• বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬
বাইরে চাকচিক্য ভেতরে আবর্জনা

প্রতীকী ছবি

মহানগর

রাজধানীর রেস্তোরাঁ

বাইরে চাকচিক্য ভেতরে আবর্জনা

  • নাজমুল হুসাইন
  • প্রকাশিত ১৯ জানুয়ারি ২০২০

রান্নাঘরে অপরিচ্ছন্ন স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। তেলাপোকা-ইঁদুরের বিষ্ঠায় ভর্তি। ফ্রিজ খুললেই মিলছে রান্না করা খাবারের সঙ্গে গাদাগাদি করে রাখা কাঁচা মাংস। রয়েছে নিম্নমানের বাসি-পচা খাবারও। রাজধানীর বেশিরভাগ নামিদামি রেস্তোরাঁয় এখনো এ চিত্র চোখে পড়ে।

যদিও এলাকাভেদে সত্যিই অভিজাত রেস্তোরাঁ হিসেবে পরিচিতি সেগুলো। সেসবের ভেতর-বাইরে দারুণ চাকচিক্য, জৌলুসময় সজ্জা ও খানদানি খাবারের নাম। দিনরাত এসব খাবারের কাটতিও বেশ। তবে বাইরের আভিজাত্যের সঙ্গে মিল নেই ভেতরের চিত্রের। বাইরে চাকচিক্য থাকলেও ভেতরটা একেবারেই উল্টো। রেস্তোরাঁগুলোর রান্নাঘরে ঢুকলেই চোখে পড়ে এ হতশ্রী দশা।

চলতি বছর শুরুর পর থেকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযানে দেখা গেছে রেস্তোরাঁগুলোর এমন চিত্র। অর্থাৎ খাদ্য নিরাপদ করতে সরকারের নানা তৎপরতার এখনো কাজে আসেনি। নামকরা হোটেল-রেস্তোরাঁয় এখনো ভ্রাম্যমাণ আদালত ঢুকলেই জরিমানার সম্মুখীন হন তারা। এর মধ্যে গত কয়েক দিনে ক্যাফে মতিঝিল রেস্তোরাঁ, ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি, মিরপুরের কফি এক্সপ্রেস, উত্তরার লা বাম্বা ও কাবাব ফ্যাক্টরি, জিগাতলা এলাকার পার্ক এন স্মার্ক, পান্থপথের ক্যাফে আল-বারাকাহর মতো অভিজাত রেস্তোরাঁ রয়েছে জরিমানা দেওয়ার তালিকায়। 

অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ শুধু নয়, এসব অভিজাত রেস্তোরাঁর কয়েকটির খাবারে কাপড়ের রং মেশানোও বন্ধ হয়নি। খাবারে এখনো ব্যবহার হচ্ছে বিভিন্ন কেমিক্যাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও মেয়াদহীন খাদ্য উপকরণ। অর্থাৎ দেশের মানুষকে ক্যানসারের মতো চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া খাদ্যে ভেজাল প্রয়োগকারী এসব দুর্বৃত্তকে থামানো যায়নি।

এদিকে খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজাল খাবারে যকৃতের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার পাকস্থলী বা অন্ত্রের ক্ষতি করে। মেটালিক ইয়েলো রং খাবারে মেশালে চোখের ক্ষতি হতে পারে। খাবারে কীটনাশকের উপস্থিতির কারণে অ্যালার্জি, পেট খারাপ, বমি, চুলকানি, এনকেফেলাইটিস, রক্তস্বল্পতা, গর্ভপাত এবং বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হতে পারে। এমনকি লেড ক্রোমেট বা লেড আয়োডাইড মেশানো খাবার ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়। তেজগাঁওয়ের একটি রেস্তোরাঁর নাম ‘আটিস্টিক ফুড’। এটি ওই এলাকার অভিজাত রেস্তোরাঁর একটি। কিন্তু গত বুধবার নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট পংকজ চন্দ্র দেবনাথ যখন সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন তখন বেরিয়ে আসে হতশ্রী দশা। ওই রেস্তোরাঁয় যেখানে খাবার রাখা, সেখানেই প্রচুর তেলাপোকা-ইঁদুরের বিষ্ঠা মেলে। রান্নাঘরটি ছিল খুবই অপরিচ্ছন্ন, ছিল স্যাঁতসেঁতে। ফ্রিজে খোলা অবস্থায় রাখা কাঁচা ও রান্না করা বিভিন্ন খাবার একাকার হয়েছিল মিলেমিশে। রেস্তোরাঁটিতে যেমন ছিল খাবারের কাটতি তেমনি ছিল অপরাধের মাত্রাও।

আরো উদ্বেগের কথা জানান পংকজ চন্দ্র দেবনাথ। তার ভাষ্য, কোনো ধরনের লেবেলবিহীন, তারিখবিহীন পাউরুটি, বান ইত্যাদি পাওয়া যায় রেস্তোরাঁটিতে। ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত ছিল পোড়া তেল। এসব খেলে যে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে।

এর ঠিক আগের দিনই পংকজ দেবনাথ খিলগাঁও এলাকায় গোল্ডেন গেট রেস্তোরাঁয় টেক্সটাইল গ্রেড রং (কাপরের রং) খাবারে ব্যবহার করতে দেখেন। সে সময় ওই রেস্তোরাঁটি ব্যবসা পরিচালনার হালনাগাদ লাইসেন্স দেখাতে দেখাতে ব্যর্থ হয়। যদিও ওই রেস্তোরাঁটির আভিজাত্য ও চাকচিক্য চোখ ধাঁধানো।

এসব বিষয়ে গতকাল শনিবার বাংলাদেশের খবরের সঙ্গে কথা বলেন ম্যাজিস্ট্রেট পংকজ। তার ভাষায়, সম্প্রতি যেসব রেস্তোরাঁয় অভিযান চালানো হয়েছে, প্রতিটি অভিজাত হলেও পরিবেশটা অস্বাস্থ্যকর ও অপরিচ্ছন্ন। এসব বড় রেস্তোরাঁয় বসার অংশটি পরিষ্কার ও পর্যাপ্ত। কিন্তু রান্নাঘরে গেলেই বেরিয়ে আসছে রহস্য। সেসবের রান্নাঘর অপরিচ্ছন্ন স্যাঁতসেঁতে, তেলাপোকা-ইঁদুরের বিষ্ঠায় ভর্তি আর ফ্রিজ খুললেই মিলবে রান্না করা খাবারের সঙ্গে রাখা একাকার হয়ে থাকা কাঁচা মাংস। এর বাইরে বেশ কিছু রেস্তোরাঁয় নিম্নমানের বাসি-পচা খাবার, কাপরের রং মিলছে। এসব এখন কমন প্রবলেম।

যদিও এর আগে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেস্তোরাঁর মান নির্ধারণে গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করেছিল নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। সে সময় মতিঝিল এলাকায় ক্যাফে মতিঝিল রেস্তোরাঁটি পেয়েছিল ‘এ গ্রেড’। অথচ ওই রেস্তোরাঁয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পেয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে তাদের এ গ্রেড স্টিকারটি তুলে ফেলা হয় এবং তাদের সতর্ক করা হয়। এমন হয়েছে বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁয়ও। পাশের ফকিরাপুল এলাকায় দ্য গাউছিয়া হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টও পায় ‘এ গ্রেড’। অথচ ওই রেস্তোরাঁয়ও পাওয়া গেছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ফ্রিজে রাখা পচা-বাসি খাবার। পরে জরিমানা করা হয়েছে রেস্তোরাঁটিকে।

সে সময় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, ১০টি সূচক বিবেচনার পর রেস্তোরাঁর মান নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো রেস্তোরাঁ ৯০ নম্বরের বেশি পেলে তা হবে ‘এ+’ ক্যাটাগরির, স্টিকারের রং হবে সবুজ। ৮০ নম্বরের ওপরে হলে রেস্তোরাঁটি গণ্য হবে ‘এ’ ক্যাটাগরির, থাকবে নীল রঙের স্টিকার। ‘এ‍+’ অর্থ উত্তম আর ‘এ’ মানে ভালো। এ ছাড়া গড়পড়তা বা মোটামুটিমানের রেস্তোরাঁকে ‘বি’ গ্রেড দেওয়া হয়। আর ‘সি’ গ্রেডের অর্থ হচ্ছে অনিরাপদ।

তবে এখন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষই ‘এ’ গ্রেড পাওয়া রেস্তোরাঁর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখে বিস্মিত। তাদের খাদ্যমানের বিবেচনায় হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোর যে শ্রেণিবিন্যাস করে দিয়েছে, তা খুব একটা কাজে লাগেনি। যেখানে নামিদামি হোটেল-রেস্তোরাঁয় এমন অস্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি হয়, সেখানে রাস্তার পাশের সি গ্রেডের রেস্তোরাঁয় কি হচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়।

এরপরেও আগের তুলনায় রেস্তোরাঁর মানে পরিবর্তন এসেছে দাবি করে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি রুহুল আমিন বলেন, সমস্যা রয়েছে সেটা ঠিক। তবে পরিবর্তন হচ্ছে আস্তে আস্তে। এটি হাজার বছরের জঞ্জাল। সেটা পরিষ্কার করতে হবে এমন অনুভূতি জেগেছে আমাদের দুই দশক আগেই। আগে এ খাতে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত লোক ছিল না। শ্রমিকরাও খুব ছিল নিম্নমানের, তাদের নিয়মের মধ্যে আনাটা দুরূহ।

তিনি বলেন, তবে ভেজালবিরোধী অভিযানে বেশ কিছু হোটেল-রেস্তোরাঁয় ভ্রাম্যমাণ আদালতসংশ্লিষ্টরা জরিমানা করেছেন। শুধু জরিমানা করে এর সমাধান হবে না। জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। সরকার ও ব্যবসায়ীদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সেটাও দীর্ঘ সময় নিয়ে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads