• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৬ সফর ১৪৩৯
BK

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তা

বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি, চিরকল্যাণকর। অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। বিদ্রোহি কবির এই ছন্দের বাইরে গিয়ে যদি বর্তমান সমাজের দিকে তাকানো হয়। তাহলে দেখা যাবে নারীর অংশগ্রহণ অর্ধেকেরও কম। বিশ্বে প্রায় ৩৩ শতাংশ নারী কর্মী আছেন, যারা পুরুষদের সাথে কাজ করছেন। আর প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা আরো কম। বাংলাদেশের প্রাক্ষাপটে মাত্র ১৫ শতাংশ নারী কর্মরত আছে এদেশের প্রযুক্তি খাতে। বেসিসের হিসেব মতে ১২ শতাংশ নারী কর্মী আর উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছে ৩ শতাংশ। 

আবার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও নারীরাই বেশি সাইবার বুলিং,সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট বা  হুমকির শিকার হচ্ছেন। তাই কর্মক্ষেত্র হিসেবে এইখাতে না আসার কারণ হিসেবে নিরাপত্তার পক্ষেই যুক্তি দেখিয়েছেন অনেকেই।

নারী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের খবরের বিশেষ আয়োজনে প্রযুক্তিখাতে নারীদের অংশগ্রহণ, গ্রহণযোগ্যতা, অবদান ও সচেতনতা এবং নিয়ে কথা বলেছেন প্রযুক্তিখাতের নারী উদ্যোক্তা, সংগঠকরা।

ফারহানা এ রহমান

ইউওয়াই সিস্টেমসের প্রধান নির্বাহী, বেসিসের প্রথম নারী পরিচালক, এবং বর্তমান সহ-সভাপতি

প্রযুক্তিখাতে আন্তর্জাতিক বাজারেই নারীদের অংশগ্রহণ অনেক কম। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটা শুধু প্রযুক্তি নয়, সব খাতেই নারীদের অংশগ্রহন অনেক কম। আর এরজন্য আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং মানসিকতা অনেক অংশে দায়ী। কারণ, মানসিকভাবে আমরা শুধু লেখাপড়াটাকেই প্রাধান্য দিচ্ছি। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নারীদেরকে আমরা এখনও মেনে নিতে পারছি না।একজন বাবা, ভাই বা স্বামী তার মেয়ে, বোন বা স্ত্রীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করাটাকে মেনে নিতে পারছে না। তাই অর্থনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণে এখনো নিরুতসাহিত করছে। কিন্তু সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে আমরা যখন এই বিষয়গুলো সহজ করে দিতে পারবো। নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহ দেওয়ার মানসিকতা যখন তৈরি হবে, তখনই দেশের অনেক উন্নতি হবে। আর নারীর সহযোগিতা ছাড়া মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে আমরা নিজেদেরকে তৈরি করতে পারবো।

আমি যখন বেসিসে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলাম তখন বেসিসেও নারীদের অংশগ্রহণ তেমন লক্ষ্যনীয় ছিলো না। মানে বছর বছর দশেক আগেও এই প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ তেমন ছিলো না। কারণ নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ ছিলো না, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া, বা তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করারও কেউ ছিলো না। সেখান থেকে ধীরে ধীরে সচেতনতা তৈরি করা। একটা মেয়ের জন্য কর্মক্ষেত্রে কি কি অসুবিধা হতে পারে তা অন্য একজন মেয়েই বুঝতে পারে। আর সেই যায়গা থেকে আমি কাজ করার চেষ্টা করেছি। যাতে প্রযুক্তিখাতে নারীদের অংশগ্রহন আরো সহজ হয়। একইসাথে কর্মক্ষেত্রও যেন নারীবান্ধব হয় সেই বিষয়ে আমি কাজ করে যাচ্ছি। কারণ, নারীবান্ধব পরিবেশ না থ্যাকলে একজন কর্মীর কাছ থেকে কাজ আদায় করা সম্ভব না।

নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, তাদেরকে সামনে এনে কাজ করানোতে উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। সেই লক্ষে ২০১৫ সালে আমরা বেসিস উইমেন্স ফোরাম গঠন করি। যেখানে বেসিস সদস্য নন এমন নারীদের নিয়েও আমরা কাজ শুরু করি। এছাড়াও গত বছর আমরা উইমেন এট ওয়ার্ক নামের একটি আয়োজন করেছিলাম। যেখানে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্র থেকে প্রায় ৩৬জনকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও এবারের সফটএক্সপোতেও আমরা ২ জন নারী উদ্যোক্তাকে বিনাম্যুল্যে স্টল দিয়ে তাদেরকে সামনে আসার সুযোগ করে দিয়েছি।

এছাড়াও আরেকটি কথা না বললেই না, আমাদের বর্তমান সরকারের নানা উদ্যোগের ও প্রণোদনার কারণে প্রযুক্তিখাতে এখন নারীদের অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। উইমেন্স হ্যাকাথন ও গার্লস প্রোগ্রামীং কন্টেস্ট যার অনেক বড় প্রমান।  সেখানে আমরা দেখেছি কিভাবে একজন নারী স্বদিচ্ছা নিয়ে নিজে প্রগ্রামিং করে সমাজ পরিবর্তনে কাজ করছে, নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে।  সেই যায়গা থেকে আমি খুবই আশাবাদী, মেয়েরা স্বনির্ভর হওয়ার পথ দেখতে পাচ্ছে।

এমরাজিনা ইসলাম

ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর পাইওনিয়ার

২০১১ জানুয়ারি থেকে আমি কাজ করছি অনলাইন মার্কেটপ্লেসে। তখন থেকেই একটা বিষয় দেখেছি। বায়াররা কাজ দেওয়ার সময়, যাকে৩ কাজ দিচ্ছে, সে নারী না পুরুষ সেটা বিবেচনা করে না। এমনকি আমি এও দেখেছি আমার কাজের যেই সম্মানী ছিলো তা অনেক সময় আমার সহকর্মী অন্যান্য পুরুষের চেয়ে বেশিই ছিলো। তাই আমি বলতে চাই, প্রযুক্তিখাতের আন্তর্জাতিক বাজারে নারীদের গ্রহণযোগ্যতা নারী হিসেবে নয়, দক্ষ কর্মী হিসেবে দেখা হয়।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সংসার সামলে একজন নারীকে মার্কেটপ্লেসে তার কাজটি সম্পন্ন করতে হচ্ছে।  এক্ষেত্রে অনেক সময় সামাজিক রীতি মেনে ওই নারীকে তার কাজ সম্পন্ন করতে একটু দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তাই নারীদের সকল নারীদের উদ্দেশ্যে আমি এটাই বলতে চাই, নারী হিসেবে গ্রহণযোগ্যতার চেয়ে একজন দক্ষ কর্মী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলাটা অনেক বড় ব্যাপার।

আর বাধার কথা যদি বলতে হয় পরিবার থেকেই আসলে আমাদের কাছে অনেক বড় বাধা আসে। তাই পরিবর্তনটা আসলে আমাদের পরিবার থেকেই আসা উচিত। কারণ, আমি বিশ্বাস করি পরিবার যদি বদলে যায়, তাহলে সমাজ বদলে যাবে। আর সমাজ বদলে গেলে দেশ বদলে যাবে। আমাদের নারীদের ভয়গুলোও কেটে যাবে। আর তখনই নারীরা সকল ক্ষেত্রে উন্নতি করতে পারবে। তার সব শেষে আমি এইটুকু বলতে পারি, কেউ যদি নিজেকে নারী না ভেবে মানুষ ভাবে, পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও তাকে মানুষ ভাবে। তবেই একজন নারী নিজের, পরিবারের পক্ষান্তরে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে।

জেনিফার আলম 
সভাপতি, ক্রাইম রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ফাউন্ডেশন

আজ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস এবং বিশ্বব্যাপী নারীদের জন্য এই দিনটি উদযাপন করা হয় যারা তাদের কাজ সম্পন্ন করার জন্য সব ধরনের বাধা মোকাবেলা করে চলেছে।দেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং নারীরাও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রবেশ করেছেন।ইন্টারনেট এর সুফল ভোগ করার পাশাপাশি নানা কুফল ও ভোগ করতে হচ্ছে।আজকের যুগে চাইলেও জীবনকে কতটা নিরাপদ করা সম্ভব? চাইলেও সম্ভব না  কারণ জীবন আজ মোবাইল ফোন ও সাইবারস্পেসে বন্দী। সেখানে আপনার ছেলেমেয়ের পরিচিতি আপনি নিজেও জানেন না যতক্ষন না জীবনে ঘটে যায় অনাকাঙ্খিত কোন দূর্ঘটনা।দিনে দিনে প্রতিটি ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এই কারণে অনলাইনে নিরাপদ থাকা, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায়, নারীদের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
হ্যাকিং,পরিচয় চুরি, ফেইক আইডি, ফেইক ই-মেইল দিয়ে নারীদের একান্ত ব্যক্তিগত ও স্পর্শকাতর  ছবি ব্যবহার করে সাইবার বুলিং বা হুমকি,সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট করা হচ্ছে। তাই ইন্টারনেটে ব্যবহৃত সকল ধরনের একাউন্ট ব্যবহারের আমাদের কিছু বিষয় মনে রাখা উচিত বলে আমি মনে করি। যেমন বিভিন্ন ওয়েবসাইট এর টার্মস এন্ড পলিসি পড়া উচিত। যখন আপনি একটি অনলাইন অ্যাকাউন্ট তৈরি করেন, এটি জিনিস কেনা, একটি গ্রুপ জয়েন করেন তখন আপনারও জানা উচিৎ আপনার তথ্যাদি দিয়ে সেই ওয়েবসাইট কি করছে। এছারাও নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করার সময় মনোযোগ দিন।প্রয়োজনের বাইরে ব্যক্তিগত তথ্যের শেয়ার না করার জন্য অপশন আছে সেটি ব্যবহার করুন। বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের জন্য বিভিন্ন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।  মনে রাখবেন আপনি যখন অনলাইনের অ্যাকাউন্টটি ব্যবহার করছেন না তখন লগ অফ করুন এবং আপনার পাসওয়ার্ডগুলি মনে রাখার জন্য সার্চ ইঞ্জিন বা আপনার কম্পিউটারকে কখনই অনুমতি দেবেন না।
আর অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, সাইবার ক্রাইম, অনলাইনে ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি এই সংক্রান্ত যে কোন ধরণের সমস্যায় দ্রুত নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করুন।
মনে রাখবেন দিনের শেষে আপনার সম্পর্কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আপনার। আবেগের বশবর্তী হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিইয়ে নিজের ক্ষতি করবেন না। বাবা - মা’র সাথে সহজ সম্পর্ক গড়ে তুলুন। সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন জীবনের তুলনায় বাস্তবতা আরও কঠিন। বাস্তববাদী  হন, সম্পর্ককে মূল্যায়ন করুন। অভিভাবকরা ছেলে মেয়েদের শাসন করে নয়, বন্ধু হবার চেষ্টা করে তাদের বাস্তবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন। যেন তারা বিপথে চলে না যায়।


রাখসান্দা রুখাম

গুগল ডেভেলপার গ্রুপ ঢাকার ম্যানেজার ও উইমেন্স টেকমেকারের সংগঠক

আমি সবাইকে একটি পরামর্শ সবসময় দিয়ে থাকি যা আমার ব্যাক্তিগত জীবন থেকে প্রাপ্ত। ধৈর্য নিয়ে কাজ করা, ফোকাস থাকা। কেউ যদি দমিয়ে রাখতে চায় তাহলে সৎ সাহস নিয়ে এগিয়ে চলা। মেয়েরা হয়তো ছেলেদের থেকে শক্তির দিক দিয়ে দুর্বল হতে পারে কিন্তু বুদ্ধি/পরিশ্রম এর দিক দিয়ে নয়। উদাহরণ হল আমাদের সবার মায়েরা। নতুন জিনিস শিখতে হবে, প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। সফলতা আসবেই।

তথ্য প্রযুক্তি খাতে নারীদের এগিয়ে নিয়ে যেতে আমরা প্রতিনিয়ত নানান অনুষ্ঠান এর মাধ্যমে নারীদের সংযুক্ত করছি। গ্রামে গ্রামে নারীদের কে নিয়ে ওয়ার্কশপ করছি যাতে করে তারা আই।সি।টি নিয়ে জানতে পারেন। ইন্টারনেট সিকিউরিটি নিয়ে মেয়েদেরকে আমরা সচেতন করে তুলছি বিভিন্ন প্রশিক্ষন এর মাধ্যমে। এই যাবত আমরা ৪৩ টি প্রোগ্রাম করেছি এবং আশা করছি আরো মেয়েদের কে নিয়ে কাজ করতে পারবো।