• মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৫
ads

মহানগর

অরক্ষিত ঢাকার ফ্লাইওভার

  • রায়হান উল্লাহ
  • প্রকাশিত ২৯ আগস্ট ২০১৯

নাগরিক যানজট যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে ফ্লাইওভার ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নগরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সহজেই যাওয়া যাচ্ছে ফ্লাইওভার ব্যবহারে। সাধারণ মানুষের জন্য তা অনেকটা স্বস্তি হয়ে এসেছে। কিন্তু বাদ সেধেছে অপরাধীরা। তারা ফ্লাইওভারের ওপর-নিচ অপরাধ সংগঠনের স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা খুব একটা নেই বললেই চলে। এ কারণে ছিনতাই বা যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনার জন্য উড়ালসড়ককে নিরাপদ মনে করছে অপরাধীরা। ফ্লাইওভারগুলোর আশপাশে বসবাস করা স্থানীয়রা বলেছেন, রাতে ফ্লাইওভার অনেক বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। অপরাধীদের আনাগোনার পাশাপাশি উচ্ছৃঙ্খল তরুণরা বেপরোয়া গতিতে যান চালিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে।

সর্বশেষ ২৬ আগস্ট রোববার রাতে রাজধানীর মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভারে (উড়ালসড়ক) পাঠাওচালককে আঘাত করে তার মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ঘটনার পর মিলন নামের ওই পাঠাওচালককে হাসপাতালে পাঠানো হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়।

এ ঘটনার পর রাজধানীর ফ্লাইওভারগুলোতে রাতে নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে আসে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ফ্লাইওভারে ছিনতাইয়ের ঘটনা নতুন কিছু নয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাইওভারগুলো চলে যায় ছিনতাইকারীদের দখলে। ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য হিসেবে চিহ্নিত রাজধানীর খিলগাঁও, মগবাজারসহ সাত ফ্লাইওভার। এসব ফ্লাইওভারে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছেন প্রাইভেট কার, সিএনজি কিংবা মোটরসাইকেল চালকরা।

জানা গেছে, মহাখালী, মৌচাক ও যাত্রাবাড়ী মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে মাসে গড়ে ১৫-২০টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। তবে বেশিরভাগ ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করেন না। গত জুলাই মাসে এমন ছিনতাইয়ের শিকার হন নিখিল ভদ্র নামের এক বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা। তিনি রাতে মোটরসাইকেলে হানিফ ফ্লাইওভার দিয়ে কাজলার বাসায় ফিরছিলেন। সায়েদাবাদ এলাকায় আসামাত্র চার ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন তিনি।

গত ২৭ আগস্ট রাতে খিলগাঁও ফ্লাইওভারে গিয়ে দেখা যায়, উড়ালসড়কের বিশাল দূরত্বে কোথাও পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য নেই। অনেক স্থান ঘুটঘুটে অন্ধকার। জ্বলছে না কোনো সড়কবাতি। এ অবস্থাতেই খুব দ্রুত যানবাহন চলাচল করছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাত গভীর হলে দৃশ্যপট বদলে যায়, যানবাহন চলাচলও কমে আসে। সেই সুযোগটি কাজে লাগায় ছিনতাইকারীরা। যেমনটা ঘটেছে পাঠাওচালক  মিলনের ক্ষেত্রে।

সম্প্রতি মগবাজার ফ্লাইওভার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ল্যাম্পপোস্টগুলোতে বাতি জ্বলছে না। মূল ফ্লাইওভারে নেই কোনো সিসি ক্যামেরা। অভিযোগ রয়েছে, বৈদ্যুতিক খুঁটির গোড়া থেকে চোর-চক্র বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে যাওয়ায় রাতের অন্ধকারে ডুবে থাকে ফ্লাইওভারটি। আর ছিনতাইকারীরা এই সুযোগটি ব্যবহার করে।

জানা যায়, রাজধানীতে মোট ৭টি ফ্লাইওভার চালু রয়েছে। মগবাজার ফ্লাইওভারের আগে কুড়িল ফ্লাইওভার চালু করা হয়। এরপরই একে একে মহাখালী, খিলগাঁও, বনানী ও তেজগাঁও এলাকার আরো চারটি ফ্লাইওভার চালু হয়। যানজট নিয়ন্ত্রণে এগুলো বিশেষ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি না থাকায় সেগুলো অরক্ষিত থাকে। অপরাধী ও ছিনতাইকারীদের ভয়ে রাতে ফ্লাইওভার ব্যবহারকারী প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল আরোহীরা যখন-তখন বিপদে পড়ছেন। এসব ফ্লাইওভারের নিচে মাদকসেবীদের আস্তানা হিসেবেও ব্যবহূত হচ্ছে। বেশিরভাগ ফ্লাইওভারের নিচে সকাল-সন্ধ্যায় চলে মাদক বিক্রির রমরমা ব্যবসা।

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, ফ্লাইওভারে ছিনতাইকারী চক্র তাদের কাজের সুবিধার জন্য রাত এবং বৈরী আবহাওয়াকে বেছে নেয়। ঝড়বৃষ্টি কিংবা কুয়াশাচ্ছন্ন রাতের সুযোগ খোঁজে তারা। বিদ্যুৎ বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মচারীকে ম্যানেজ করে ফ্লাইওভারের ল্যাম্পপোস্ট দীর্ঘদিন অচল করে রাখা হয় এমন অভিযোগও আছে। নজরদারি কম থাকায় দুর্বৃত্তরা ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডের জন্য নিরাপদ জোন হিসেবে ফ্লাইওভার বেছে নিয়েছে। গত বছর খিলগাঁও ফ্লাইওভারের ওপর এক তরুণীর বস্তাবন্দি মরদেহ ফেলে পালিয়ে যায় ঘাতকরা।

রুহুল আমিন নামে মালিবাগের এক বাসিন্দা জানান, রাতে ফ্লাইওভার অনেক বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ছিনতাইকারীদের আনাগোনার পাশাপাশি বখাটে তরুণরা বেপরোয়া গতিতে যান চালিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার কবলে পড়ছেন।

খিলগাঁও এলাকার ফার্নিচার দোকানি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘খিলগাঁও ফ্লাইওভারটি রাতের বেলা বেশি ভয়ংকর। ছিনতাই এবং মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। মাঝেমধ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে রাতের বেলা সার্বক্ষণিক টহল পুলিশ আর মাঝে মাঝে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা পুলিশ থাকলে তাদের সহজেই ধরা সম্ভব।’

পাঠাও চালক মিলন হত্যার বিষয়ে শাহাজাহানপুর থানার ওসি মোহাম্মদ শহিদ জানান, প্রাথমিকভাবে এটিকে ছিনতাইয়ের ঘটনা বলেই মনে হচ্ছে। এ কারণে রাজধানীর পেশাদার ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার তদন্তে ফ্লাইওভারের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ জিয়া খান বলেন, ফ্লাইওভারগুলো রাজধানীর পরিবহনসেবায় কিছুটা স্বস্তি নিয়ে এলেও রাতে ফ্লাইওভারগুলো অরক্ষিত হয়ে পড়ে। ঘটে যায় গুরুতর অপরাধ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ফ্লাইওভারগুলোতে নিরাপত্তা বিধান করা। অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা।

ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, জনবল সংকটের কারণে ফ্লাইওভারে সার্বক্ষণিক পুলিশ রাখা যাচ্ছে না। তবে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ বিট করে ফ্লাইওভারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। লোকবল বাড়লে সে ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক পুলিশের ব্যবস্থা করা হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads