• মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫
ads
অনলাইনে জমজমাট ঈদের বাজার

মডেল প্রিয়াঙ্কা পাণ্ডে

বাংলাদেশের খবর

জীবন ধারা

অনলাইনে জমজমাট ঈদের বাজার

  • প্রকাশিত ২৭ মে ২০১৮

সাধারণ সুঁই-সুতো থেকে শুরু করে বিশাল আকারের গরু- কী এমন আছে, যা অনলাইনে এখন পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে ধীরে ধীরে নয়, অনেকটা দ্রুতহারেই বাড়ছে অনলাইনে কেনাকাটা। ডিজিটাল বাংলাদেশের এটাই বাস্তব রূপ। অনলাইনের ওপর ভিত্তি করে দেশে নিত্যনতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। পণ্য সমাহারেও এসব প্রতিষ্ঠানের বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। ইদের কেনাকাটাকে সামনে রেখে, আপনিও একবার ঢুঁ মারতে পারেন ডিজিটাল বাজারগুলোতে...

 

পরাগ মাঝি

বাবার জন্য এবার একটি পাঞ্জাবি, দামি একটি লুঙ্গিও চাই। বয়স হয়ে গেছে। অবসরে আছেন। এখনই তো এসব পরার সময়। মার জন্য না হয় কিছু না-ই কিনলাম। একটা ব্লেন্ডার কিনে নিয়ে গেলে মন্দ হয় না। এটা তার রান্নাঘরের কাজে আসবে। তারপর আছে ছোট ভাই শফিক। ইন্টারমিডিয়েটে পড়ছে। ফোন করে সে আগেই বলে রেখেছে তার ২৯ কোমরের জিন্স প্যান্ট আর ভালো ব্র্যান্ডের টিশার্ট চাই। আর ক্লাস নাইন পড়ুয়া ছোট বোন সুমির আবদার চামড়ার স্যান্ডেল। কিন্তু স্যান্ডেল ছাড়াও একটি জামা উপহার দিয়ে তাকে চমক দিতে হবে। চাচা আর চাচির আলাদা সংসার হলেও তাদের জন্যও তো কিছু কিনতে হবে। বাড়িতে আছে কাজের মহিলা মরিয়ম আর তার মেয়ে আসমা। ঈদের আনন্দকে আরো উপভোগ্য করতে তাদের দুজনকেও কিছু উপহার দিতেই হবে। সে ক্ষেত্রে মরিয়মের জন্য একটি শাড়ি আর আসমার জন্য একটি জামা। এরকমভাবে ধীরে ধীরে তালিকাটা আরো দীর্ঘ হবে। আর কেনাকাটার একটা বিশাল অংশ তো নিজের জন্যই।

রাজধানীর পান্থপথে একটি কফি শপে বসে আড্ডাচ্ছলে এই কথাগুলো জানালেন, ব্যাংকার শারমিন শিলা। সংসারের বড় মেয়ে। পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার জন্যই এখনো বিয়ে করেননি। যদিও পরিবার থেকে তোড়জোড় আছে বিয়ে দেওয়ার।

এবার রোজার শুরু থেকেই ঈদের কেনাকাটা শুরু করে দিয়েছেন শিলা। প্রতিবারই রমজান মাসে বাড়ি যাওয়ার প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে বসুন্ধরা, নীলক্ষেত থেকে শুরু করে বঙ্গবাজারেও ছুটোছুটি করতে হয় তাকে। কিন্তু এবার তিনি অনেকটাই নির্ভার। কোনো বিশেষ প্রয়োজন না হলে এবারের সব কেনাকাটাই তিনি করবেন ঘরে বসে। অনলাইনে। এখনো তেমন কিছু কেনা না হলেও প্রায় প্রতিদিনই ঢুঁ মারছেন কয়েকটি অনলাইন শপে। দরদাম দেখছেন।

‘অনলাইনে কেনাকাটার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, নির্ভার থাকা। কারণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার থাকায় দামে তারতম্য হওয়ার সুযোগ নেই বেশি। ঘরে বসেই অর্ডার করো, আর পণ্য বুঝে নাও’, বললেন শিলা।

কিন্তু এমন হয় না কখনো যে, কোনো প্রতারণার ঘটনা ঘটল? এ প্রশ্নেও শিলার উত্তর ইতিবাচক। জানালেন, অনলাইন কেনাকাটায় তিনি নতুন। ইতোমধ্যেই বেশ কিছু অর্ডার করে পণ্য বুঝে পেয়েছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে এখনো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়নি তাকে।

তবে, অনলাইন কেনাকাটায় নিজের অসন্তুষ্টির কথা জানালেন স্কুল শিক্ষিকা রুপা মজুমদার। একটি সানগ্লাস দেখে অর্ডার করেছিলেন তিনি। নির্দিষ্ট দিনে সানগ্লাসটি বুঝে পাওয়ার পর দাম পরিশোধ করেন। কিন্তু প্যাকেট খুলেই তার মনে হলো ছবিতে সানগ্লাসটিকে যেমন গর্জিয়াস লাগছিল বাস্তবে ততটা নয়। আর গ্লাসটি তার মুখের তুলনায় অনেকটা বড় মনে হচ্ছিল। টাকাটা জলে গেছে ভেবে, তিনি আর যোগাযোগও করেননি ওই অনলাইন সাইটটির সঙ্গে। অর্ডারকৃত পণ্যের সঙ্গে হাতে পাওয়া পণ্যের মাঝে বৈসাদৃশ্য পাওয়ার অভিযোগ করেন অনেকেই। তবে, বর্তমানে নামিদামি যেসব অনলাইন সাইট আছে ক্রেতা সন্তুষ্টির মধ্য দিয়েই তারা তাদের অবস্থান গড়েছে।

এদিকে ঈদকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে অনলাইন সাইটগুলোও। ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন পণ্যে তারা বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। ব্যাপক পণ্য সমাগমও করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

চলছে ছাড়ের মৌসুম

ঈদকে সামনে রেখে প্রায় প্রত্যেকটি অনলাইন শপই বিভিন্ন ছাড় দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। এই মৌসুমে ব্যাপক পণ্য সমাগমও করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের ফ্যাশন পণ্যে অনলাইন শপ দারাজ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে। মেয়েদের রূপচর্চা বিষয়ক কিছু পণ্যে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে একই প্রতিষ্ঠান। অনলাইন শপ ‘দারাজ’ ঈদের কেনাকাটায় ৩০০ টাকা পর্যন্ত ক্যাশব্যাক অফার দিয়ে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বাগডুম ঈদ উপলক্ষে ২ হাজার টাকার বেশি কেনাকাটা করলে ৩০০ টাকা পর্যন্ত ক্যাশব্যাকের পাশাপাশি বিকাশ পেমেন্টে ২০ শতাংশ ইনস্ট্যান্ট ক্যাশব্যাকের অফার দিয়েছে। বিকাশের অফারটি আছে অথবা, প্রিয়শপ থেকে শুরু করে বেশকিছু অনলাইন শপে। পিকাবোতে রমজান উপলক্ষে বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্যে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে। এ ছাড়াও প্রায় প্রত্যেকটি শপই ঈদের জন্য রেখেছে তাদের বিশেষ অফার।

কেনাকাটায় নারীরা এগিয়ে

বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ই-কমার্সের যে দিকটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তা হলো অনলাইন শপিং। কেনাকাটা করতে এখন আর যানজট ঠেলে দোকানে গিয়ে সময় অপচয় করতে হচ্ছে না। চাইলে যেকোনো পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে হাতে হাতে।

তবে অনলাইন শপিংয়ে পুরুষদের তুলনায় নারীরাই বেশি এগিয়ে। অনলাইন শপিং সেন্টার বা ফেসবুক পেজের মাধ্যমে যারা শপিং সেন্টার খুলে বসেছেন তাদের মতে, সারাদিনে যা অর্ডার আসে তার সিংহভাগই দেন নারীরা। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্তরা। এ বিষয়ে কিনলেডটকমের প্রধান নির্বাহী এবং ই-ক্যাবের ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান সোহেল মৃধা বলেন, বর্তমানে অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে আমরা অনেক বেশি সাড়া পাচ্ছি। সাধারণ ক্রেতারা এখন অনলাইন কেনাকাটায় বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। অবশ্যই এটা একটা সম্ভাবনাময় খাত।

তিনি বলেন, সারাদিন ১৫০ থেকে ২০০ কাস্টমারের কল পাই আমরা। পণ্যের বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চান তারা। সাধারণত অনলাইন কেনাকাটায় নারীরাই বেশি আগ্রহী এবং তাদের কাছ থেকেই বেশি অর্ডার আসে।

অনলাইন শপিংয়ে নারীরা এগিয়ে আছেন জানিয়ে রঙ্গিলা শপের স্বত্বাধিকারী শারমিন আক্তার বলেন, বিভিন্ন পণ্য দেখে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটার বিষয়টা মেয়েদের এমনিতেই পছন্দের। বর্তমানে অনেক অনলাইন শপের পাশাপাশি প্রচুর ফেসবুক পেজের মাধ্যমেও কেনাকাটা হচ্ছে।

তিনি বলেন, নারীরা এসব সাইট বা ফেসবুক পেজে ভিজিট করে নানা ধরনের পণ্য দেখার সুযোগ পাচ্ছেন এবং দরদাম তুলনা করতে পারছেন। আর বাজারে গিয়ে কেনাকাটার জন্য যানজট, ভিড়, দামের তারতম্য উপেক্ষা করতেই তারা ঝামেলাহীন অনলাইন শপিংয়ে বেশি আগ্রহী।

অনলাইনে নিয়মিত কেনাকাটা করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানিয়া রহমান। তিনি বলেন, যানজটের ঝুঁকি এড়ানো, সময় বাঁচানোর কারণে অনলাইন কেনাকাটায় আমি আগ্রহী।

তিনি আরো জানান, ইন্টারনেটের সাহায্যে যখন খুশি তখন কেনাকাটা করা যায় এবং অনলাইনে অনেক পণ্যের সমাহার আছে; তাই বিচার বিশ্লেষণ, দরদাম দেখে অনলাইন কেনাকাটা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলো

বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি পণ্য বিক্রি হয় অনলাইনে। আর প্রতিদিন ২০ হাজারেরও বেশি অনলাইন অর্ডার ডেলিভারি দেওয়া হয়। ঈদ মৌসুমে এই পরিসংখ্যানটি কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। দেশে ওয়েব ভিত্তিক অনলাইন শপ আছে সহস্রাধিক। আর ফেসবুক ভিত্তিক আছে ১০ হাজারেরও বেশি। অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে সাধারণত পরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত শপগুলোতেই পণ্য অর্ডার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন ক্রেতারা। এ ক্ষেত্রে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যায়।

দেশে প্রথম সারির কয়েকটি অনলাইন শপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দ্বারাজ ডটকম (daraz.com.bd), আজকের ডিল (ajkerdeal.com), বাগডুম (bagdoom.com), পিকাবো (pickabo.com), ক্লিকবিডি (clickbd.com), রকমারি (rokomari.com), চালডাল (chaldal.com), অথবা (othoba.com), কায়মো (kaymu.com.bd), আমি কিনি (amikinee.com), প্রিয় শপ (priyoshop.com), বিডি হাট (bdhaat.com), বিডি শপ (bdshop.com) ইত্যাদি। এ ছাড়াও পিছিয়ে থাকা অনলাইন শপগুলোও প্রতিযোগিতায় আসার জন্য যথোপযুক্ত সেবা দিয়ে ক্রেতা সন্তুষ্টি আদায়ের চেষ্টা করছে। হাতে সময় না থাকলে অনলাইনে ঘুরে ঘুরে আপনিও করে নিতে পারেন ঈদের কেনাকাটা।

ঠকতে না চাইলে...

অনলাইনে শপিং বর্তমান সময়ে অনেক জনপ্রিয় হলেও, এই মাধ্যমে অনেকেরই খারাপ অভিজ্ঞতাও হয়। দেখা যায়, যা ভেবে পণ্যটি অর্ডার করা হয়েছিল, বাস্তবে তার চিত্রটি আসলে তা নয়। তাই অনলাইন কেনাকাটায় অবশ্যই কিছু বিষয়ে ক্রেতাকে নজর দিতেই হবে-

১. আসল ছবি : ক্যাটালগে অনেক সময় এডিট করা ছবি ব্যবহার করা হয়। ছবিতে আকর্ষণীয়, কিন্তু বাস্তবে হয়তো তেমন নয়। তাই ক্যাটালগে যে ছবিটা দেখছেন ইনবক্সে তার আসল ছবিটি দেখে নিতে চেষ্টা করুন।

২. মূল্য যাচাই : একই পণ্য বিভিন্ন সাইটে বিভিন্ন মূল্যের হতে পারে। তাই কেনার আগে সাইটগুলো আগে ঘুরে মূল্য ও মান যাচাই করুন। পারলে বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলুন।

৩. শরীরের মাপ জানা : কোনো পোশাক অর্ডারের আগে নিজের শরীরের সঠিক মাপ জেনে নিন। অন্যের জন্য কিনতে চাইলেও তার শরীরের মাপটা জেনে নিন। তা না হলে ফিটিংয়ে সমস্যা হতে পারে।

৪. পণ্য-সংক্রান্ত তথ্য পর্যবেক্ষণ : কোনো পণ্য পছন্দ হলে, এর পাশে দেওয়া তথ্যগুলো ভালো করে যাচাই করে নিন। পণ্যটি ধোয়া কিংবা পরিষ্কারের নিয়ম কী পড়ে নিন; যেন, কেনার পর কোনো ভুলে এটি নষ্ট হয়ে না যায়।

৫. অন্যদের মন্তব্য পড়ুন : অনেকেই আছেন আপনার আগেই পণ্যটি কিনেছেন। তাই পণ্যটি ব্যবহার করে অন্যরা কী মত জানিয়েছে তা ভালো করে পড়ুন।

৬. ফেরতযোগ্য কি না দেখুন : অনেক সময় খুব ভালো একটি পোশাক কেনার পর দেখলেন আপনাকে ভালো লাগছে না। এমন সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে আগেই দেখে নিন, পণ্যটি ফেরতযোগ্য বা পরিবর্তন করে নেওয়া যাবে কি না।

৭. নকল পণ্য চিনুন : আসল পণ্য কিনতে চান তাহলে ভেরিফায়েড পেজ থেকে কেনাই ভালো।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads