• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
বৃষ্টিতে রাজধানী ‘অথৈ সাগর’

ভারী বর্ষণে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে জলজট সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। ছবিটি মিরপুর এলাকার

ছবি: বাংলাদেশের খবর

মহানগর

চব্বিশ ঘণ্টায় ১১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত ঢাকায়

বৃষ্টিতে রাজধানী ‘অথৈ সাগর’

# যানজট ও পরিবহন সঙ্কটে নাকাল মানুষ # মতিঝিল-ঝিগাতলা রিকশাভাড়া ৪০০ টাকা # বঙ্গভবনের পাশে ফুটপাথে ২ ফুট পানি

  • রানা হানিফ
  • প্রকাশিত ২৫ জুলাই ২০১৮

প্রচণ্ড তাপদাহের পর রাজধানীতে বৃষ্টি শুরু হয় গত রোববার রাত ১২টার দিকে। বিরতি দিয়ে কখনো গুঁড়িগুঁড়ি আবার কখনো মুষলধারে সোমবার রাত ৯টা পর্যন্ত অব্যাহত ছিল এ বৃষ্টি। এর পর ঘণ্টাতিনেক বিরতি। রাত ১২টার পর ফের শুরু হয় মুষলধারে। গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৬টা পর্যন্ত রাজধানীতে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ৫৫ মিলিমিটার। ভোর ৬টা থেকে পরবর্তী ১২ ঘণ্টায় ঝরেছে ৫৯ মিলিমিটার। সব মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টায় ঝরেছে ১১৪ মিলিমিটার।

গতকাল রাজধানীবাসীর দিনটা শুরু হয়েছে বৃষ্টি আর কাদাপানিতে ভিজে একাকার হয়ে। টানা বর্ষণে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো ছিল পানির নিচে। কোথাও কোথাও পানি জমে কোমর পর্যন্ত। ঢাকা শহর যেন পরিণত হয় ‘অথৈ’ সাগরে। এতে বেশ কিছু সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সারাটা দিন যানজট ও পরিবহন সঙ্কট ছিল রাজধানীতে। সকাল থেকেই কর্মমুখী মানুষকে পড়তে হয় ভোগান্তিতে। ভোগান্তিটা ছিল ঘরে ফেরা অবধি।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বিকাল ৫টা পর্যন্তও নামেনি আসাদগেটের আড়ং থেকে ধানমন্ডির শুক্রাবাদ, সোবহানবাগ পর্যন্ত মিরপুর সড়কের পানি। কোমর পর্যন্ত পানি ছিল ধানমন্ডির গুরুত্বপূর্ণ ২৭ নম্বর সড়কের পুরোটাজুড়েই। সাইলেন্সার পাইপে পানি ঢুকে এ সড়কে বিকল হয়ে পড়ে অর্ধশতাধিক প্রাইভেটকার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, হিউম্যান হলার ও মোটরবাইক। সিটের ওপর পা তুলে বসে থাকতে হয়েছে রিকশাযাত্রীদের। এই সড়কের পানির ঢল নামে পার্শ্ববর্তী লালমাটিয়া আবাসিক এলাকার গলিগুলোতেও। এই এলাকার বেশ কিছু ভবনের নিচতলায়ও পানি জমে।

ভয়াবহ চিত্র ছিল পান্থপথ, শংকর, ধানমন্ডি ১৫ নম্বর ও জিগাতলা এলাকার। গত সোমবার রাত থেকেই ঝিগাতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে পোস্ট অফিস পর্যন্ত পুরো সড়ক ছিল কোমর পানির নিচে। মঙ্গলবার এই সড়কের পাশের অধিকাংশ বাণিজ্যিক ভবন, বন্ধ ছিল বিপণিবিতানগুলোর নিচতলার দোকানপাট। বিকালে বৃষ্টি থামলেও সন্ধ্যা পর্যন্ত সরেনি এই সড়কের পানি। টানা বর্ষণে পান্থপথ থেকে সায়েন্সল্যাব পর্যন্ত গ্রিন রোডের পুরোটাই রূপ নিয়েছিল নদীর। পানিতে গ্রিন রোডের উভয়পাশের গলিগুলো ডুবে গিয়ে একাকার হয়ে যায়। তলিয়ে যায় আশপাশের দোকানপাট ও ভবনের নিচতলা। পানির কারণে এ সড়কেও বিকল হয় বেশ কয়েকটি মোটরযান। কথা হয়, গ্রিন রোডের ফুটপাথের ফল ব্যবসায়ী আনিসের সঙ্গে। প্রায় হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে বেচাকেনা করছিলেন আনিস। তিনি বলেন, গতকাল (সোমবার) দুপুর থেকেই পুরো গ্রিন রোড পানির নিচে। রাতে টানা বৃষ্টি আর আজ (মঙ্গলবার) সকাল থেকে বৃষ্টিতে পুরো এলাকা নদী হয়ে গেছে।

এত পানির মধ্যেও দোকান খোলার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, গ্রিন রোডের দুই পাশে অনেকগুলো হাসপাতাল। এখানে ফলের বেচাকেনা বেশি হয়। তাই গতকাল থেকে অন্যান্য দোকান খোলা না থাকলেও আমাদের মতো ফলের দোকানদাররা দোকান খুলেছে।

এদিকে, বরাবরের মতো জলজট ছিল রাজধানীর মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও এবং তালতলা এলাকায়। মিরপুর ১, ২, ১০, ১১, ১২ নম্বর সোমবার রাত থেকেই ছিল পানির নিচে। আর গতকালের বৃষ্টিতে তা যেন পরিণত হয় ‘অথৈ’ সাগরে। মিরপুর ১০ নম্বর থেকে আগারগাঁও আইডিবি ভবন পর্যন্ত সড়কের উভয় পাশ বৃষ্টির পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়ায় পানি জমে কোমরের ওপরে। এ সড়কে সকাল থেকেই ছোট আকারের কোনো যানবাহন দেখা যায়নি। এ রুটে চলাচলকারী বেশ কয়েকটি মিনিবাসের ইঞ্জিনে পানি ঢুকে বিকল হওয়ারও ঘটনা ঘটে। এতে সড়কটিতে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি ছিল তীব্র যানজট। অনেকেই মোটরযান এড়িয়ে চড়েছেন রিকশা ও ভ্যানে। চড়তে হয়েছে সিটের ওপর পা তুলে।

মিরপুর ১২ নম্বর থেকে কারওয়ান বাজারের অফিসে বাসার সাধারণ পোশাক পরেই বের হন কম্পিউটার প্রকৌশলী শাকিল রেজা জোয়ার্দার। তিনি বলেন, রাত (সোমবার) থেকে বৃষ্টি, সকালেও একই অবস্থা। যখন বুঝছি বৃষ্টি থামার লক্ষণ নেই, রাস্তায় কোমর পানি জমেছে সেটা আগেই জানতাম, তাই বাসার ক্যাজুয়াল ড্রেস আর রেইনকোট পরেই অফিসের উদ্দেশে বের হয়েছি। আর অফিস ড্রেস ছিল ব্যাগে। ১০ নম্বর থেকে বাস পাওয়া যায়নি। অটোরিকশা, ক্যাব কিংবা রাইড শেয়ারিংয়ের কোনো বাইকও ছিল না। পরে ১০০ টাকা দিয়ে মিরপুর দশ নম্বর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত যাই ভ্যানে। পুরোটা রাস্তা চালক টেনে নিয়েছেন, পেছন থেকে ঠেলে তাকে হেল্প করেছে দুটি কিশোর। ভ্যানের ওপরে বসেও রেহাই পাইনি। ঢেউয়ে ভিজতে হয়েছে সবাইকে।

