• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫, ২৪ সফর ১৪৩৯
BK

ট্রাভেলিং টু ইনফিনিটি

সময়ের কোনো ঘরবাড়ি ছিল না। ছিল না জন্মতারিখ। অথচ আমরা সময়ের পিঠে চড়ে জন্মেছি, ঘরবাড়ি বানিয়েছি। মরেছিও সময়ের ঘাড়ে চড়েই।

সময়ের কাছে আমাদের অজস্র ঋণ। সেই ঋণ শোধ করতে জন্ম হলো এক অতিমানবের। স্টিফেন হকিং।

স্টিফেন খুঁজে খুঁজে বের করলেন সময়ের জন্ম বৃত্তান্ত, সাকিন। সময়ের কাছে মানবকুলের দায় মেটালেন তিনি।

স্টিফেন হকিংয়ের ঘটনাবহুল, অস্বাভাবিক এক জীবন অবশেষে থামল। ৭৬ বছর বয়সে হুইল চেয়ারে পড়ে থাকা সচল মস্তিষ্কটা অচল হলো। গতকাল ১৪ মার্চ আরেক পৃথিবীবিখ্যাত গাণিতিক অ্যালবার্ট আইনস্টানের জন্মদিনে তিনি মারা গেলেন।

সময়ের সবচেয়ে প্রতিভাবান এই গাণিতিক পৃথিবীকে হাজার বছর এগিয়ে রেখে চলে গেছেন অনন্তের পথে। যে অনন্তের খোঁজ সারা জীবন তিনি করেছেন, এখন তার আশ্রয় সেখানে।

স্টিফেন হকিংয়ের জীবন ফিকশনের চেয়েও বিস্ময়কর। সে কারণেই ব্রিটিশ চলচ্চিত্র পরিচালক জেমস মার্শ তার জীবনের গল্প নিয়ে নির্মাণ করেছিলেন ‘দ্য থিওরি অব এভরিথিং’। ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া এই মুভিতে ছিল স্টিফেন ও তার প্রথম স্ত্রী জেন ওয়াইল্ডের প্রেম ও স্ট্রাগলের গল্প।

স্টিফেন হকিং যখন প্রেমে পড়েন, ক’দিন বাদেই তার মোটর নিউরন ডিজিজ ধরা পড়ে। ডাক্তার স্পষ্ট বলে দেন- সর্বোচ্চ দুই বছর সুস্থ থাকবেন হকিং। তারপর আমরণ পঙ্গুত্ব। এমনকি যখন-তখন মৃত্যুও।

হকিং তখন গ্র্যাজুয়েশন করছেন। ক্যামব্রিজে। নিজের ভবিষ্যৎ জানার পর প্রেমিকাকে ফিরিয়ে দেন হকিং। কিন্তু ফিরে যাননি তার প্রেমিকা জেন ওয়াইল্ড। হকিংয়ের ঠোঁটে গাঢ় চুমু এঁকে বলেন, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। তারপর হকিংয়ের চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিজের জামা দিয়ে মুছে দেন। হকিংয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন, সব সময় তোমার চশমাটা অপরিষ্কার থাকে। আমি না থাকলে কে এটা পরিষ্কার করে দেবে?

জেন ওয়াইল্ডের প্রতি মুগ্ধ হন হকিং। ১৯৬৫ সালে দুজন বিয়ে করেন। পটাপট তিনটা বাচ্চার জন্ম দেন। এগিয়ে চলে হকিংয়ের singularity theorems. এরই মধ্যে অবশ্য পদার্থবিদদের মধ্যে হইচই ফেলে দিয়েছেন তিনি। ব্ল্যাক হোল, ইউনিভার্স, টাইম ইত্যাদি বিষয়ের ওপর তার গাণিতিক গবেষণা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা এগিয়ে নিয়ে গেছে হাজার বছর।

পুরো পৃথিবী যখন স্টিফেন হকিংয়ের প্রতি মুগ্ধ, তখন একজন কিছুটা বিরক্ত। তিনি জেন ওয়াইল্ড। হকিংয়ের ভালোবাসার স্ত্রী। কারণ, ততদিনে হকিং পুরোপুরি পঙ্গু। ইলেকট্রিক চেয়ারে বসে থাকেন সবসময়। হাত-পা, মাথা কিছুই নাড়তে পারেন না। এমনকি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অস্পষ্ট বাকশক্তিটুকুও হারিয়েছেন। হকিংয়ের এই পঙ্গুত্ব নিজের জীবনের সঙ্গে ব্যালান্স করতে পারলেন না জেন। হকিংয়ের প্রতি এক ধরনের উদাসীনতা এলো। যদিও দায়িত্ববোধের জায়গাতে সর্বোচ্চটাই করার চেষ্টা করেছেন জেন। তিনি প্রেমে পড়লেন পিয়ানো বাদক জোনাথন জোনসের।

এর মধ্যে আরেক ঘটনা ঘটল। হকিংয়ের পেছনে ২৪ ঘণ্টা সময় দেওয়া জেনের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠল। ইতোমধ্যেই হকিং বিশ্বব্যাপী পরিচিত নাম। পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ত ‘পঙ্গু মানুষ’। হকিংয়ের জন্য একজন সেক্রেটারি নিয়োগ দিলেন জেন। সুন্দরী, স্মার্ট, বুদ্ধিমতী। এলেন ম্যাসন।

হকিং তার সময়ের সেরা গাণিতিক। জীবনের অঙ্ক তিনি নতুন করে মেলালেন। নিজে প্রেমে পড়লেন এলেন ম্যাসনের। অন্যদিকে জেনকে ‘যা খুশি তাই’ করার স্বাধীনতা দিলেন।

ফলাফল ডিভোর্স। স্টিফেন হকিং ও জেন ওয়াইল্ডের ডিভোর্স হয়ে যায় ১৯৯৫ সালে। বিশ্বে প্রায় কিংবদন্তি হতে যাওয়া এক যুগলের প্রেমকাহিনী ভেঙে গেল। সবাইকে হতবাক করে।

সবাইকে আরো হতবাক করে বিশ্বসেরা তাত্ত্বিক পদার্থবিদ একই বছর এলেন ম্যাসনকে বিয়ের ঘোষণা দেন। কথা বলতে না পারা রসিক হকিং বিশেষ কম্পিউটারে বিয়ের বার্তা জানিয়েছিলেন এই বলে, ‘ইটস ওয়ান্ডারফুল! আই হ্যাভ ম্যারিড দ্য লেডি আই লাভ।’

ম্যাসনের মতো সুন্দরী, বুদ্ধিমতীর পঙ্গু হকিংকে বিয়ে করার কারণ ছিল অস্পষ্ট। বিয়ের পর হকিং একা হয়ে পড়েন। বন্ধু-পরিবার থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখেন ম্যাসন। তবে এ বিয়েটা টেকেনি। ২০০৬ সালে খুব নীরবে তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়।

এর পরের গল্পটা বেশ মিষ্টি। হকিং সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেন জেন এবং তার তিন সন্তান ও নাতি-নাতনির সঙ্গে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সে সম্পর্ক ছিল।

‘দ্য থিওরি অব এভরিথিং’ ছবিটির চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছিল জেন ওয়াইল্ডের লেখা বায়োগ্রাফি ‘ট্রাভেলিং টু ইনফিনিটি; মাই লাইফ উইথ স্টিফেন হকিং’ অবলম্বনে। ছবিতে অভিনয় করেছিলেন এডি রেডম্যানে, ফেলিসিটি জোন্স, চার্লি কক্স, এমিলি ওয়াটসন প্রমুখ।