• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ৮ মহররম ১৪৪০
BK

শহরে গাছের ডাক্তার

টিম নাইন

আগারগাঁও পরিবেশ অধিদফতরের সামনে ছোট্ট এক টুকরো জায়গা। সেখানে গেলে একটা সবুজ রঙের সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। গাছের হাসপাতাল। তার সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা একটি গাড়ি। এ গাড়িটি আসলে গাছের অ্যাম্বুলেন্স। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দেওয়া এই গাড়িটি দিয়েই ‘গ্রিন সেভার্স’-এর কাজে গতি পেয়েছে।

গাছের হাসপাতাল শুনতে অবাক লাগলেও রাজধানী ঢাকায় এটি প্রায় চার বছর ধরে চালু আছে। আছেন গাছেন ডাক্তারও। হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, সারি সারি টবের মধ্যে গাছ লাগানো। আম, পেয়ারা, কামরাঙা, লেবুসহ হরেকরকম গাছ।

ঘুরতে ঘুরতে দেখা হয়ে গেল হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা আহসান রনির সঙ্গে। গাছের জন্যও হাসপাতাল হবে এমন চিন্তা কেন এলো জানতে চাইলে বললেন, ‘এখানে যে গাছগুলো দেখলেন সবই অসুস্থ। বিভিন্ন বাড়ির ছাদ থেকে এই গাছগুলো নিয়ে আসা হয়েছে। নিয়মিত ওষুধ দেওয়া আর নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয়েছে। সুস্থ হলেই আবার মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।’

ঢাকা শহরে যারা ছাদ বাগান করেন তাদের কাছে পরিচিত মুখ আহসান রনি এবং গ্রিন সেভার্স গাছ হাসপাতাল। গ্রিন সেভার্স-এর উদ্যোগে ঢাকা শহরে গড়ে উঠেছে ৩৬০০ ছাদ বাগান। তবে এই সংখ্যায় আহসান রনিকে সন্তুষ্ট হতে দেখা গেল না। বললেন, ‘ঢাকা শহরে ছাদ আছে সাড়ে চার লাখ। সেই হিসেবে ১ ভাগ কাজও আমরা করতে পারিনি।’

গ্রিন সেভার্সের শুরুটা হয়েছিল হুট করেই। তখন তিনি টিউশনি করান। এক ছাত্রের কাছে জানতে চাইলেন, তার শখ কী? ছাত্র জানাল, ভিডিও গেমস খেলা। বাগান করা, বই পড়া এসব তাহলে শখ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে! ছাত্রের মুখেই শুনলেন গাছ লাগানো শুধু মালিদের কাজ। কথাটা খুব ভাবাল তাকে। বর্তমান সময়ের শিশুরা তাহলে এসবই শিখছে। হঠাৎ করে তার কাছে মনে হলো, শহরটাও তো ভালো নেই। চারদিকে শুধু দালান। সবুজ তো হারিয়ে যেতে বসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানে পড়ার সময়ই আহসান রনি গড়ে তুললেন সবুজ বাঁচানোর সংগঠন গ্রিন সেভার্স। সংগঠনটি প্রায় আট বছর ধরে পথ হাঁটছে। দীর্ঘ এ সময়ে পেরোতে হয়েছে অনেক বাধা। তবু থেমে নেই কাজ।

অনুপ্রেরণাও পেয়েছেন অনেক। সেই সঙ্গে পুরস্কার এসেছে বড় বড় জায়গা থেকে। আহসান রনির ভাষায়, ‘পুরস্কার পাওয়ার মতো এখনো কিছু করিনি। সত্যি সত্যি কিছু করতে পারলে পুরস্কার হবে সেটাই।’

শহর সবুজ করার পাশাপাশি গ্রিন সেভার্সের আরেকটা উদ্দেশ্য হলো কর্মসংস্থান তৈরি করা। কাজ শুরু হয়ে গেছে। নিয়মিত বেতনে কাজ করছেন এমন কর্মীর সংখ্যা ১৩ জন। সবার পরিচয় ‘গাছের ডাক্তার’। যাদের মধ্যে সাতজন আছেন কৃষিতে ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী। রনি বলেন, ‘আমাদের দেশে মালি পেশাটাকে খাটো করে দেখা হয়। অথচ শহরকে সবুজ করার কাজটা তারা করে চলেছে নিভৃতে। শিক্ষিত তরুণরা এই পেশায় আসতে আগ্রহী নয়। কিন্তু বেকারত্ব ঘোচাতে হলে সব পেশাতেই তো কাজ করতে হবে। তাই পেশাটার নাম বদলে আমরা করেছি গাছের ডাক্তার।’

প্রতিদিন সকালে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ডাক্তাররা। সাইকেলের পেছনে থাকে একটি বাক্স। ভেতরে গাছের জন্য নানা ওষুধ আর গাছ পরিচর্যার যন্ত্রপাতি। যেসব বাড়িতে গ্রিন সেভার্সের করা ছাদ বাগান আছে সেখানে নিয়মিত দেখভাল করাই তাদের কাজ।

গ্রিন সেভার্সের লক্ষ্য হলো, ১০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি করা। সে লক্ষ্যে কাজও করে যাচ্ছে নিরন্তর। এই সংগঠনের আরেকটি কাজ হলো প্রজেক্ট অক্সিজেন ব্যাংক। স্কুল শিক্ষার্থীদের গাছ লাগানো এবং পরিচর্যা শেখানোই এই প্রজেক্টের কাজ। মূল লক্ষ্য অবশ্য গাছের প্রতি বাচ্চাদের ভালোবাসা তৈরি করা। ঢাকা শহরে একশ’ স্কুল আর অন্যান্য শহরে তিনশ’ স্কুলে এই কার্যক্রম চলছে। স্কুলের শিক্ষার্থীরা ‘অক্সিজেন ব্যাংক’ নামক একটি ব্যাংকে নিয়মিত টাকা জমা রাখে। নির্দিষ্ট সময় পর সেই টাকায় গাছ কেনা হয়। প্রতিটি গাছ একেকজন শিক্ষার্থীর দায়িত্বে থাকে। সেই এই গাছের লালন পালন করে পরম উৎসাহে।

শিক্ষার্থীদের এই উৎসাহ গ্রিন সেভার্সের কর্মীদের আরো উজ্জীবিত করে। সামনের দিনগুলোর জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। সেই অনুপ্রেরণাতেই গাছের ডাক্তাররা ছুটে চলেন সাইকেল চেপে শহরের গলিতে গলিতে।

 

লেখাঃ সৈয়দ মিজান