মঙ্গলবারের টানা বর্ষণে ডুবে ছিল মিরপুরের রূপনগর, ইসিবি মোড়, বনানী-কাকলী মোড় থেকে মহাখালী আমতলী সড়ক পর্যন্ত। উত্তরার জসিম উদ্দিন মোড়সহ ওই সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ছিল হাঁটুপানি। তেজগাঁও শিল্প এলাকার অধিকাংশ সড়কেই পানি জমে এক থেকে দুই ফুট পর্যন্ত। জলাবদ্ধতার ভয়াবহতা ছিল ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল-দিলকুশায়। দৈনিক বাংলা মোড় থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বর পর্যন্ত রাস্তার উভয়পাশে হাঁটু সমান পানি জমে। মতিঝিল সিটি সেন্টারের সামনের অবস্থা ছিল আরো ভয়াবহ। একই চিত্র ছিল নটর ডেম কলেজ, আরামবাগ, ফকিরেরপুল মোড় পর্যন্ত। কমলাপুর থেকে শাহজাহানপুরের পুরো সড়কে ছিল কাদাপানি।

চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে গুলিস্তান থেকে টিকাটুলিগামী মোটরযান আর সাধারণ যাত্রীদের। বঙ্গভবনের দক্ষিণ পাশের সড়কের পাশের ফুটপাথেও পানির উচ্চতা ছিল দুই ফুটের বেশি। দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাচোরা এই সড়কে বেশ কয়েকটি রিকশা উল্টে যায় যাত্রীসহ। দুপুর ১টার দিকে মালঞ্চ পরিবহনের একটি বাস রাস্তার মাঝখানে বিকল হয়ে পড়লে টিকাটুলি মোড় থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত তীব্র যানজট লেগে যায়। এদিকে গুলিস্তান মোড় থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদ অন্যদিকে বাংলাদেশ অলিম্পিক ভবন (বঙ্গভবনের সামনে) পর্যন্ত দুই পাশের রাস্তায় জমে হাঁটুপানি। বিকাল সাড়ে ৪টার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুটো সাকার মেশিন দিয়ে এই সড়কের পানি সরানোর চেষ্টা চালানো হয়।

টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি পরিবহন সঙ্কটে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে অফিস শেষে ঘরমুখো মানুষকে। দুপুর থেকেই রাজধানীতে গণপরিবহনের চলাচল ছিল সীমিত।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে কথা হয় বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাসরিন আক্তার লীনার সঙ্গে। তিনি বলেন, অফিসের কাজ শেষে সাড়ে ৫টায় বের হয়েছি। প্রায় এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও ঝিগাতলা মোহাম্মদপুরের কোনো বাস পাচ্ছি না। দু-একটা এলেও তা আরামবাগ থেকেই যাত্রীভর্তি হয়ে আসছে। দীর্ঘক্ষণ ধরে রাইড শেয়ারিংয়ে কল করেও বাইক-ক্যাব কোনো কিছুই পাচ্ছি না। রিকশাওয়ালারাও মনগড়া ভাড়া হাঁকছে। মতিঝিল থেকে ঝিগাতলার ভাড়া চাচ্ছে সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা।

মঙ্গলবার রাত ৮টা পর্যন্ত আবহাওয়া দফতরের সর্বশেষ বার্তায় জানা যায়, আজ বুধ ও আগামীকাল বৃহস্পতিবারও রাজধানীসহ সারা দেশে বৃষ্টির এ প্রবণতা থাকতে পারে। তবে বর্ষণের মাত্রা কিছুটা কমবেশি হতে পারে।

আবহাওয়াবিদ রুহুল কুদ্দুস বাংলাদেশের খবরকে বলেন, এখন পূর্ণ বর্ষা মৌসুম। রোববার থেকে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হচ্ছে সেটা বছরের স্বাভাবিক বর্ষণই। আসলে জলাবদ্ধতার কারণে সবার কাছে বৃষ্টির পরিমাণটা বেশি বলে মনে হচ্ছে।

তিনি বলেন, উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর এলাকায় মৌসুমি বায়ুর প্রবল বিস্তার রয়েছে, তা দেশের ওপর দিয়েও প্রবাহিত হচ্ছে। মৌসুমি বায়ু এই প্রভাব আরো চার-পাঁচ দিন থাকতে পারে। তবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃহস্পতিবার থেকে কমবে বলে আশা করছি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads