• রবিবার, ৭ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
করোনা মোকাবিলায় নিরলস নজরদারি প্রধানমন্ত্রীর

সংগৃহীত ছবি

সরকার

করোনা মোকাবিলায় নিরলস নজরদারি প্রধানমন্ত্রীর

  • হাসান শান্তনু
  • প্রকাশিত ০৪ এপ্রিল ২০২০

করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) মোকাবিলা, সার্বিক অবস্থা এবং উদ্ভূত কোনো পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া ও নির্দেশনা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সারাক্ষণ খোলা থাকছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। রোগটির কারণে দেশে সৃষ্ট স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে সরকার ও প্রশাসনের নানা কার্যক্রমের বিষয়ে সার্বক্ষণিক খবর রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। দিচ্ছেন প্রশাসন ও জনগণকে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা। ভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠ প্রশাসন কীভাবে কাজ করছে, তা খোঁজ নিতে ভিডিও কনফারেন্সে তৃণমূলের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈশ্বিক দুর্যোগ কোভিড-১৯ প্রতিরোধে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কার্যক্রম নিচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনাতেই। চলমান পরিস্থিতিতে সরকারি কার্যক্রমে অনিয়ম হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার যে ঘোষণা তিনি ইতোমধ্যে একাধিকবার দিয়েছেন, তার কঠোর ও নির্মোহ প্রয়োগেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নজরদারি করছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রজ্ঞাপূর্ণ নির্দেশনা ও অভয় বাণীর যথাযথ বাস্তবায়ন হলে দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থা দৃঢ় করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র বলছে, গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনায় আক্রান্ত শনাক্ত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে যথাসম্ভব দ্রুত কোভিড-১৯ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে একাধিক কমিটি গঠিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) খোলা হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি জাতীয় কমিটি গঠিত হওয়ার পাশাপাশি প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও কমিটি হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এর অধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও দুটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানেরও (আইইডিসিআর) আছে আলাদা কন্ট্রোল রুম। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি কন্ট্রোল রুমও কোভিড-১৯ নিয়ে কাজ করছে। সব কক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। দেশে করোনায় আক্রান্ত শনাক্ত হওয়ার পরই ‘প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় ও ত্রাণ তৎপরতা মনিটরিং সেল’ সার্বক্ষণিক খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সূত্র জানায়, করোনা পরিস্থিতিতে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী আগামীকাল ৫ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করবেন। আগামীকাল রোববার তার সরকারি বাসভবন গণভবনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম। তিনি বলেন, ‘রোববার সকাল ১০টায় গণভবনে এ সংবাদ সম্মেলন হবে।’

এর আগে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব উত্তরণের লক্ষ্যে আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ সংক্রান্ত এক সভা গণভবনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে বর্তমান পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব উত্তরণের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনার পাশাপাশি বৃহস্পতিবারের সভার বিষয়েও রোববারের সংবাদ সম্মেলনে তিনি কথা বলবেন। এ সময় তিনি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারেন বলেও সূত্র বাংলাদেশের খবরের কাছে উল্লেখ করে।

করোনা পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তনয়া শেখ হাসিনা গত ২৫ মার্চ প্রথম জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। এতে তিনি বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে মানুষকে প্রাণঘাতী ভাইরাসটির সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার কথা জানান। জাতির উদ্দেশ্যে তার দেওয়া ভাষণ ও বিভিন্ন নির্দেশনার পর ভাইরাসটির মোকাবিলায় সরকারের কার্যক্রম আরো গতি পায়। ভাইরাসটি মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) করণীয় যে ছয়টি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, বাংলাদেশও তখন থেকেই এসব বিষয়ে যথাসম্ভব প্রস্তুতি নেয়।

এ ছাড়া জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর সবশেষ ভাষণের পর থেকে করোনা রোধে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের নানা কঠোর ও কার্যকর উদ্যোগ দেশজুড়ে দৃশ্যমান। রোগটির চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষার আওতা বাড়ানো, ঢাকার বাইরে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা ও পর্যায়ক্রমে তা সারা দেশে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু হয়। মূলত প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় করোনার সংক্রমণ রোধে কঠোর অবস্থানে সরকার। ভাইরাসটি রোধে সতর্কতা হিসেবে ‘সামাজিক দূরত্ব’ (সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং) রক্ষা ও সন্দেহভাজনদের ‘কোয়ারেন্টাইনে’ থাকতে বাধ্য  করা ও তা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য মাঠে নামে প্রশাসন।

এরপর প্রধানমন্ত্রী গত ২৯ মার্চ পরামর্শ ও আহ্বান সংবলিত চারটি বার্তা দেন জনগণের উদ্দেশ্যে। বার্তায় তিনি করোনা মোকাবিলায় নাগরিকদের করণীয়, রোগটির প্রতিরোধে সরকারের কাছে সুরক্ষা ও চিকিৎসা সামগ্রীর ঘাটতি না থাকা, করোনায় জনগণকে অযথা ভীত না হওয়া এবং বৈশ্বিক এ দুর্যোগকালে সবাইকে সহনশীল ও সংবেদনশীল হওয়ার কথা তুলে ধরেন।

দেশের ৬৪ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ৩১ মার্চ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের ৮ বিভাগীয় কমিশনাররাও ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিলেন। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠ প্রশাসন কীভাবে কাজ করছে, তা খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি তাদের দিকনির্দেশনা দেন তিনি। ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে করোনা পরিস্থিতিতে কর্মহীন হওয়া দেশের দরিদ্র লোকজনের প্রণোদনাসহ যেসব প্রতিশ্রুতি দেন তিনি, সেসব বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেন ভিডিও কনফারেন্সে। এ সময় অন্যান্য প্রসঙ্গের পাশাপাশি সরকারের গৃহীত খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা প্রকল্প বাস্তবায়নে যে কোনো দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে ‘অবশ্য পালনীয়’ হিসেবে গত ২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী ৩১ দফা নির্দেশনা দেন। তার এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে- ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, করোনা উপসর্গ দেখা দিলে লুকিয়ে না রেখে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া, হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা রোগীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ, ত্রাণকার্যে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা।

পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তালিকা করে তাদের কাছে খাদ্য পৌঁছানো, উৎপাদন অব্যাহত রাখার স্বার্থে জমি পতিত ফেলে না রাখা, বাংলা নববর্ষে (১ বৈশাখ) সব জনসমাগম বর্জন করা, বাজার মনিটরিং, গণমাধ্যম কর্মীদের যথাযথ দায়িত্ব পালন এবং গুজব ছড়ানো প্রতিরোধসহ জনগণ এবং প্রশাসনের জন্যও ৩১ দফায় নির্দেশনা রয়েছে।

করোনা প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা নির্দেশনা পালন করতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল শুক্রবার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী প্রশাসন, সেনাবাহিনী, আমাদের নেতা কর্মী, জনপ্রতিনিধি ও দেশের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী সবাই এগিয়ে আসছেন। চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের ওপর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন। দলের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের বিত্তবানরাও এগিয়ে এসেছেন। এটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক দিক।’

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে ‘বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন’ (বিএমএ) এবং ‘স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ’ (স্বাচিপ) ৫০০ চিকিৎসকের তালিকা তৈরি করেছে, যারা জনগণকে সেবা দেবেন। এ ছাড়া তার আহবানে স্বেচ্ছায় সেবা দিতে এগিয়ে এসেছেন প্রায় ১৩ হাজার চিকিৎসক। এখন অনলাইনে বিভিন্ন সেবা দিলেও প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে প্রস্তুত তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, শুধু চিকিৎসকরা অনলাইনে সাত ধাপের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই তালিকাভুক্ত স্বেচ্ছাসেবক হতে পারবেন। যারা আগ্রহী, তাদের অবশ্যই বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) নিবন্ধন নম্বর থাকতে হবে। সেই নম্বর দিয়ে মুক্তপাঠ নামের ওয়েব সাইটে ঢুকে ৭টি ধাপে উত্তীর্ণ হতে হবে। এখন পর্যন্ত উত্তীর্ণ হয়েছেন ১২ হাজার ৪৮ জন চিকিৎসক। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন-এটুআই, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও তথ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে পরিচালনা করছে স্বেচ্ছাসেবকদের।

দলীয় সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পাশাপাশি দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী ও বিশেষ করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জনগণের পাশে দাঁড়াতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। দল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য (এমপি) ও মন্ত্রিসভার সদস্যসহ শীর্ষ নেতাদের এলাকার জনগণের পাশে দাঁড়াতেও নির্দেশনা দেন দলীয়প্রধান। কোনো সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিজের সংসদীয় এলাকার জনগণের পাশে এ মুহূর্তে না থাকলে তাদের তালিকা করতে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়কে নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের নিজ নিজ এলাকায় থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরকারের কার্যক্রমে স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করতে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে। দলের সভাপতির নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জনগণের পাশে দলীয় সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে নেতাকর্মীরা এখন আছেন বলে দাবি ক্ষমতাসীন দলটির শীর্ষ নেতাদের।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads