• বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৫
ads

সরকার

সংসদে প্রধানমন্ত্রী

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করার জন্য নয়, সব প্রতিষ্ঠানকে আরো সক্রিয় রাখার জন্য আমি সদাসর্বদা সচেষ্ট থাকি। তা না হলে খালেদা জিয়ার মতো বেলা ১২টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটালে কি প্রশ্নকারী খুশি হতেন? তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসার রাজনীতিতেও বিশ্বাসী নয়। আমরা যদি তাই

বিশ্বাস করতাম তাহলে এ দেশে বিএনপির অস্তিত্ব থাকত না।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে বিএনপির সংরক্ষিত এই নারী আসনের এমপি রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন তিনি। এর আগে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

রুমিন ফারহানা প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রাখেন, ‘প্রধানমন্ত্রী অনুগ্রহ করে বলবেন কি দেশে বর্তমানে মানুষ হত্যা থেকে মশা মারা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা প্রয়োজন হয়, যাহা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাঙিয়া পড়া, অকার্যকর হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। প্রাতিষ্ঠানিক সফলতা একটি কার্যকর রাষ্ট্রের পূর্বশর্ত। এই অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলো কি রাষ্ট্রপরিচালনায় সরকারের সার্বিক ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে

না?’

জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারপ্রধানের দায়িত্ব হলো, সব মন্ত্রণালয়ের কাজের সমন্বয় করা। মন্ত্রীদের কাজের তদারকি করা। জনগণ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য। আরাম-আয়েশের জন্য আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিনি। আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। যিনি তার জীবনটাই উৎসর্গ করেছিলেন এ দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। তার কন্যা হিসেবে জনগণের প্রতি আমার দায়বদ্ধতার একটা আলাদা জায়গা রয়েছে। আমি সেটাই প্রতিপালনের চেষ্টা করি। সে জন্যই দিনরাত পরিশ্রম করি। কোনো প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করার জন্য নয়, সব প্রতিষ্ঠানকে আরো সক্রিয় রাখার জন্য আমি সদাসর্বদা সচেষ্ট থাকি।

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার নিরলস প্রচেষ্টা এবং আমাদের জনগণের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজকে বাংলাদেশ বিশ্বে একটা মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি জায়গা দখল করেছে। এসব আপনা-আপনি হয়নি। সবার পরিশ্রমে হয়েছে। প্রতিষ্ঠান অকার্যকর থাকলে সব অর্জন সম্ভব হতো না। কারণ রাষ্ট্র একটি যন্ত্রের মতো। এই যন্ত্রের বিভিন্ন কলকব্জা যখন সমন্বিতভাবে কাজ করে তখন রাষ্ট্র ভালো থাকে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র ভালোভাবে কাজ করছে। তা না হলে সংসদ সদস্যের নেত্রী খালেদা জিয়ার মতো ১২টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটালে কি প্রশ্ন করে খুশি হতেন?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হওয়ার কথা বলছেন? অকার্যকর রাষ্ট্রের উদাহরণ তো বিএনপি সৃষ্টি করেছিল। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়-এমন ব্যক্তির কাছ থেকে। প্রধানমন্ত্রী ঘুমিয়ে থাকতেন, সিদ্ধান্ত নিতেন তার ছেলে হাওয়া ভবন থেকে, মন থেকে। মন্ত্রী-সচিবরা হাওয়া ভবন থেকে নির্দেশের অপেক্ষায় প্রহর গুনতেন।

তিনি বলেন, সংসদ সদস্য একটি অনাকাঙ্ক্ষিত, অসংসদীয় ও অবান্তর প্রশ্ন করেছেন। তিনি মানুষ হত্যা আর মশা মারাকে একই সমতলে নিয়ে এসেছেন।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রাণের সংগঠন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ শোষিত, বঞ্চিত, অবহেলিত, পশ্চাদপদ মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামে নিবেদিত। শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামের এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমার বাবা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘকাল কারাবরণ করেছেন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে পিছপা হননি। তিনি জাতিকে মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন। জাতিকে উপহার দিয়েছেন একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। তারপর তিনি যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন করে ক্ষুধামুক্ত-দারিদ্র্যমুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা বিনির্মাণে আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই সংসদ সদস্যের দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ আমার মা, তিন ভাই এবং অন্তঃসত্ত্বা ভাতৃবধূসহ পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে খুনিদের সহায়তায় ক্ষমতায় বসেছিলেন। জিয়াউর রহমানের প্রতিহিংসার বলি হয়ে জেলখানায় নির্মমভাবে নিহত হন জাতীয় চার নেতা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানই হত্যা, ক্যু-এর অপরাজনীতির শুরু করে। সশস্ত্র বাহিনীর শত শত অফিস, সৈনিককে হত্যা করে। ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাটের সংস্কৃতি চালু করে। এটা পুরো প্রজন্মকে নষ্ট করে দেয় জিয়াউর রহমান। তাই বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যের মুখে মানুষ মারার বিষয়টি অবলীলায় চলে। আসলে এটাই তাদের দলীয় আদর্শ। তার স্ত্রী খালেদা জিয়া যে তার চেয়েও এক কাঠি সরেস-সেই প্রমাণ তিনি রেখেছেন এ দেশে জঙ্গিবাদ সৃষ্টি, অগ্নিসন্ত্রাস, বোমা হামলা, মানিলন্ডারিং, এতিমের টাকা আত্মসাৎসহ হেন অপকর্ম নেই যা তিনি, তার ছেলেরা এবং দলের নেতারা করেননি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশ্ন উত্থাপনকারীর সদস্যের দলের নেত্রী খালেদা জিয়াও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার শাসনামলে ২০০১ ২০০৬ পর্যন্ত সময়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টার, মমতাজউদ্দীনসহ আমাদের ২১ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকেসহ আওয়ামী লীগের পুরো নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। আইভি রহমানসহ আমাদের দলের ২২ নেতাকর্মী সেদিন নিহত হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় মদদে খুনের নেশায় মত্ত হয়েছিল তার দল বিএনপি। এই সংসদে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আমি নাকি আমার ভ্যানিটি ব্যাগে গ্রেনেড নিয়ে জনসভায় ছুড়েছিলাম। এসব ধারণা থেকেই প্রশ্ন করে আমাকে খালেদা জিয়ার সমান্তরালে ফেলেছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্পিকার আপনি নিশ্চয়ই ভুলে যাননি ২০১৪ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা। বিএনপির অগ্নিসন্ত্রাসের কথা। প্রশ্নকারী সংসদ সদস্যের দল বিএনপির নারী ও শিশুসহ ৫০০ জন নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে। নির্মমভাবে হত্যা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ২৪ জন সদস্যকে। ৫৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তিন হাজার যানবাহন, ২৯টি রেল, ৯টি লঞ্চ এবং ৭০টি সরকারি অফিসে অগ্নিসংযোগ করেছে। অসংখ্য বৃক্ষনিধনসহ গবাদিপশু আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে। তাদের অগ্নিসন্ত্রাসের হাত থেকে রক্ষা পায়নি শিশু, মহিলারাও।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ মানুষ হত্যার রাজনীতি করে না। আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসার রাজনীতিতেও বিশ্বাসী নয়। আমরা যদি তা-ই বিশ্বাস করতাম তাহলে এ দেশে বিএনপির অস্তিত্ব থাকত না। কারণ বিএনপি দ্বারা আমরা যে পরিমাণ হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়েছি তা আর কেউ হয়নি।

৯৩ শতাংশ বাড়ি বিদ্যুতায়িত : এর আগে গতকাল  দুপুরে গণভবন ভিডিও কনফারেন্সে নতুন সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের মালিকানাধীন কমিউনিটি ব্যাংক- বাংলাদেশের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার দেশের ৯৩ শতাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছেন। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ২২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এছাড়া আইনশঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পুলিশব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে সরকারে আসতে না পারলেও অনেকগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র রেখে যাই। কিন্তু বিএনপি অর্থ-সম্পদ অর্জনেই বেশি ব্যস্ত ছিল। আমরা যেসব কাজ শুরু করেছিলাম তারা যদি সেগুলো শেষ করত, তাহলে জনগণ স্বস্তি পেত। যে প্রকল্পগুলো শেষের দিকে ছিল, তারা শুধু সেগুলো সম্পন্ন করেই তৃপ্ত। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার চার হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ রেখে গিয়েছিল, সেটা বিএনপি তিন হাজার ২০০ মেগাওয়াটে নামিয়ে এনেছিল। 

তিনি আরো বলেন, আমরা সাক্ষরতার হার বাড়িয়ে গিয়েছিলাম। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে দেখি তা কমে গেছে। গ্যাস বিক্রির জন্য আমার ওপর চাপ ছিল ২০০১ সালে। আমরা বলেছিলাম, আমাদের চাহিদা জেনে ৫০ বছরের রিজার্ভ রেখে তারপর আমরা বিক্রি করব। কিন্তু বিএনপি রাজি হয়ে গিয়েছিল। গ্যাস নেবে যুক্তরাষ্ট্র, কিনবে ভারত। যে জন্য ক্ষমতায় আসতে পারিনি। আমাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস  না থাকায় বর্তমানে এলএনজি এনে চাহিদা মেটানো হচ্ছে। 

এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার জনবান্ধব পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে। জনগণ যেন স্বল্প সময়ের মধ্যে পুলিশের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পুলিশ গড়ে তোলা হচ্ছে। পুলিশের সেবা তাৎক্ষণিক পেতে জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ চালু করা হয়েছে। পুলিশ খুব দক্ষতার সঙ্গে এক্ষেত্রে কাজ করছে।

পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে নতুন প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, জনবল বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে সরকার, যার সুফল ইতোমধ্যে জনগণ পেতে শুরু করেছে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও মাদক দমনে পুলিশের দক্ষতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে এক্ষেত্রে নারী পুলিশ সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হচ্ছে।

তাছাড়া মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলছে এবং চলবে। এক্ষেত্রে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো সক্রিয় হতে হবে। কারণ মাদক পরিবার ও সমাজকে নষ্ট করে দেয়। দেশে আন্দোলনের নামে যেভাবে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা হয়েছে, সেভাবে পুলিশের ওপরও হামলা হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা যেভাবে জনগণের সেবা করছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads