• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

সরকার

অস্বস্তি আর চাপে সরকার!

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ৩০ আগস্ট ২০১৯

গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। সাধারণ মানুষের ভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন সরকার। এরপর প্রায় আট মাস যাচ্ছে। অর্থনীতি, সামাজিক, কূটনীতি, রাজনৈতিকসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক সূচকে অগ্রগতি করেছে সরকার। দেশে ও বিদেশে সরকারের কর্মকাণ্ড প্রশংসা পেয়েছে। তবে সরকার গঠনের পর গত আট মাসে অভ্যন্তরীণ বেশ কিছু ঘটনা সরকারের ওপর একধরনের চাপ তৈরি করেছে। যদিও সরকার শক্তভাবে সামনে আসা সমস্যাগুলো সমাধানে পদক্ষেপ নিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আগের দুই মেয়াদের থেকে তৃতীয় মেয়াদে আরো বেশি ভোট ও সংসদীয় আসন নিয়ে সরকার গঠন করেন শেখ হাসিনা। সেই বিবেচনায় নতুন সরকারের শুরুর সময়টা যতটা স্বস্তি ও ফুরফুরে হওয়ার কথা, প্রকৃত চিত্র তেমনটি নয়। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি আগের থেকে এখন অনেক বেশি দুর্বল। রাজপথে বিরোধী দলের উপস্থিতি নেই। দেশের বড় রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি এখন রাজনৈতিকভাবে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় নিষ্ক্রিয়। তবে হঠাৎ করে তৈরি কিছু ইস্যু সরকারকে বিব্রত করেছে এরই মধ্যে।

তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত আট মাসে যেসব ইস্যু সামনে এসেছে তার মধ্যে রয়েছে, ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দর, দেশব্যাপী ধর্ষণের মহামারি আকার, দেশজুড়ে বন্যা, গুজব ইস্যুতে গণপিটুনি, ডেঙ্গুর প্রকোপ, রোহিঙ্গা সংকট, মার্কিন মুলুকে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার নালিশ। এগুলোসহ আইনশৃঙ্খলা ইস্যুতে কিছু বড় ঘটনাও সরকারকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো ঘটনাই সামাল দিতে সরকারের মনোযোগ ও পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল না। এসব ঘটনা দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগকেও কিছুটা চাপে ফেলেছে। তবে বিরোধী শিবির এসব ঘটনায় মানুষকে পাশে নিতে পারেনি।

রোহিঙ্গা সংকট : দুশ্চিন্তা ও শঙ্কা বাড়াচ্ছে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা। মানবিক উদারতা দেখিয়ে আশ্রয় দেওয়া হয় মিয়ানমারে নির্যাতিত এসব রোহিঙ্গাকে। কিন্তু তারা এখন বিশৃঙ্খলায় জড়িয়ে পড়ছেন। বাংলাদেশের সার্বিক পরিবেশ হুমকিতে ফেলছে। দুই বছরের মাথায় এসে কক্সবাজারের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও রোহিঙ্গাদের কর্মকাণ্ড বিবেচনায় প্রশ্ন উঠেছে, রোহিঙ্গাদের এত ব্যাপক পরিসরে আশ্রয় দেওয়াটা ঠিক ছিল কি না। অপরদিকে কূটনৈতিক নাটক করা মিয়ানমার আদো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চায় কি না সে নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। রোহিঙ্গা সংকটের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে কক্সবাজার জেলার উখিয়ার কুতুপালং মধুরছড়া (ক্যাম্প-৪) আশ্রয় শিবিরের তিনটি পাহাড় ও মাঠে জড়ো হয়েছিলেন লাখো রোহিঙ্গা। সেই মহাসমাবেশে রোহিঙ্গা নেতারা শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ফেরত না যাওয়ার কথা ব্যক্ত করে রোহিঙ্গাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। মিয়ানমার সরকারের বিষয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থার সংকট থাকায় এমন হচ্ছে বলেও মনে করা হচ্ছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইন থেকে এ রোহিঙ্গা ঢল শুরু হয়। বর্তমানে টেকনাফ ও উখিয়ায় ৩৪টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৫০ হাজার। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি। তাছাড়া গত দুই বছরে প্রায় ৯০ হাজার রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নিয়েছে। সর্বশেষ গত ২২ আগস্ট দ্বিতীয় দফার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দিন নির্ধারিত ছিল। কিন্তু শর্ত ছাড়া কোনো রোহিঙ্গা ফিরে যেতে রাজি না হওয়ায় প্রত্যাবাসন স্থগিত করা হয়। তবে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে একটি আন্তর্জাতিক কমিশন গঠনের চিন্তাভাবনাও করছে সরকার।

কাঁচা চামড়ার দর : গত ঈদুল আজহার পর দেশে কাঁচা চামড়ার দর নিয়ে ব্যাপক নৈরাজ্য তৈরি হয়। কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে ফেলে দিয়েছেন অনেকে। মাটিতে পুঁতে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। সরকারের বেধে দেওয়া দামে চামড়া কেনা-বেচা হয়নি। গরিবের হক নিয়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করে একটি সিন্ডিকেট। পরিস্থিতি সামাল দিতে কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ দেয় সরকার। তবে তার আগেই ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে। লোকসানে পড়তে হয় আড়তদার ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি : ঢাকাসহ সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ সরকারকে ব্যাপক চাপে ফেলেছে। শুরুতে এটি রাজধানীতে ব্যাপক আকারে থাকলেও পর্যায়ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। সর্বশেষ ডেঙ্গু পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে থাকলেও সরকারি হিসাবে, প্রায় ৭০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তবে বেসরকারি হিসাবে আক্রান্তের সংখ্যা আরো বেশি হবে। এখনো প্রতিদিন সহস্রাধিক মানুষ সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। প্রাণহানির ঘটনা আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও থামানো যায়নি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ সরকার ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নেয়। আর রোগীদের চিকিৎসা দিতে নেওয়া হয় বিশেষ উদ্যোগ।

ধানের দাম : ধানের দাম নিয়েও ব্যাপক নেতিবাচক পরিস্থিতিতে পড়তে হয় এবার সরকারকে। ধান উৎপাদন করতে যে খরচ হয়েছে, এবার তার চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হয়েছে কৃষককে। ক্ষোভ থেকে টাঙ্গাইলে এক কৃষক পাকা ধানে আগুন ধরিয়ে দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিষয়টি ভাইরাল হয়ে যায়। সরকার কৃষককে সুরক্ষা দিতে চাল আমদানি নিষিদ্ধ করে দেয়। তারপরও ধানের সঠিক দাম পাননি সাধারণ কৃষক। শুধু তাই নয়, পরে ধানের দাম আরো কমে যায়। যদিও কৃষিমন্ত্রী ধানক্ষেতে আগুন দেওয়ার ঘটনাতে রাজনীতি খুঁজেছেন।

ছেলেধরা গুজব : একটি স্বার্থানেষী মহল গুজব ছড়িয়ে দেয়, পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে মাথা দিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যে সারা দেশে গুজবটি ছড়িয়ে পরে। এতে সাধারণ মানুষ ও শিশু কিশোরদের অভিভাবকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অভিভাবকরা সন্তানকে একা ছাড়তে ভয় পেতে থাকেন। আবার বাচ্চাদের মধ্যেও তৈরি হয় ভয়ের। সরকার তথ্য বিবরণী দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনি থামানো কঠিন হয়ে পড়ে। খোদ রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে এক নারীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

প্রিয়া সাহা : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ করেন এনজিও কর্মী প্রিয়া সাহা। বিষয়টি নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। শুরুতে সরকার শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানো সরকারপ্রধান এ ব্যাপারে মন্ত্রী ও দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্কভাবে কথা বলতে নির্দেশ দেন। তবে প্রিয়া সাহার বিতর্কিত অভিযোগে অবাক হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষও। ফলে সরকার শুরুতে কিছুটা অস্বস্তিতে পরলেও পরিস্থিতি দ্রুতই সামাল দিতে পেরেছে। 

বন্যা : ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে এবার দেশের প্রায় অর্ধেক জেলা প্লাবিত হয়। ক্ষতিতে পড়তে হয় কৃষকসহ সাধারণ মানুষকে। শুরুতে ত্রাণ পৌঁছানো নিয়ে ব্যাপক অব্যবস্থাপনার কথা আসে সংবাদমাধ্যমে। প্রাকৃতিকভাবে আসা এই দুর্যোগে সরকারি হিসাবে ৭৫ জনের প্রাণহানির কথা বলা হয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে। সার্বিক বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাককে টেলিফোন করলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে জানান।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads