• বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ৯ মহররম ১৪৪০
BK

বেহুলা লক্ষ্মিন্দরের বাসর সেজেছিল যেখানে

ছবি : সংগৃহীত

‘হায় পাখি, একদিন কালিদহে ছিলে না কি- দহের বাতাসে/ আষাঢ়ের দু-পহরে কলরব করনি কি এই বাংলায়!’

-জীবনানন্দ দাশ

বগুড়ার মহাস্থানগড় গেলে এখনো সেই কালিদহ সাগরের দেখা মেলে। জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মহাস্থানগড়ের অনেক মিথ, গল্প, রূপকথার ইতিহাস। যেমন, ‘দেখেছিল বেহুলাও একদিন গাঙুরের জলে ভেলা নিয়ে- কৃষ্ণা দ্বাদশীর জ্যোৎস্না যখন মরিয়া গেছে নদীর চড়ায়’; ‘বাংলার মুখ’ কবিতাটির এই লাইনগুলো রচিত হয়েছে বেহলা-লক্ষ্মিন্দরের মিথটি নিয়ে। মহাস্থানগড় গেলে আপনি বেহুলার সেই বাসর ঘর দেখতে পাবেন। দেখতে পাবেন শীলাদেবীর ঘাট। যেখানে মৃত স্বামীকে ভেলায় করে নিয়ে যাওয়ার সময় বেহুলা শীলাদেবীর কাপড় কেচে দিয়েছিল। বেহুলা লক্ষ্মিন্দরকে নিয়ে কোন পথে চাঁদ সওদাগরের বাড়ি থেকে ইন্দ্রপুরীতে গিয়েছিল তার পুরো চিত্রটিই মহাস্থানগড়ে ছড়িয়ে আছে বাস্তব দৃশ্যপটে।

মহাস্থানগড় বাংলার প্রাচীন রাজধানী। প্রসিদ্ধ এই নগরী ইতিহাসে পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামেও পরিচিত ছিল। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এখানে সভ্য জনপদ গড়ে উঠেছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকভাবেই তার প্রমাণ মিলেছে। প্রাচীর বেষ্টিত এই নগরীর ভেতর রয়ে গেছে বিভিন্ন আমলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ছিল। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬৩৯ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পুণ্ড্রনগরে এসেছিলেন। ভ্রমণের ধারা বিবরণীতে তিনি তখনকার প্রকৃতি ও জীবনযাত্রার উল্লেখ করে বর্ণনা দেন। বৌদ্ধ শিক্ষার জন্য প্রসিদ্ধ হওয়া চীন ও তিব্বত থেকে ভিক্ষুরা তখন মহাস্থানগড়ে আসতেন লেখাপড়া করতে। এরপর তারা বেরিয়ে পড়তেন দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। ২০১৬ সালে এটি সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা হয়।

বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে প্রাচীন এই জনপদের ধ্বংসাবশেষ। এখনো রয়ে গেছে ক্ষয়িষ্ণু দেয়াল। দেয়াল ধরে গেলে এখনো পাওয়া যায় সেই প্রাচীন জনপদের গন্ধ। পাশেই আছে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর। মহাস্থানগড় থেকে সামান্য উত্তরে গোবিন্দ ভিটার ঠিক বিপরীত দিকে এই জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৭ সালে। মহাস্থানগড় খননের ফলে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন ও অন্যান্য রাজবংশের হাজার বছরের পুরনো অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন সোনা, রূপা, লোহা, ব্রোঞ্জ, পাথর, কাঁসাসহ বিভিন্ন মূল্যবান ধাতব পদার্থ, পোড়ামাটির তৈরি মূর্তি, কালো পাথরের মূর্তি, বেলে পাথরের মূর্তি, মাটি দিয়ে তৈরি খোদাই করা ইট, স্বর্ণবস্তু, বিভিন্ন শিলালিপি, আত্মরক্ষার জন্য ধারালো অস্ত্র, নিত্যপ্রয়োজনীয় তৈজসপত্র ও নানা ধরনের প্রাচীন অলঙ্কার সামগ্রী পাওয়া গেছে, যা এই জাদুঘরে সংরক্ষিত।

১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে মহাস্থানগড় প্রথম আবিষ্কার করেন ফ্রান্সিস বুকানন। ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেক্সান্ডার কানিংহাম প্রথম এই প্রাচীন ঐতিহাসিক নগরীকে পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানীরূপে চিহ্নিত করেন। অনেক পর্যটক ও পণ্ডিত ব্যক্তি, বিশেষত সিজে ও’ডোনেল, ইভি ওয়েস্টম্যাকট ও হেনরি বেভারিজ এই শহরতলী এলাকাটি পরিদর্শন করেন এবং তাদের প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করেন। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে সন্ধান মেলে ব্রাহ্মলিপির। সেই লিপিতে উল্লেখ আছে, পুণ্ড্রনগরের প্রাদেশিক শাসক সম্রাট অশোক দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষকে রাজভান্ডার থেকে খাদ্যশস্য ও অর্থ সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেন। এসব তথ্য-উপাত্ত থেকে প্রসিদ্ধ এই নগরীর প্রাচীনতার প্রমাণ মেলে।

মহাস্থানগড়ে এত সব প্রাচীন ঐতিহ্য ছড়িয়ে আছে যে, একদিনে তা পর্যবেক্ষণ করা কঠিন ব্যাপার। কমপক্ষে এক সপ্তাহ সেখানে থাকতেই হবে। এখানে আছে শাহ সুলতান বলখী মাহিসাওয়ারের মাজার শরিফ। তিনি ১৪তম শতকে এখানে ইসলাম প্রচার করতে এসেছিলেন। কথিত আছে, মাছ আকৃতির নৌকায় করে তিনি তার মুরিদদের নিয়ে বরেন্দ্রভূমিতে আসেন। সেখান থেকে তার নাম এসেছে মাহিসাওয়ার (মাছের পিঠে করে আগমনকারী)। এখানে আরো আছে খোদার পাথর ভিটা, মানকালীর টিভি, গোবিন্দ ভিটা, জিয়ৎ কুণ্ড, বেহুলার বাসরঘরসহ নানা প্রাচীন নিদর্শন। সাধারণ দর্শনার্থীর মতো সেখানে গিয়ে ঘুরলে-ফিরলে কিছুই বোঝা যাবে না। শুধু তো পুরাকীর্তি, ক্ষয়ে পড়া দেয়াল, মাটি ও ঘাসে ঢাকা অনেক জায়গায়। কিন্তু একটু অনুসন্ধানী মন নিয়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে, একটু পড়াশোনা করে মিথ ও কাহিনী জেনে বুঝে গেলে সেখানে গেলে এখনো পাওয়া যাবে হারিয়ে যাওয়া মানুষের ঘ্রাণ। ওই তো কালিদহে ডুবে যাচ্ছে চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙা, মনসাকে নাচ দেখিয়ে মুগ্ধ করে বেহুলা আবার ফিরছে সেই সপ্তডিঙার বহর নিয়ে।