• শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ১৬ কার্তিক ১৪২৭
মিরপুরের মাদক সিন্ডিকেট ভয়ংকর

ছবি : সংগৃহীত

মহানগর

১০ বছরে ১৯ খুন

মিরপুরের মাদক সিন্ডিকেট ভয়ংকর

  • ইমরান আলী
  • প্রকাশিত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

রাজধানীর মিরপুর মাদকের অন্যতম আখড়া। বছরের পর বছর ধরে ভয়াবহ মাদকের বিস্তার এই এলাকায়। আগের চেয়ে আরো ভয়ংকর রূপে ছড়িয়ে পড়েছে এই সিন্ডিকেট। পুরো মিরপুরজুড়ে শতাধিক স্পটে প্রকাশ্যেই চলে মাদক ও জুয়া। গত ১০ বছরে মাদকের জের ধরে অন্তত ১৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এরপরও অবাধে মাদক কেনাবেচা চলছে মিরপুরে। পুলিশের অভিযানে কেউ কেউ গ্রেপ্তার হলেও জেলহাজতে বসে, এমনকি অনেকে দূরে আত্মগোপনে থেকেও নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের মাদক সাম্রাজ্য।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর পল্লবী ১১ নম্বর সেকশনের প্যারিস রোডে অবস্থিত সিটি করপোরেশন মার্কেট। ১৯৯৬ সালে এই মার্কেটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও ভবনের নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। ষষ্ঠতলা পর্যন্ত ছাদ ঢালাইয়ের পর ২০০৭ সালে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। তাই ভবনটি মার্কেট হিসেবে ব্যবহারের আগেই পরিত্যক্ত হয়ে যায়। আর এই পরিত্যক্ত ভবনটি রূপ নেয় নেশাখোরদের নিরাপদ জায়গা হিসেবে। শুধু তা-ই নয়, এই ভবনটিকে ব্যবহার করা হয় কিলিং জোন হিসেবে। মাদক সেবনের পর ঠুনকো ঘটনায় এখানে ঘটছে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। অপহরণকারীরা সাধারণ মানুষকে ধরে এনে এখানে আটকে রেখে আদায় করা হতো মুক্তিপণ।

পুলিশ ও এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ বছরে এখানে ১৯টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত মাসে সাব্বির নামের এক কিশোরকে হত্যা করা হয় এই মার্কেটে। এ ঘটনায় মাদক ব্যবসায়ী লেংড়া রুবেলের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছে নিহত সাব্বিরের পরিবার। গত বছর চারটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এ পরিত্যক্ত মার্কেটে। বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে মাদক কিংবা জুয়ার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে। কোনো কোনো ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন পর গলিত বা অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করছে পুলিশ।

সম্প্রতি সাব্বির হত্যার পর ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম ডিএনসিসির এই পরিত্যক্ত মার্কেটে জনসাধরণের প্রবেশ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়ে ৩৫ জন আনসার সদস্যকে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে নিয়োজিত করেছেন।

পল্লবীর ১১ নং সেকশনের বাসিন্দা বিপ্লব হাওলাদার। নিজ বাসার সামনে ফুটপাতে মোটরসাইকেলের অকটেন লুজ তেল বিক্রির ব্যবসা করতেন। গত ২৩ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তিনি তার দোকানের পাশেই দাঁড়িয়ে সিগারেট সেবন করছিলেন। সিগারেট সেবনকে কেন্দ্র করে বিপ্লবের সাথে মাদক ব্যবসায়ী ইমতিয়াজ ও রনির কথা কাটাকাটি হয়। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ইমতিয়াজ ও রনি বিপ্লবকে এলোপাতাড়িভাবে মারধর করেন এবং ইট দিয়ে তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন। যার ফলে বিপ্লবের মেরুদণ্ডসহ পাজরে গুরুতর আঘাত হন। ভিকটিমকে তার আত্মীয়স্বজন চিকিৎসার জন্য প্রথমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ভিকটিমের স্ত্রী ভিকটিমকে ধানমন্ডি জেনারেল অ্যান্ড কিডনি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিপ্লব হাওলাদার।

