• শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৭ সফর ১৪৩৯
BK
.

আইএমইডির প্রতিবেদন: উন্নয়ন প্রকল্পে অসঙ্গতি

শতভাগ কাজ না করেই ১৭৯ প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা

১২৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরে প্রযুক্তিনির্ভর গ্রামীণ ডাকঘর নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১১ সালে। এ প্রকল্পের আওতায় ২০১৩ সালের জুন মাসের মধ্যে ১ হাজার ৫০০ ডাকঘর নির্মাণের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উপযোগী করে গড়ে তোলার কথা ছিল। যথাসময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পর তৃতীয় সংশোধনীতে প্রকল্পে ডাকঘরের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়। সর্বশেষ নির্ধারিত মেয়াদেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। ১০৪ কোটি টাকা ব্যয় করে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুন মাসে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। বরাদ্দের ৮৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে মাঠ পর্যায়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা হয়েছে ৭৫ শতাংশ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তৈরি করা গত অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এসব গুরুতর অসঙ্গতি উঠে এসেছে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে এমন প্রকল্পের অধিকাংশের কিছু না কিছু কাজ বাকি রয়েছে বলে প্রতিবেদনের তথ্যে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, গত বছর কাজ শেষ না করেই ১৭৯ প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আর শতভাগ কাজ শেষ করে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে ১৬৭ প্রকল্পের।

প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে ৩১৫টি প্রকল্প শেষ করার জন্য নির্ধারিত ছিল। তবে বছর শেষে এসব প্রকল্পের ২৪৩টির কাজ শেষ হয়েছে। শেষ করার জন্য নির্ধারিত ছিল না এমন ১০৩টি প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয় গত অর্থবছরে। সব মিলিয়ে সমাপ্ত প্রকল্পের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৪৬টিতে। এর মধ্যে ১৭৯টি প্রকল্পের কোনো না কোনো কাজ বাকি আছে।

কাজ শেষ না করে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণার বিষয়টিকে বরাবরই উন্নয়নে বড় অসঙ্গতি হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে আইএমইডি। তবে এবারের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাস্তবতা বিবেচনা না করেই নেওয়া হয় এসব প্রকল্প। এর ফলে প্রকল্পের অনেক অংশ বাদ যাচ্ছে। এর মাধ্যমে জনগণের অর্থের অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে জাতীয় জীবনে এর সুফল প্রতিফলিত হচ্ছে না।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মীর্জ্জা এবি আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প নির্বাচনে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। অনেক প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় কাজ জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। তা ছাড়া বাস্তবায়নকারী বিভাগগুলো অনেক সময় মনগড়া ঘোষণা দেয়। জবাবদিহিতার হাত থেকে রক্ষা পেতে এমনটি করা হয়।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মোট সাতটি প্রকল্পের কাজ গত অর্থবছরে শেষ হয়েছে। এসব প্রকল্পের একটিতেও বরাদ্দের শতভাগ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। তবে ৯০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে মাত্র একটি প্রকল্পের শতভাগ কাজ করা হয়েছে।

মাঠ পর্যায়ে শতভাগ কাজ করে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণায় বেশ এগিয়ে আছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের ২২টি প্রকল্পের ২১টিতে শতভাগ কাজ হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের আওতায় গৃহায়ন ও ইমারত গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি প্রকল্প শতভাগ কাজ না করে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

বরাদ্দের বেশি অর্থ ব্যয় করেও শতভাগ কাজ না করার নজির রয়েছে এডিপি বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদনটিতে। এতে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে নেওয়া নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ছিল ৪৩ কোটি ৮ লাখ টাকা। বরাদ্দের ৯ শতাংশ বেশি অর্থাৎ ৪৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয় করে প্রকল্পটির কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবে এর কাজ হয়েছে মাত্র ৬৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ রেলওয়ের রফতানি উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। ২০০৯ সাল থেকে চলমান প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়েছে গত অর্থবছর। এ প্রকল্পে কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি। মাঠ পর্যায়ে কোনো কাজও হয়নি। রেলওয়ের যাত্রীবাহী বগি কেনার একটি প্রকল্পে ৯৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ৩ লাখ টাকা ব্যয় করে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদনসহ বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে নানান প্রতিবন্ধকতার কারণে এডিপি বাস্তবায়নে গতি আসছে না বলে জানিয়েছে আইএমইডি। বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই অনেক প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়। প্রকল্প দলিলে অনেক সময় খাতভিত্তিক ব্যয়ের পরিকল্পনা থাকে না। এর ফলে অনেক সময় নির্দিষ্ট সময়ে ব্যয়ের সীমারেখা মেনে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায় না।

তা ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণের কাজ হয় বিলম্বে। আবার অনেক সময় ভূমি অধিগ্রহণে বাড়তি সময় দরকার হয় মামলার কারণে। প্রকল্প পরিচালকের বদলির কারণেও প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হয়। প্রতিবেদনে আইএমইডি বেশ কয়েকটি সমস্যা চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি কয়েকটি সুপারিশও করা হয়েছে প্রতিবেদনে।