• বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫, ১৫ মহররম ১৪৪০
BK

পিতৃত্বের ভালোবাসা ও মহৎ চিন্তার ফসল ‘প্রমিসেস’

বাবা শাহেদুল ইসলাম হেলালের হূদয় ভেঙে যায়। সন্তানকে ঘিরে ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলোও একে একে মুছে যাচ্ছে। তার দুই ছেলেই মাদকাসক্ত হয়ে গেছে। বেঁচে থাকার অবলম্বন ও পিতৃত্বের শ্রেষ্ঠ পরিচয় সন্তানরা দিন দিন অন্ধকার জগতে নিঃশেষ হতে চলেছে। সন্তানের বর্তমান তছনছ ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস হওয়ার দৃশ্য যেকোনো বাবার জন্যই সবচেয়ে কষ্টের। কিন্তু সন্তানদের সুস্থ ও কাঙ্ক্ষিত জীবনে ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে দমে যাওয়ার মতো বাবা নন তিনি।

দুই সন্তানকে চিকিৎসার জন্য পাঠান ভারতে। মুম্বাইয়ের ল্যান্ড পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে তারা দেশে ফেরেন। তবে বাবার হূদয় উপলব্ধি করে, সন্তান মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসার দিকগুলো কত ভয়ঙ্কর! ভাবলেন, আর কোনো বাবা ও মাকে যেন এসব বেদনা উপলব্ধি করতে না হয়। মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য দেশে আন্তর্জাতিক মানের পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন তিনি।

পরিকল্পনা ও স্বপ্নের বাস্তবায়নও শুরু হয়। গড়ে ওঠে প্রমিসেস মেডিকেল নামে মাদকাসক্তি ও মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্র, ঢাকার বারিধারার জে-ব্লকের ২০ নম্বর সড়কের ১৭ নম্বর বাড়িতে। সন্তানের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর বাবার অপরিমেয় দায়বোধ থেকে এ নিরাময় কেন্দ্রের পথচলা। এমনটার দ্বিতীয় উদাহরণ এ দেশে নেই, এমনকি পৃথিবীজুড়েও খুব বেশি নজির নেই। বাবার পবিত্র ভালোবাসা ও মহৎ চিন্তার সমন্বয়ে পথ চলছে প্রমিসেস মেডিকেল। শাহেদুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান।

প্রমিসেসের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দেশে মাদকের ভয়াবহতা বাড়ছে। অন্তত সত্তর লাখ লোক মাদকাসক্ত। তাদের মধ্যে রোগী কমপক্ষে দশ হাজার। এ তুলনায় নিরাময় কেন্দ্র পর্যাপ্ত নয়। ফলে চিকিৎসার জন্য অনেক অভিভাবক সন্তানকে বিদেশে পাঠিয়ে দেন। বিদেশি নিরাময় কেন্দ্রে পুনর্বাসনের যে পরামর্শ দেওয়া হয়, তা আমাদের সমাজ ও পারিবারিক বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। দেশে ফিরে অনেকে আবার মাদকে জড়িয়ে পড়েন।

২০১৫ সালের শুরুতে প্রমিসেসের পথচলা। তিন বছর পূর্ণ করেছে। মাদকের ছোবলে অন্ধকারে বিলীন হতে বসা অনেক জীবন এখানকার বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা ও পরামর্শে ভালোবাসার পারিবারিক বন্ধনের সুন্দর জীবনে ফিরে এসেছেন। যাত্রার পর প্রমিসেসে এ পর্যন্ত চিকিৎসা নেন ৩৬৮ জন। অধিকাংশ রোগী গড়ে চার থেকে ছয় মাস হাসপাতালটিতে অবস্থান করে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। এখানে চিকিৎসা শেষে আবার মাদকাসক্ত হয়ে ভর্তি হওয়ার নজির নেই। প্রতি শুক্রবারে এখানে ‘ওপেন হাউজ’ শিরোনামে প্রোগ্রাম থাকে।

শাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনায় সরকারের সহায়তা দরকার। এটা সেবামূলক। তাই সরকার কর মওকুফের নিয়ম করতে পারে। আর পুলিশি কিছু হয়রানিও আছে। এগুলোও দূর হওয়া দরকার।’

বিশেষজ্ঞরা বলেন, এখনকার নেশার বিভিন্ন উপকরণেও ভেজাল। এসব সেবন করার ফলে অনেকে মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসায় নেশা দূর হলেও মানসিক সমস্যা অনেক সময় বাড়ছে। তবে শাহেদুল ইসলাম জানান, ‘আমাদের এখানে দুটি দিকেরই চিকিৎসা দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘দেশে নারীদের মধ্যেও মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে। সামাজিক কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানের মাদকাসক্তির বিষয়গুলো লুকিয়ে রাখেন। কোনো কোনো অভিভাবক চার বা ছয় মাসের পুরো চিকিৎসার আগেই সন্তান কিছুটা সুস্থ হলে তাকে বাসায় ফিরিয়ে নেন। এটা ঠিক নয়। পুরো চিকিৎসা শেষ করা উচিত।’

প্রমিসেসে প্রতিদিন গড়ে দুজন করে চিকিৎসা নেন। পরামর্শ নেন আট থেকে দশজন। রোগী আসেন গড়ে ১৫ বছর বয়স থেকে শুরু করে ষাটের বেশি বয়সের। রোগীদের মধ্যে শতকরা ৭০ জন পুরুষ ও নারী শতকরা ৩০ জন। গতকাল বুধবার সেখানে ভর্তি ছিলেন মোট ৩৮ জন। তাদের মধ্যে নারী চারজন। রোগীদের মধ্যে বেশিরভাগই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। এখানে চিকিৎসার খরচও কিছুটা বেশি।

সব রোগীর জন্য চিকিৎসকসহ স্টাফ আছেন ৫৫ জন। চিকিৎসক থাকেন সার্বক্ষণিক। আছে শাহেদুল ইসলামের সবার প্রতি সন্তানের মতো অকৃত্রিম ভালোবাসা। মাদক ও মানসিক অবসাদগ্রস্ত মুক্ত হয়ে কীভাবে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে হয়, এসবও শেখানো হয় প্রমিসেসে।

নারীদের জন্য আছে আলাদা ফ্লোর। অন্য সুযোগ-সুবিধাও আছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরম মমত্বের সঙ্গে ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে সবাইকে সেবা দেওয়া হয়। শেখানো হয় সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের আচরণ। প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশও চমৎকার। আধুনিক মানের এ নিরাময় কেন্দ্র ইতোমধ্যে অভিভাবকদের দারুণ আস্থা অর্জন করেছে। পেয়েছে জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার। ২০১৬-১৭ সালে মাদকাসক্ত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম মূল্যায়নের স্বীকৃতি হিসেবে প্রমিসেস পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রথম পুরস্কার। ২০১৫-১৬ সালে পায় দ্বিতীয় পুরস্কার।

প্রমিমেস নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে শাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে খোলা আকাশ নেই। মাঠ নেই, খেলার জায়গা নেই। এমন স্থানে নিরাময় কেন্দ্র করতে চাই-যেখানে আকাশ, খেলার মাঠ থাকবে।’