহেতু ৮ বছরের শিশু জায়ান চৌধুরীকে আমরা হারিয়েছি। আমি জানি না যারা এ ধরনের হত্যাকাণ্ড চালায় তারা কী পায়, কী লাভ তাদের হয়। মানুষের ঘৃণা এবং অভিশাপ ছাড়া আর কিছু তারা পায় না। তিনি বলেন, যারা ইসলাম ধর্মের নাম নিয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ চালায় তারা এই পবিত্র ধর্মকে কলুষিত করছে। বিশ্বব্যাপী এই পবিত্র ধর্মের বদনাম করছে। তারা আসলে ইসলাম ধর্মের প্রচণ্ড ক্ষতি করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, যে ধর্ম সবচেয়ে মানবতার ধর্ম, সবচেয়ে শান্তির ধর্ম- সেই ধর্মের নামে তারা জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে। কাজেই এ ধরনের কাজে যারা সম্পৃক্ত, তাদেরকে বিরত থাকতে হবে। সে কারণে আমি সব অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, বাংলাদেশের জনগণ, মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন বা ধর্মীয় শিক্ষাগুরু এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর যারা প্রত্যেককে আমি বলব- যার যার আওতায় যেসব শিশু, কিশোর, যুবক যারা রয়েছে বা ছাত্ররা যারা রয়েছে বা শিক্ষকরা রয়েছেন বা সাধারণ মানুষের মধ্যে যদি এ ধরনের একটা প্রবণতা দেখা দেয় সম্মিলিতভাবে এর বিরুদ্ধে সবাইকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি।

গত রোববার শ্রীলঙ্কায় গির্জা, অভিজাত হোটেল ও কলম্বোর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ভয়াবহ সিরিজ বোমা হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। হামলায় এখন পর্যন্ত ৩৫৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এ সময় গণভবন প্রান্তের মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জল হোসেন নতুন চালুকৃত বনলতা এক্সপ্রেসসহ সমগ্র রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতির ওপর একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন।

রাজশাহী রেলস্টেশন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বক্তৃতা দেন। প্রধানমন্ত্রী হুইসেল বাজিয়ে এবং সবুজ পতাকা উড়িয়ে ট্রেনটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে জুমার খুতবায় সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে তরুণ এবং যুবসমাজকে এ সম্পর্কে সতর্ক থাকার জন্য দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের প্রতি আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, শুক্রবার দিন প্রতিটি মসজিদে শ্রীলঙ্কার এই বোমা হামলা এবং জায়ান চৌধুরীর নিহত হওয়ার ঘটনায় ও এর আগে নিউজিল্যান্ডের দুটি মসজিদে গুলি চালিয়ে মুসলমানদের হত্যার ঘটনায় আপনারা দোয়া কামনা করবেন। তিনি বলেন, ইমাম-মুয়াজ্জিন যারা আছেন তাদের কাছে অনুরোধ থাকবে- আপনারা দয়া করে জঙ্গিবাদ যে ইসলাম ধর্মের জন্য ক্ষতিকারক তা জনগণকে বোঝাবেন। তিনি বলেন, যেখানে আমাদের নবী করিম (সা.) সব সময় শান্তির কথা বলে গেছেন, আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিনও শেষ বিচারের দায়িত্ব কিন্তু মানুষকে দেননি। সেটি আল্লাহর হাতে। আমরা যারা কোরআন শরিফ পড়ি, যেখানে বার বার প্রায় প্রতিটি সুরাতেই আমরা তা পাই যে, বিচার করবেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। তাহলে এই ধর্মের নামে মানুষ খুন করা কেন? যারা বিপথে চলে গেছে এর থেকে তারা যেন বিরত হয়।

শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করে বলেন, সারা দেশে প্রত্যেক মসজিদে জুমার নামাজের খুতবায় জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এবং ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সে কথাটা ভালোভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরা হবে। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট ২০০১ সালে ক্ষমতায় এলে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৫০০ জায়গায় একই দিন বোমা হামলা থেকে শুরু করে গ্রেনেড হামলা, মানুষ খুন করা, আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর অকথ্য অত্যাচার-নির্যাতন, জেল-জুলুম, অত্যাচার ছাড়া আর কিছু তারা করেনি।

তিনি বলেন, ওই রাজশাহী বিভাগটাই সেই বাংলাভাই এবং জঙ্গিবাদের আখড়া ছিল এবং সবচেয়ে দুর্ভাগ্য তখনকার বিএনপি-জামায়াত সরকার এদেরকে মদত দিত। প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে নিয়ে তারা পুলিশের পাহারায় মিছিল করত। তিনি বলেন, এই দেশকে তারা সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের দেশে পরিণত করেছিল। যার প্রভাব এখনো আমরা দেখি।

তিনি এ সময় বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের নামে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে হত্যারও কঠোর সমালোচনা করে বলেন, আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা দেখেছি অগ্নিসন্ত্রাস, এই বিএনপি-জামায়াত আন্দোলনের নামে আগুন দিয়ে জীবন্ত মানুষ পুড়িয়েছে। আমরা রেলের নতুন নতুন বগি কিনেছি আর তারা সেগুলো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। বিআরটিসি বাস কিনেছি সেগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে। তাছাড়া প্রাইভেট গাড়ি, বাস, ট্রাক, লঞ্চ- এমন কিছু নেই যা তারা অগ্নিসন্ত্রাসের কবলে ধ্বংস না হয়েছে।

সে সময় সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বামীর চোখের সামনে স্ত্রী, স্ত্রীর চোখের সামনে সন্তান ও স্বামী, বাবা-মায়ের চোখের সামনে সন্তান, এমনকি সন্তানের চোখের সামনে মা-বাবাকে পুড়ে যেতে তারা দেখেছে। কিন্তু আমরা চাই না এ ধরনের ঘটনা আর বাংলাদেশে ঘটুক।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় তার সরকার দেশের সর্বক্ষেত্রে উন্নয়ন করে যাচ্ছে উল্লেখ করে এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য দেশে একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন এবং সেদিকে লক্ষ রেখেই তার সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, স্বল্প খরচে আরামদায়ক ভ্রমণ একমাত্র রেলই দিতে পারে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে রেল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়ার পথেই বিএনপি যাচ্ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, অথচ প্রায় ৫৪ হাজারের কিছু বেশি বর্গমাইলের এই বাংলাদেশের স্বল্প আয়ের মানুষের দ্রুত যোগাযোগের জন্য রেল একটি অবিকল্প মাধ্যম।

তার সরকার ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর এই জনপদে বন্ধ হয়ে যাওয়া রেল যোগাযোগ পুনরায় চালু এবং নতুন নতুন রেল সংযোগ এবং রেলপথ গড়ে তুলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুতে রেল সংযোগের ব্যবস্থা করেছিলেন। আর বিশ্বব্যাংক এখন যমুনা নদীর ওপর পৃথক একটি রেল সেতু নির্মাণেরও প্রস্তাব দিয়েছে। এতদিন পড়ে তারা বুঝল এটার প্রয়োজন যে কত বেশি এবং এটা কত যে লাভজনক।

প্রধানমন্ত্রী পরে পৃথক এক ভিডিও কনফারেন্সে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ৭টি উন্নয়ন প্রকল্পেরও উদ্বোধন করেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads