• শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

মহানগর

পেঁয়াজের কেজি ২০০ ছাড়াল

ইতিহাসের সর্বোচ্চ দর

  • নাজমুল হুসাইন
  • প্রকাশিত ১৫ নভেম্বর ২০১৯

পেঁয়াজের দাম শুনেই স্নায়ুচাপ বেড়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। কারণ খুচরায় দেশি পেঁয়াজের দাম উঠেছে ২২০ টাকা। এতে গতকাল পেঁয়াজ না কিনতে পেরে খালি হাতে ফিরেছেন অনেকে। এখন অনেকের ঘরেই পেঁয়াজ ছাড়াও রান্না হচ্ছে। দেশের ইতিহাসে এ নিত্যপণ্যের দাম কখনো এতটা বাড়েনি। পেঁয়াজ আতঙ্ক এখন জনমানসে ‘মহা আতঙ্কে’ রূপ নিয়েছে।

পেঁয়াজে এই চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের ব্যর্থতাকে দুষছে সাধারণ মানুষ। আর সংশ্লিষ্টারা বলছেন, পরিস্থিতি বেহাল পর্যায়ে যাওয়ার আগেই আভাস ছিল। তখন আগেভাগে ব্যবস্থা নিলে এমনটা হতো না। সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার সবগুলো সুফলহীন। এর মধ্যে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে পেঁয়াজ আমদানির দায়িত্ব দেওয়াটাও ছিল ভুল। তাদের বড় চালান আনার অনুমতি দিলেও সে চালান আজও দেশে পৌঁছায়নি। কেন এত দেরি তা-ও তদারক করেনি সরকার। ওই পেঁয়াজ কবে নাগাদ আসবে, কতটুকু পেঁয়াজ আসবে, সে পেঁয়াজ দিয়ে দেশের জোগান কতদিন চলবে তা-ও ঠিক করে বলতে পারছেন না কেউই। আদৌ আসবে কি না সেটাও ওয়াকিবহাল নয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও।

অন্যদিকে বাজার তদারকি চলছে লোকদেখানো। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের যৌথ অনুসন্ধানে বিভিন্ন সিন্ডিকেটের তথ্য ও নামও উঠে এসেছিল পেঁয়াজ সংকটের শুরুতেই। এর সঙ্গে জড়িত ছিল আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, আড়তদার ও বিক্রেতারা। তবে সরকার তাদের বিরুদ্ধে সামান্য কিছু জরিমানা ব্যতীত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপই নিতে পারেনি। এতে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছেন ওইসব ব্যবসায়ী।

 

চরম বিপদে সাধারণ মানুষ

গতকাল পেঁয়াজ কিনতে না পেরে বাজার থেকে ফিরে এসেছেন রামপুরা এলাকার রিকশাচালক সোবহান। তিনি প্রতিবেদককে জানান, প্রতিদিন ১০০ টাকার মধ্যে কাঁচাবাজার সারতে হয় তার। বাড়তি খরচ হলে অন্য চাহিদা অপূর্ণ থাকবে। আধা কেজি পেঁয়াজের কিনতে তার পুরো টাকাই ব্যয় হবে বলে তিনি পেঁয়াজ কিনতে পারেননি। তার ঘরে পেঁয়াজ ছাড়াই রান্না হবে আজ। 

তিনি বলেন, আগে এক কেজি পেঁয়াজ কিনতাম। এখন সেই টাকায় ১০০ গ্রাম পেঁয়াজও হচ্ছে না। কয়েকদিন থেকেই তার বাসায় পেঁয়াজের ব্যবহার একেবারেই কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে যে তরকারিতে তিন-চারটি পেঁয়াজ দিতেন, এখন দেন অর্ধেক।

শুধু নিম্ন আয়ের মানুষ নয়, মোটামুটি সচ্ছল পরিবারেও চাপ তৈরি করেছে পেঁয়াজ। একটি পরিবারে প্রতি মাসে কমপক্ষে ৫ কেজি পেঁয়াজ লাগে, যার জন্য এখন হাজার টাকার বেশি গুণতে হবে। গতকাল বিভিন্ন বাজারে দেখা গেছে, দুদিন আগেও যে পেঁয়াজের কেজি ১৪০-১৫০ টাকার মধ্যে ছিল, তার দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকা বেড়ে যায়ওয়ায় যেন ধাক্কার মতো লেগেছে ক্রেতাদের। তাই পেঁয়াজ না কিনেই বাজার থেকে ফিরেছেন অনেকে।

 

ইতিহাসের সর্বোচ্চ দাম

বর্তমানে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। এর আগে ২০১৭ সালে কয়েক সপ্তাহের জন্য এ নিত্যপণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছিল। তখন কেজিপ্রতি ১৪০ টাকা পর্যন্ত ওঠে পেঁয়াজের দর, যা গত মাসের আগে পর্যন্ত সর্বোচ্চ দর ছিল।

এদিকে কারওয়ান বাজারে প্রায় দুই যুগ পেঁয়াজ বিক্রি করছেন দাবি করে বিক্রেতা ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘এ জীবনে কোনোদিন পেঁয়াজের দাম এত দেখিনি। এর অর্ধেকও দেখিনি। দুই বছর আগে একবার দাম উঠেছিল তা-ও কয়েকদিনের জন্য। পাইকারিতে ৯০ টাকা হয়েছিল তখন।’

এদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন আব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকার বাজারে ২০১৩ সালে পেঁয়াজের দাম ছিল গড়ে ৩৬ টাকা প্রতি কেজি। আর ২০১৪ সালে উঠেছিল ৫৫ টাকায়। পরের বছরেই তা কিছুটা কমে আবার ৪০ টাকায় বিক্রি হয়। এরপর ২০১৬ সালে ৫১ টাকা, ২০১৭ সালে ৩৭ টাকা আর গত বছর পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৩২ টাকা দরে।

 

ব্যর্থতা সরকারের

দেশে আমদানি পেঁয়াজের সবচেয়ে বড় উৎস ভারত। সে দেশে যখন পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য একলাফে সাড়ে ৮০০ ডলার নির্ধারণ করেছিল, সে সময়ই ইঙ্গিত ছিল রপ্তানি বন্ধের। তারপরেও সরকার নিশ্চুপ ছিল। এরপর রপ্তানি নিষিদ্ধের পরেও বিকল্প বাজার থেকে পেঁয়াজের জোগান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। কারণ তারপরেও বেশ কিছু সময় আবারো ভারত পেঁয়াজ দেবে-এমন আশায় বসে ছিল।

এ পর্যন্ত বিদেশ থেকে যতটুকু পেঁয়াজ এসেছে তা দিয়ে দেশের পাঁচ দিনের জোগান সম্ভব নয়। অবশেষে পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে তখন পেঁয়াজের খোঁজে এবার মধ্য এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তানের দ্বারস্থ হচ্ছে। এর আগে পাকিস্তান, চীন, মিসর, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে পেঁয়াজ আমদানির কথা শোনা গিয়েছিল। তবে কোথাও থেকে উল্লেখযোগ্য পেঁয়াজ আসেনি। অন্যদিকে বড় শিল্পগোষ্ঠীকে দায়িত্ব দিলেও তারাও এখনো পেঁয়াজ আনতে পারেনি। 

এসব বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, আমাদের যে পরিমাণ পেঁয়াজের প্রয়োজন ছিল ওই পরিমাণ পেঁয়াজের সরবরাহ ছিল না। সেটা উপলব্ধি করে শুরুতেই উদ্যোগ নেওয়া যেত। কিন্তু তা না করে পেঁয়াজের পর্যাপ্ত জোগান রয়েছে, উদ্বেগের কারণ নেই-এমন বক্তব্যই শুধু দেওয়া হয়েছে। 

তিনি বলেন, এরপর যখন সংকট প্রকট হয়েছে, তখন একটি-দুটি বাজারে সরকার চেষ্টা করেছে। তখনই সম্ভাবনাময় সবখানে চেষ্টা করা যেত। সরকারি পর্যায়ে পেঁয়াজ আমদানি করা যেত। তা না করে যখন আবার বড় ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারাও এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করেনি।

তিনি আরো বলেন, উল্টো বড় শিল্পগোষ্ঠীর আমদানির খবরে বাজারে ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। তখন ছোট ব্যবসায়ীরা লোকসানের ভয়ে আমদানি কমিয়েছে।

সরকারকে আমদানির পরামর্শ দিয়ে এ গবেষক বলেন, বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের উচিত নিজস্ব সংস্থার মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানি করা। সেটা ধাপে ধাপে বাজারে সরবরাহ করলেই একমাত্র পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। ব্যবসায়ীদের এতটা ভরসা করা এখনো কতটা যুক্তিযুক্ত সেটা ভেবে দেখতে হবে। 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads