• মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫, ২৩ সফর ১৪৩৯
BK

মায়ের মৃতদেহ ৩ বছর ফ্রিজে!

২০১৫ সালের ৭ এপ্রিল মৃত্যু হয় মায়ের। শ্মশানযাত্রার জন্য পাড়ার কয়েক জন এলেও তাঁদের ফিরিয়েই দিয়েছিলেন একমাত্র ছেলে। এমনই দাবি প্রতিবেশীদের। মৃত মহিলার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়েছিল কি না, তাও জানেন না তাঁরা। মৃত্যুর তিন বছর পরে, বৃহস্পতিবার ভোরে বাড়ির ফ্রিজ থেকে পুলিশ উদ্ধার করল সেই মায়ের দেহ! ছেলে শুভব্রতকে আটক করে দীর্ঘ জেরার পরে রাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে ৮৯ বছরের বাবারও।

প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, বেহালার জেমস লং সরণির বাড়িতে মা বীণা মজুমদারের দেহ তিন বছর ধরে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। সরকারি চাকুরে মায়ের পেনশনের টাকার জন্যই শুভব্রত দেহ সৎকার না করে রেখে দিয়েছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

কলকাতা পুলিশের দক্ষিণ-পশ্চিম ডিভিশনের ডিসি নীলাঞ্জন বিশ্বাস জানান, বুধবার মধ্য রাতে সূত্র মারফত খবর পেয়ে ওই বাড়িতে পৌঁছে দেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বীণাদেবীর দেহের বিভিন্ন অংশ আলাদা ভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল বলে সূত্রের খবর। দেহ এবং দেহাংশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। যে ফ্রিজে বীণাদেবীর দেহ সংরক্ষিত ছিল, সেটি ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ফ্রিজটির কাছে কিছু রাসায়নিক মিলেছে। সেগুলিও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ঘরে মিলেছে মাইক্রোবায়োলজি এবং দেহ সংরক্ষণের প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন বই। চর্ম প্রক্রিয়াকরণ নিয়ে পড়াশুনো করা শুভব্রত মৃতদেহ সংরক্ষণের খুঁটিনাটি জানেন বলে পুলিশের দাবি।

তদন্তকারীরা জানান, বীণাদেবী (৮৮) ও তাঁর স্বামী গোপালবাবু দু’জনেই ভারতীয় খাদ্য নিগম (এফসিআই)-এর উচ্চপদে কাজ করতেন। মায়ের পেনশনের টাকার জন্যই ছেলে তাঁর দেহ সংরক্ষণ করেছিলেন বলে প্রাথমিক ভাবে সন্দেহ। ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার নিউ আলিপুর শাখা থেকে বীণাদেবীর পেনশনের টাকা তোলা হত। কিন্তু তিন বছর ধরে এক জন মৃতের ‘লাইফ সার্টিফিকেট’ কী ভাবে পেশ করা হল, সেই প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, তাঁরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।

পুলিশের অন্য একটি সূত্রের দাবি, মৃতদেহ নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে রাখলে তা বেঁচে ওঠে বলে বিশ্বাস শুভব্রতর। তাঁর ঘরে এই সংক্রান্ত বইও মিলেছে। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান প্রবীণ ত্রিপাঠী বলেন, ‘শুভব্রত মনে করেন, ওই ভাবে সংরক্ষণে তাঁর মা এক দিন বেঁচে উঠতেন।’ বাড়িতে আরেকটি নতুন একটি ফ্রিজ মিলেছে। সেটি আনার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে খবর, কয়েক বছর আগে এক সম্পর্কিত বোনকে বিয়ে করে শুভব্রত ঘর ছাড়েন। বীণাদেবী মারা যাওয়ার পরে ফের বাড়িতে যাতায়াত শুরু হয় ছেলের। প্রতিবেশী রত্না চক্রবর্তী বলেন, ‘শুভব্রতকে মাঝেমধ্যে বাড়িতে ঢুকতে দেখতাম।’ চঞ্চল চক্রবর্তী বলেন, ‘বাড়িতে মাঝে মধ্যে পাইপ সারানোর মিস্ত্রি ও এক বৃদ্ধাকে যাতায়াত করতে দেখেছি।’ তদন্তকারীরা জানান, গোপালবাবুর বক্তব্যে অসঙ্গতি মিলেছে।

বাড়িতে দেহ রাখা হলেও কেউ টের পেল না? প্রতিবেশীরা জানান, শুভব্রতর আচরণ অস্বাভাবিক মনে হয়নি। স্থানীয় এক যুবক জানান, ২০১৬ সালে ভোটার তালিকা থেকে বীণাদেবীর নাম বাতিলের জন্য বললে শুভব্রতবাবু তাঁকে তাড়িয়ে দেন। বছর কয়েক আগে এক পরিচারিকা জানিয়েছিলেন, ওই বাড়িতে অস্বাভাবিক কিছু হয়। তবে স্থানীয়রা গুরুত্ব দেননি। বেহালার ঘটনার সঙ্গে মিল রয়েছে ২০১৫ সালের রবিনসন স্ট্রিট-কাণ্ডের। মৃত দিদি ও কুকুরের দেহ মাস ছয়েক আগলে রাখেন পার্থ দে। ওই ক্ষেত্রে যে সব ধারায় মামলা হয়েছিল, এ ক্ষেত্রেও তা-ই করেছে পুলিশ।