• রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১২ মহররম ১৪৪০
BK

চাল আমদানি বাড়লেও সঙ্কট কাটছে না

ছোট্ট ভূখণ্ডের বাংলাদেশ। জনসংখ্যাও বাড়ছে হু-হু করে। স্বাধীনতা-উত্তর গত ৪৭ বছরে সাত কোটি জনসংখ্যা ষোল কোটিতে রূপ নিয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে জনসংখ্যার পরিমাণ কল্পনার সীমানাকেও অতিক্রম করবে। দেশের ভৌগোলিক সীমারেখা স্থির। বাড়তি জনসংখ্যার বসতবাড়ি, নগরায়ণ, হাটবাজার, অফিস আদালত, রাস্তাঘাটসহ নানাভাবে আবাদি জমির আয়তন সমানেই কমছে। চাষযোগ্য জমি কমে যাওয়ায় সীমিত জমিতে বাড়তি ফলন উৎপাদন করে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। স্বাধীনতা-উত্তর দেশে সাত কোটি মানুষের খাদ্য জোগান দেওয়াই ছিল সাধ্যের বাইরে। তখন চাল ও গমের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। ফলে খাদ্য সঙ্কট ছিল তীব্র। দেশীয়ভাবে উৎপাদনের পর চাহিদার বাড়তি খাদ্যের জোগান ছিল আমদানিনির্ভর। গত ৪৭ বছরে তিন গুণ বেড়ে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬১ লাখ টনে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায়- ধান, গম, আলু, ভুট্টাসহ শাক-সবজির উৎপাদন তিন গুণ বেড়েছে। দেখা যাচ্ছে, গত ৪৬ বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও খাদ্য সঙ্কট কাটছে না। বিশ্লেষকদের ধারণা, কৃষিপণ্যের উৎপাদন, জনসংখ্যা বা অন্য কোনো পরিসংখ্যানে বড় ধরনের ভুল থাকতে পারে। তা না হলে মানুষ বাড়ার চেয়েও তুলনামূলক খাদ্য উৎপাদন বাড়ার পরও কেন খাদ্য সঙ্কট কাটছে না? 

তথ্য বিভ্রাট একটি বড় ধরনের সমস্যা। মাত্র দু’বছর আগের কথা। সরকারের দাবি ছিল, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেছে। এখন খাদ্য আমদানি বন্ধ করে আমরা খাদ্য রফতানি শুরু করলাম। কিন্তু আমরা দেখলাম, আগাম বৃষ্টিপাত ও উজানের পানির ঢলে বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহের ৪৪৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকার আধাপাকা ধান পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। যার পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ লাখ টন। পাশাপাশি গোটা দেশে আগাম বৃষ্টির কারণে ‘নেকব্লাস্ট’ রোগে আক্রান্ত হয়ে ধানের ফলন বিপর্যয় ঘটে। ফলে দেখা দেয় খাদ্য সঙ্কট। যা সামাল দিতে দু’দফায় চাল আমদানির ওপর বাড়তি শুল্ক কমিয়ে এনে সরকারি-বেসরকারিভাবে খাদ্য আমদানি শুরু হয়। সে ধারা এখনো অব্যাহত আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪৫ লাখ ৪০ হাজার টন এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫৮ লাখ ২৩ হাজার টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়। আর চলতি অর্থবছরের জুলাই হতে ফেব্রুয়ারি- এই আট মাসে খাদ্য আমদানি করা হয়েছে ৬৭ লাখ ৩৯৪ টন। যা ছিল সর্বকালের রেকর্ড। উল্লিখিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, দেশের খাদ্য চাহিদা মেটাতে খাদ্য আমদানির পরিমাণ ক্রমান্বয়েই বেড়েছে।

মূলত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অতিবৃষ্টি, আগাম বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডোর মাত্রা এখন গোটা দুনিয়ায় বড়মাপের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বাংলাদেশেও কমবেশি প্রতিবছর অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আগাম বন্যা, ফলনে পোকার আক্রমণের মতো দুর্যোগ লেগেই আছে, যা মোকাবেলা করতে সরকারকে হিমশিম খেতে হয়। সুতরাং দুর্যোগের কারণে সরকারিভাবে আপৎকালীন খাদ্য মজুদ রাখা জরুরি। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার মত হচ্ছে, যেকোনো রাষ্ট্রের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অন্তত ৬০ দিনের খাদ্য মজুদ রাখা বাঞ্ছনীয়। এই মতে, আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর এক দিনের খাদ্য চাহিদা প্রায় সাড়ে ৪৫ হাজার টন। যা ৬০ দিনের জন্য দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ২৭ লাখ টন। অথচ আমাদের ৬০ দিন তো দূরের কথা, গড়ে ৩০ দিনের খাদ্যও মজুদ রাখা সম্ভব হয় না। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে খাদ্য সঙ্কট দেখা দেয় এবং ভোক্তার কষ্ট বাড়তেই থাকে।

আমাদের দেশে সরকারিভাবে খাদ্য মজুদ উপযোগী খাদ্যগুদামের সঙ্কটও অনেক পুরনো। অবশ্য মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে প্রায় ৮-১০ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ রাখার উপযোগী খাদ্যগুদাম নির্মাণ করায় বর্তমানে সরকারিভাবে খাদ্য মজুদ উপযোগী গুদামের ধারণ ক্ষমতা প্রায় ১৮-২০ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু ছয় মাস আগেও এসব খাদ্যগুদাম বলতে গেলে শূন্যই ছিল। যা মোকাবেলা করতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে গত আট মাসে প্রায় ৬৭ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করায় সরকারিভাবে আমদানিকৃত খাদ্যশস্যে খাদ্যগুদামগুলো অনেকটাই ভরে গেছে। আমাদের দেশে খাদ্যশস্যের বাড়তি কিংবা বাম্পার ফলন হলেই চাষিদের মাথায় হাত পড়ে। উপযুক্ত মূল্যের অভাবে চাষিরা উৎপাদন খরচ তুলতে পারে না। ফলে পানির দামে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হয়, না হলে ক্ষেতেই ফসল নষ্ট করে ফেলা হয়। এর মূলেই রয়েছে, সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগারের তীব্র সঙ্কট।

 

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিনির্ভর দেশ হওয়ার পরও কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে স্থাপিত হয়নি। অথচ গোটা দেশে সবজি সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার স্থাপন করে সরকারিভাবে ভর্তুকি দিয়ে তুলনামূলক কম ভাড়ায় সবজি সংরক্ষণের সুযোগ দিলে চাষিরা ব্যাপকভাবে সবজি চাষ বাড়িয়ে দেশীয় চাহিদা পূরণের পর বাড়তি পণ্য বিদেশে রফতানি করতে পারত। সরকার কৃষি চাষাবাদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিদ্যুৎ, ডিজেল, সার ও নানা উপকরণে যে পরিমাণ সহায়তা দিয়ে থাকে, সে তুলনায় কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করে না। ফলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়লেও একমাত্র সংরক্ষণের অভাবে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখাও সম্ভব হয় না। আমরা মনে করি, খাদ্যশস্য উৎপাদনে যে পরিমাণ সহায়তা কিংবা সরকারিভাবে ভর্তুকি দেওয়া হয়, সে হারে উৎপাদিত খাদ্যশস্য সংরক্ষণ উপযোগী ছোট-বড় হিমাগার স্থাপনে সহায়তা দেওয়া জরুরি। তা না হলে চাষিরা উপযুক্ত মূল্যের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং চাষের ধারাবাহিকতাও বিঘ্নিত হবে।

মূলত সরকার ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে যেকোনো পণ্য আমদানি কিংবা রফতানি করে থাকে। কিন্তু সরকার অনেক সময়েই ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে দেশীয়ভাবে পণ্য উৎপাদন বাড়ালেও, আবার সেই পণ্য আমদানির আদেশ দিয়ে থাকে; ফলে উৎপাদকের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। মূলত এ বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিতে হবে, যেন উৎপাদকের স্বার্থ কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়। মোদ্দা কথা, সরকারকে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনের ক্ষেত্রে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে একদিকে যেমন ভোক্তার স্বার্থরক্ষা করা সম্ভব হবে না, অন্যদিকে গুটিকয়েক আমদানিকারকের স্বার্থই রক্ষা হবে। আমরা মনে করি, গুটিকয়েক আমদানিকারকের স্বার্থরক্ষার বদলে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় সরকার সঠিক ও উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তা না হলে দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং বাড়তি খাদ্যশস্য আমদানি করেও সঙ্কট মোকাবেলা করা অনেকাংশেই কঠিন হবে। 

 

আব্দুল হাই রঞ্জু 

লেখক : সমাজকর্মী