বিপ্লব হত্যাকাণ্ডে তাঁর স্ত্রী ইসমত আরা বাদী হয়ে গত ২৬ জুলাই পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ইসমত আরা অভিযোগ করেন, বিহারি মোস্তাকের আরেক ছেলে ইমরান তাঁর বাসায় গিয়ে ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তুলে নিতে হুমকি দিয়ে বলে, ‘আমার বাবা মোস্তাকের ক্ষমতা জানিস? মামলা তুলে না নিলে তোকেও গুলি করে হত্যা করব। সাত দিন সময় দিলাম।’

এ ব্যাপারে বিহারী মোস্তাক বলেন, মাদকের কারণেই তিনি মাদক প্রতিরোধ কমিটি করেছেন। মাদক নিয়ন্ত্রণেরও চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

পল্লবীর বিভিন্ন ১০, ১১ ও ১২-তে প্রকাশ্যে মাদক করবার চালাচ্ছে লেংড়া রুবেল, ইমতিয়াজ, রনি, মিষ্টার, হিরঞ্চি মোস্তাক, হিজড়া বাবরসহ বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী। ইমতিয়াজ ও রনি বিপ্লব হাওলাদার হত্যা মামলায় জেল হাজতে রয়েছেন এবং লেংড়া রুবেল সাব্বির হত্যা মামলার পলাতক আসামি। এরা জেলে থাকলেও সেখানে বসেই মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। ইমতিয়াজের বড় ভাই মিস্টার ১০ বছর আগে ফেনসিডিলের ব্যববসায় জড়িত ছিল। তার নামে মিরপুর থানায় মাদক মামলাও রয়েছে। এছাড়া মাদক ব্যবসায় বাধা দেয়ার কারণে একজন পুলিশ সদস্যকে স্টেব কারর দায়ে ৫ বছরের সাজাও হয়েছে এ মিস্টারের। তবে তাকে জেলেও থাকতে হয়নি।

২২ এপ্রিল ২০১৪, রাত ১টা- মিরপুর দক্ষিণ পীরেরবাগ ১৮১/২/এ নম্বর বাড়ির পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের সামনে থেকে জাহাঙ্গীর আলম ও কাইয়ুম নামের দুই ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়। তাদের এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর হত্যা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট মিরপুর থানা পুলিশ জানায়, মাদক-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাদের হত্যা করা হয়েছে। নিহতের মধ্যে একজনকে ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। এ ছাড়া যে স্থান থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়, তা এলাকার চিহ্নিত মাদকের স্পট। মাদক ও জুয়ার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে খুন হওয়াদের মধ্যে নওসা,শিমুল, সাবির, সাব্বির, বিপ্লব হাওলাদার,ফিরোজ ও সোহেল অন্যতম। এরা সবাই চিহ্নিত মাদক কারবারীদের হাতে খুন হয়েছেন।

চিহ্নিত মাদক স্পট ও ব্যবসায়ী: সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী মিরপুরে চিহ্নিত বড় বড় মাদকের স্পট রয়েছে ৫৬টি। আর বাইরে শতাধিক স্থানেও মাদক কেনাবেচা হয়ে থাকে, সেগুলো এই স্পট থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট।  এসব স্পটে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে চিহ্নিত ৬২ মাদক ব্যবসায়ী।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মিরপুর মডেল থানা এলাকায় আটটি, পল্লবী থানা এলাকায় ২৪টি, কাফরুল থানা এলাকায় ১০টি, শাহ আলী থানায় চারটি এবং রূপনগর, ভাসানটেক ও দারুসসালাম থানা এলাকায় রয়েছে ১০টি মাদকের স্পট। তবে এসব এলাকায় আরও অনেক ভাসমান মাদকের স্পট রয়েছে।

মিরপুরের যেসব এলাকাকে মাদক ব্যবসার স্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- দারুসসালাম ও শাহ আলী থানা এলাকা, শাহ আলী শপিং কমপ্লেক্সের পাশে ইদ্রিসের ফেনসিডিলের স্পট, লালকুঠি এলাকায় পুলিশের কথিত সোর্স রাজা ও ল্যাংড়া কবিরের ফেনসিডিলের স্পট, গাবতলী বাঁধের ওপর আমেনা বেগমের ফেনসিডিলের স্পট, শাহ আলী স্কুল রোডে বাবুর গাঁজার স্পট, কবরস্থান বস্তিতে রয়েছে ঝুনুর ফেনসিডিলের স্পট। এ ছাড়া পল্লবী থানা এলাকার সাংবাদিক কলোনির পূর্ব পাশের গলিতে কালুর ফেনসিডিলের স্পট, রাইনখোলায় ফাতেমা ওরফে ফতে, মিয়াবাড়ি হাজী রোড বস্তিতে মেহেরুন, মিরপুর ২ নম্বর সেকশনে ববি, ঝিলপাড় বস্তিতে নজরুল ওরফে নজু, মিল্লাত ক্যাম্পে রুস্তম, মিরপুর মাজার রোডে রাজা, কসাইটুলী বাগডাসার নাসির উদ্দিন, মোহাম্মদ আলী, কাফরুলের কাজীপাড়ায় হারুন মোল্লা, বাদশা মিয়া, বাবুল মিয়া, আল-আমিন, মাহমুদুর রহমান রিপন ওরফে ফেনসি রিপন, সেলিম, ভাসানটেকের কানা জাহাঙ্গীর, আবুল কালাম ওরফে কালু মিয়া, দুলাল মিয়া, বাশার, মিন্টু, ১১ নম্বর সেকশনের মিল্লাত ক্যাম্পে গুড্ডু, ৫ নম্বর এভিনিউ পানির ট্যাঙ্ক এলাকায় ছানা, বাদল, আরিফ, স্বর্ণপট্টিতে সাজু, ১২ নম্বর সেকশনে জামাল, মুসলিম বাজার ঢালে নুরু, শহীদ চলন্তিকা ক্লাব এলাকায় তপন, গিয়াসউদ্দিন, সুন্দর বাপ্পী, জিতু, মামুন, ৬ নম্বর সেকশন ট-ব্লকে রফিক, রূপনগর শিয়ালবাড়ীতে পারভেজ, পারভিন, ৬ নম্বর রোডে হারুন, ৭ নম্বর রোডে নানা, ৪-৫-৬ নম্বর রোডে রাজু ও তার মা নাজমা ওরফে নাজু, ৭ ও ৮ নম্বর লিঙ্ক রোডের বস্তিতে আবু সাঈদ, ১০ নম্বর রোডে সুমন, ১১ নম্বর মেইন রোডে আওলাদ, শহর আলী, রূপনগর রোডের পশ্চিম পাশে উজ্জ্বল, ১২ নম্বর রোডে আরাফাত, সুমন, হূদয়, সোহেল, ১২ নম্বর রোডের পশ্চিম পাশে শিল্পীর মা শুক্কুরী বেগম, ১৩ নম্বর রোডে শীলা আপা, ১৪ নম্বর রোডে লতিফ, জাকির, কসাই মিন্টু ও সুমনের মাদকের স্পট রয়েছে। এ ছাড়া রূপনগর আবাসিক মোড় জামতলায় সেলিমের গাঁজার স্পট, ৩৩ নম্বর রোডের রূপনগরের পশ্চিম পাশের বস্তিতে মজিবরের গাঁজার স্পট, রূপনগর ১ নম্বর রোডের পশ্চিম পাশের বস্তিতে মামুন ও মাসুদের গাঁজার স্পট, পূরবী সিনেমা হলের বিপরীতে পূর্ব পাশে রয়েছে জহিরের ফেনসিডিলের স্পট।

এদিকে স্থানীয় লোকজন বলছেন শুধু মাদকের কারণে এই এলাকায় টিকা দায় হয়ে গেছে। মাদক ব্যবসায়ীরা এখন বেপরোয়া। অনেকে আবার জেলখানা থেকেও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করে। এ সকল মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কথা বললেই লাশ হতে হবে। এ কারণে এলাকায় তাদের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ কথা বলতে চায় না।

পল্লবী থানার সদ্য যোগদানকৃত  ওয়াজেদ আলী বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সবসময় আপোষহীন রয়েছি। মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিদিন অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রনে জনগণেরও সহায়তা প্রয়োজন।

মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারে প্রতিনিদন-ই আমরা অভিযান পরিচালনা করে থাকি। এ বিষয়ে অফিসারদের কড়া নির্দেশনা দেয়া রয়েছে।

মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার আ স ম মাহতাব উদ্দিন বলেন, মিরপুরে এখন মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। আমরা মাদক নির্মূলের চেষ্টা করব। এটা পুলিশের অঙ্গীকার। তবে এর জন্য সাধারণ লোকজনকেও এগিয়ে আসতে হবে। সবাই মিলে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে মাদক নির্মুল হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads