• সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬
ads
বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন ও কিশোর-কিশোরীদের বুদ্ধির বিকাশ

ছবি : সংগৃহীত

মন

বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন ও কিশোর-কিশোরীদের বুদ্ধির বিকাশ

  • প্রকাশিত ০৭ এপ্রিল ২০১৯

এন. এস. এম. মোজাম্মেল হক                                                

 

 

একটি শিশু যখন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পথে এগিয়ে যায় এবং তার মাঝে কিছু শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়ন ও পরিবর্তন লক্ষণীয় হয়, তখন তাকে কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকাল বলা হয়। বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি শিশুর মধ্যে কিছু হরমোনজনিত পরিবর্তন সাধিত হয় যা তার শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এ সময় তাদের শিশুও বলা যায় না, আবার অনেক প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবেও গণ্য করা হয় না। এটিই বয়ঃসন্ধিকাল। এ সময় মানুষের মস্তিষ্কে কিছু হরমোন তৈরি হয় যা রক্তের সঙ্গে মিলে এ পরিবর্তন ঘটায়। ১০ থেকে ১৮-২০ বছর সময়কে বয়ঃসন্ধিকাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর এই বয়ঃসন্ধিকালের সমাপ্তি ঘটে।

মানুষের বয়ঃসন্ধিকাল এবং মস্তিষ্কের পরিবর্তন (Neural Development) সম্পর্কে খুব কমই আলোচনা হয়। বয়ঃসন্ধিকালের হরমোনের পরিবর্তন মস্তিষ্কের পরিপক্বতা এবং আচরণের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে। এই পরিবর্তন ব্যক্তির চিন্তার ক্ষেত্র, ধ্যান-ধারণা, উদ্বুদ্ধকরণ এবং আচরণগত পরিবর্তন ঘটায়, যা তার প্রজনন প্রক্রিয়াকে সক্রিয় ও গতিশীল করে। এই বয়ঃসন্ধিকাল মানুষের হরমোনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তার শরীরে গঠন কাঠামো এবং বুদ্ধির বিকাশকে প্রভাবিত করে।

বয়ঃসন্ধিকাল এবং প্রজনন স্বাস্থ্য পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পরিপূর্ণ দৈহিক, মানসিক ও সামাজিক কল্যাণের একটি অবস্থাই হচ্ছে প্রজনন স্বাস্থ্য। এটা শারীরিক গঠন প্রণালি, কার্যক্রম প্রণালি এবং প্রক্রিয়ায় কোনো রোগের প্রভাব বা অক্ষমতা নয়।

বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলেমেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের আচরণগত পরিবর্তনও লক্ষণীয়। এই পরিবর্তনগুলো কখনো কখনো অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। ছেলেমেয়েদের পরিবর্তনের মধ্যে দ্রুত উচ্চতা ও ওজন বাড়া, স্কিনে পরিবর্তন, সব স্থায়ী দাঁত উঠে যাওয়া, ঘাম বেশি হওয়া, কোমর সরু হয়ে যাওয়া, বড় হাড় বৃদ্ধি পাওয়া, প্রজনন সংশ্লিষ্ট অঙ্গসমূহ পরিবর্তন হওয়া, স্বর ভেঙে যাওয়া ও ভারী হয়ে যাওয়া, বুক ও কাঁধ চওড়া হওয়া ইত্যাদি লক্ষণীয়।

মূলত বয়ঃসন্ধিকালকে ইংরেজিতে সেন্ট্রাল পিউবার্টি বা কেন্দ্রীয় বয়ঃসন্ধি হিসেবে অভিহিত করা হয়। কারণ কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে এই পরিবর্তন শুরু হয়। বয়ঃসন্ধিকালে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অংশ জিন এনআরএইচ হরমোন ক্ষরণ শুরু হয়। পিটুইটারি গ্রন্থির বাইরের অংশ কাজ শুরু করে এবং এলএইচ ও এফএসএইচ হরমোন ক্ষরণ শুরু হয় ও রক্তের মাধ্যমে তা প্রবাহিত হয়। এলএইচ ও এফএসএইচ হরমোনের প্রভাবে যথাক্রমে ডিম্বাশয় শুক্রাশয় কাজ করা শুরু করে। সেই সঙ্গে এরা যথাক্রমে এস্ট্রাডিওল ও টেস্টোস্টেরল উৎপন্ন শুরু করে। শরীরে এস্ট্রাডিওল ও টেস্টোস্টেরলের বৃদ্ধির ফলে মেয়ে ও ছেলেদের বয়ঃসন্ধিকালীন বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ পেতে থাকে।

বয়ঃসন্ধিকালে একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় একটি শিশুর শরীর একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে রূপান্তরিত হয় এবং প্রজনন ক্ষমতা লাভ করে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটার ফলে এ সময় কিশোর-কিশোরীরা সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়। আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। এ সময় ছেলে ও মেয়ে উভয়ই পরিণত আচরণ করতে শুরু করে। শৈশবের নির্ভরশীলতা কাটিয়ে তারা আত্মনির্ভরশীলতার দিকে ধাবিত হয়। তারা বাবা-মায়ের বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না। ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর নির্ভর করতে পছন্দ করে। নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। অন্যের প্রতি আগ্রহী হয় এবং পড়াশোনার ধারা নির্বাচন করে এগিয়ে যেতে চায়। এ সময় তারা সামাজিক দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করতে চায়। এ ছাড়া কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় অর্থাৎ নৈতিকতার স্ফুরণ ঘটে।

দেখা যাচ্ছে, বয়ঃসন্ধিকালে শিশু-কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে একটি ব্যাপক দৈহিক ও মানসিক পরিবর্তন আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং তাদের স্বাভাবিক কৌতূহল তীব্র হয়ে নতুন নতুন জ্ঞানলাভের প্রতি আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে। বিভিন্ন বিষয়ে তারা সুস্পষ্ট ধারণা লাভে আগ্রহী হয় এবং তাদের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণমূলক চিন্তা-চেতনার উন্নয়ন ও স্বাধীনতার চেতনার বিকাশ ঘটে। বয়ঃসন্ধিকালে রাগ, ভয় দুশ্চিন্তা, স্নেহ, ভালোবাসা, ঘৃণা, ঈর্ষা ইত্যাদি আবেগ প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে পরিলক্ষিত হয়। এ সময় আবেগ প্রকাশে তীব্রতা দেখা দেয়। কোনো কোনো সময় আবেগ একেবারেই থাকে না।

এ বয়সে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব, রাগ, ভয়, আশঙ্কা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিমূর্ত ধারণাকেন্দ্রিক আচরণ, অন্তর্মুখিতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা, আদর্শ গঠন, প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা, যৌন আবেগ, আবেগের অবদমন ও আনন্দ ইত্যাদি আবেগীয় বিষয়গুলো প্রকাশ পায়। পর্যালোচনায় দেখা যায়, শিশু-কিশোর-কিশোরীরা বয়ঃসন্ধিকাল পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় প্রক্রিয়ায় একটি ব্যাপক মনোদৈহিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়।

এক্ষেত্রে প্রতিটি পরিবার, শিক্ষাক্ষেত্র এবং কর্মক্ষেত্রকেও তাদের এই পরিবর্তন ও আচরণগুলোকে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দেখতে হবে এবং তাদের সঙ্গে সবসময় বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে হবে, যেন তারা বাবা-মা বা নিকট আত্মীয়কে বন্ধু ভেবে মন খুলে তাদের দ্বন্দ্ব বা নতুন অনুভূতিগুলো শেয়ার করতে পারে। পাশাপাশি তাদের বুদ্ধির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান তাদের যথাযথ বেড়ে উঠতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। পুষ্টিবিদদের মতে, বয়ঃসন্ধিকালে সুষম খাবারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের তালিকায় ভিটামিন, শর্করা, আমিষ, চর্বি, লবণ ও পানি- এই ৬টি উপাদান অত্যাবশ্যক। কিশোর-কিশোরীদের প্রতিদিনের খাবারে ২২০০ ক্যালরি থাকতে হবে। তাদের জন্য ফ্যাটি অ্যাসিড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন ২-৩ লিটার পানি পান করা প্রয়োজন। ডাবের পানি উপকারী। কোমল পানীয় পরিহারযোগ্য এবং চা-কফি পরিমাণমতো পান করা উচিত।

আজকের কিশোর-কিশোরীরা আমাদের আগামী প্রজন্ম। তাদের দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি এবং বুদ্ধির বিকাশ আমাদের উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রজনন স্বাস্থ্য এবং বয়ঃসন্ধিকাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এর মনোদৈহিক পর্যায়। এ সময় যেসব মানসিক সমস্যা দেখা দেয়, সেগুলোকে মোকাবেলা করার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। দৈহিক পরিবর্তনগুলোকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ প্রজনন প্রক্রিয়ায় নারী-পুরুষ উভয়েরই দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও তাদের সচেতন হতে হবে। এ সময় পুষ্টির চাহিদা মেটানোর জন্য গণসচেতনতা বাড়াতে হবে। তা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একজন স্বাস্থ্যবতী মা ও স্বাস্থ্যবান বাবা পাবে। আচরণগত সমস্যার ক্ষেত্রে অনেক সময় পরামর্শ, বই পড়া, মনো চিকিৎসকদের মতামত গ্রহণ করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, বয়ঃসন্ধিকালে বুদ্ধির বিকাশ সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখে। অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে সন্তানের বিকাশ যেন বাধাগ্রস্ত না হয় অথবা তারা যেন বিপথে ধাবিত না হয়। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ সময় পিতা-মাতাকে সতর্ক থাকতে হবে। সুস্থ প্রজনন স্বাস্থ্য এবং বয়ঃসন্ধিকালীন সৃজনশীল বুদ্ধির বিকাশ আমাদের উন্নত জাতিগঠনে উদ্বুদ্ধ করবে। আর এজন্য শুধু প্রয়োজন আমাদের সচেতনতা, মনোযোগ, তাদের প্রতি যত্ন ও সহনশীল মনোভাব।

 

(পিআইডি : শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম ফিচার)

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads