• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৮ সফর ১৪৩৯
BK

রাজা প্রতাপাদিত্য

অনেকের মতে, প্রাচীন গৌড় রাজ্যের যশ হরণ করে ‘যশোহর’ নামটি হয়েছিল। সে সময়ে যশোরের ইতিহাস তাই প্রতাপাদিত্যের ইতিহাস। তার ২৫ বছরের রাজত্বকালের গৌরবগাঁথা আজ পর্যন্ত যশোর-খুলনা অঞ্চলে বিদ্যমান।

জানা গেছে, প্রতাপের পিতা বিক্রমাদিত্য শ্রীহরি ছিলেন কায়স্থ এবং বাংলার আফগান শাসক দাউদ খান কররানির অধীনে একজন প্রভাবশালী রাজ কর্মচারী। দাউদ খানের পতনের পর শ্রীহরি বিপুল সংখ্যক সরকারি সম্পদের মালিক বনে যান এবং ১৫৭৪ সালে খুলনা জেলার দক্ষিণ প্রান্তে জলাভূমি অঞ্চলে এক রাজ্য গড়ে তুলে ‘মহারাজা’ উপাধি গ্রহণ করেন। ১০ বছর পর ১৫৮৪ সালে পুত্র প্রতাপাদিত্য তার স্থলাভিষিক্ত হন। ধারণা করা হয়, প্রথম পর্যায়ে প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ছিল মুকুন্দপুর অঞ্চলে। পরবর্তীতে ধুমঘাটে বা ঈশ্বরীপুর অঞ্চলে রাজধানী স্থাপন করেছিলেন তিনি। পরে ধুমঘাটেরই নাম হয় যশোহর।

জানা গেছে, প্রতাপাদিত্যের অভিষেক কালে বারোভুঁইয়াদের অনেকে যশোর গিয়েছিলেন এবং প্রতাপাদিত্যের কাছে বঙ্গের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য একত্রে কাজ করার প্রতিশ্রুতি করেছিলেন। প্রতাপাদিত্য দেখছিলেন যে, সম্রাট আকবর আগ্রার রাজদরবার, রাজনীতি ও রাজপরিবারের আত্মকলহ- এসব বিষয়ে ব্যস্ত রয়েছেন এবং এর ফলে সমগ্র ভারতবর্ষে বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠেছে। এই সুযোগে প্রতাপ সৈন্যগঠন ও সীমান্ত রক্ষার জন্য সৈন্যবাহিনীকে প্রস্তুত করতে শুরু করেন। মূলত আত্মরক্ষা ও আত্মপ্রাধান্য স্থাপন, পাঠানদের পক্ষ সমর্থন, বঙ্গদেশে হিন্দু শক্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মুঘল ছাড়াও মগ ও ফিরিঙ্গি দস্যুদের পাশবিক নির্যাতন থেকে প্রজাদের রক্ষা করার জন্য প্রতাপ চেষ্টা করছিলেন। এই লক্ষ্যেই তিনি নতুন রাজধানী গোছাচ্ছিলেন এবং মুঘলদের বিতাড়নের উপায় নিয়ে বঙ্গের অন্য ভুঁইয়াদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছিলেন। ভুঁইয়াদের মধ্যে কেউ কেউ প্রতাপের এই বিদ্রোহী চেতনার প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করলেও অনেকেই দূরত্ব বজায় রাখেন। এমনকি প্রতাপের একান্ত সহকর্মী হিসেবে পরিচিত বিক্রমাদিত্যের বন্ধু বসন্ত রায়ও এই বিদ্রোহ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। প্রতাপ তার ওপর মনোক্ষুণ্নও হয়েছিলেন। বসন্ত রায় গঙ্গাতীরের রায়গড় দুর্গে স্থানান্তরিত হন এবং যশোরের ৬ আনা অংশের শাসনকার্য করতে থাকেন। এদিকে, প্রতাপ ১৫৯৯ সালে মুঘলদের বশ্যতা অস্বীকার করে যশোরের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং এই স্বাধীনতা ঘোষণার কয়েক বছর আগে প্রতাপাদিত্য তার পিতৃতুল্য বসন্ত রায়কে আনুমানিক ১৫৯৪-৯৫ সালের দিকে হত্যা করে নিজ চরিত্রে অমোচনীয় কলঙ্ক লেপন করেন। কথিত আছে, প্রতাপাদিত্য সে সময় নিজ নামে মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। স্বাধীনতা ঘোষণার পর প্রতাপাদিত্যের নিজ শাসিত রাজ্যও বহু বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে প্রতাপের ক্ষমতা ও খ্যাতি পুরো ভারতবর্ষেই ছড়িয়ে পড়েছিল।

সে সময় সকলে বিশ্বাস করত, দ্বৈববল ছাড়া কেউ এমন বলশালী হতে পারে না। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে মানসিংহ কাশী থেকে রাজমহলে আসলেন এবং বঙ্গদেশকে প্রকৃতভাবে মুঘল করতলে আনার জন্য পরিকল্পনা শুরু করেন। ১৬০৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিশাল সৈন্যবহর নিয়ে যশোর অভিমুখে যাত্রা করেন। মানসিংহ কালিন্দি নদী পাড় হয়ে বসন্তপুরে ছাউনি করলেন এবং দেখলেন, প্রতাপাদিত্য তার চারিদিকে সৈন্য সাজিয়ে যুদ্ধের সমস্ত আয়োজন করে রেখেছেন। বসন্তপুর ও শীতলপুরের পূর্বভাগে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। অগণিত দিন ধরে এ যুদ্ধ সংঘটিত হলো এবং মানসিংহ বিজয়ী হয়ে প্রতাপাদিত্যকে বন্দি করেছিলেন। মানসিংহ প্রতাপকে চিনতেন এবং অত্যন্ত ভালোবাসতেন। উড়িষ্যাভিযানে প্রতাপের বীরত্বের কথা তার মনে ছিল। তিনি যশোর যুদ্ধে বঙ্গীয় বীরের অসাধারণ সমর কৌশলে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি নিজে মহাবীর, তাই বীরত্বের মর্যাদা বুঝতেন। যুদ্ধ শেষে জয়লাভ করলেও তিনি প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে সন্ধি করেছিলেন। প্রতাপাদিত্য যশোর রাজ্যের ১০ আনা অংশে (বাকি ৬ আনা বসন্ত রায়ের ছেলে কচু রায়) মুঘলদের সামন্ত রাজা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। মানসিংহের এই অভিযানের কয়েক বছর পর ১৬০৯ সালে আকবরের পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীর ইসলাম খাঁর নেতৃত্বে পুনরায় বঙ্গে সৈন্য প্রেরণ করেন। সুদীর্ঘ আঁকাবাঁকা নদীপথ পাড়ি দিয়ে মুঘল সৈন্যরা যশোর রাজ্যের সীমান্তে এসে পৌঁছল। যমুনা ও ইছামতির সঙ্গমে প্রতাপ বাহিনীর সঙ্গে মুঘলদের পুনরায় সংঘর্ষ হয়। প্রতাপ মুঘলদের সমন্বিত আক্রমণ প্রতিহত করতে না পেরে আত্মসমর্পণ করেন। ইসলাম খাঁ প্রতাপকে বন্দি করে রাখেন এবং যশোরকে মুঘল সম্রাজ্যের অন্তর্গত করে নেন। তেজস্বিতা, ধর্মনিষ্ঠা ও স্বাধীনতা স্থাপনের চেষ্টা প্রতাপকে এ অঞ্চলের লোকদের নিকটই শুধু নয়, সমগ্র ভারতবর্ষের মানুষের কাছে অমর করে রেখেছে।