• মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
BK

যুদ্ধে মুসলিমদের ঐতিহাসিক বিজয়সমূহ

ছবি: সংগৃহীত

ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু সুমহান এই ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে সংঘটিত হয়েছে অসংখ্য যুদ্ধও। হয়েছে রক্তপাত। আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা মুসলিম সৈন্যরা ওই যুদ্ধগুলোতে নিজেদের উজাড় করে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন। বেশিরভাগ যুদ্ধে তাদের মনোবলের কাছেই হেরে গেছে শত্রুপক্ষ। ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত কয়েকটি যুদ্ধের বিবরণে এমন ধারণা পাওয়া যায়। মুসলিমরা যে যুদ্ধে কখনো হারেনি এমন নয়। হার থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা হয়েছিলেন আরো সুসংগঠিত। মুসলিমদের ঐতিহাসিক বিজয়গুলোকে জেনে নিন

 

বদরের যুদ্ধ

বদর পবিত্র মদিনা শরিফ থেকে প্রায় ৮০ মাইল দূরবর্তী একটি কূপের নাম। এ নামে একটি গ্রামও রয়েছে। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৮ নভেম্বর রমজান মাসের ১৭তম দিনে সেখানেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামের প্রথম যুদ্ধ।

বদর যুদ্ধের কারণ হিসেবে উল্লেখ আছে, মক্কাবাসীদের মধ্যে যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল কুরাইশরা তাদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালায়, অনেকেই স্বদেশ থেকে বিতাড়িত হয় এবং তাদের ধন-সম্পদ দখল করে নেওয়া হয়। মুসলমানরাও হিজরতের পর মদিনা থেকে প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত হতে থাকে। প্রথমেই তারা কুরাইশদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির প্রয়াশ চালায়। কুরাইশদের সমস্ত গৌরব, অহঙ্কার ও শক্তির প্রধান উৎস ছিল শাম দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য। একবার হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর কাছে মদিনায় সংবাদ পৌঁছে যে, আবু সুফিয়ান একটি বাণিজ্যিক কাফেলার পণ্যসামগ্রী নিয়ে সিরিয়া থেকে মক্কার দিকে যাচ্ছে। আর এই বাণিজ্য মক্কার সমস্ত কুরাইশদের অংশীদার। এ কাফেলার মোট পুঁজি ছিল প্রায় ৫০ হাজার সোনা মুদ্রা দিনার। ১৪০০ বছর আগে যার মূল্য ছিল ২৪ লাখ টাকা। যা বর্তমান বাজারে প্রায় ১৫০ কোটিরও বেশি।

এ কথা সবাই জানত যে, কুরাইশদের এ বাণিজ্য এবং এ বাণিজ্যিক পুঁজিই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। এর ওপর ভরসা করে তারা রাসুল ও তার সাহাবিদের ওপর উৎপীড়ন করে মক্কা থেকে মদিনায় যেতে বাধ্য করেছিল। তাই কাফেলার সংবাদ পেয়ে হজরত মুহম্মদ (সা.) তাৎক্ষণিকভাবে এটি মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সাহাবাদের সঙ্গে পরামর্শ করে যারা যুদ্ধে যেতে ইচ্ছুক তাদের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন। খুব কমসংখ্যক যোদ্ধা নিয়ে তিনি রওনা হলেন। বি’রে সুকাইয়া নামক স্থানে পৌঁছে গণনা করে দেখা যায়, মাত্র ৩১৩ জন সৈন্য তার সঙ্গে ছিল।

এদিকে, সিরিয়ার বিখ্যাত স্থান ‘আইনে জোরকায়’ পৌঁছে এক ব্যক্তি কুরাইশ কাফেলার নেতা আবু সুফিয়ানকে সংবাদ দিল, নবী করিম (সা.) তাদের এ কাফেলার অপেক্ষা করছেন। তিনি এর পশ্চাদ্ধাবন করবেন। আবু সুফিয়ান সতর্ক হয়ে গেলেন এবং সাহায্যের জন্য একটি উষ্ট্রীর নাক-কান কেটে হাওলদাটি উল্টোভাবে উষ্ট্রীর পিঠে বসিয়ে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন। এটি ছিল সেকালে ঘোর বিপদের চিহ্ন। এই চিহ্ন দেখে মক্কা নগরীতে এক হইচই পড়ে গেল। সাজ সাজ রব উঠল। মাত্র ৩ দিনের মধ্যে সমগ্র কুরাইশ বাহিনী পরিপূর্ণ সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। তাদের বাহিনীতে ১ হাজার সৈন্য, ২০০ ঘোড়া, ৬০০ বর্মধারী বদর অভিমুখে রওনা হলো।

বদরের কাছে এসে দু’জন সাহাবিকে আবু সুফিয়ানের সংবাদ নিয়ে আসার জন্য পাঠালেন হজরত মুহম্মদ (সা.)। তারা ফিরে এসে জানাল, আবু সুফিয়ানের কাফেলা মহানবীর পশ্চাদ্ধাবনের খবর পেয়ে নদীর তীর ধরে অতিক্রম করে চলে গেছে। আর কুরাইশরা তাদের রক্ষণাবেক্ষণ ও মুসলমানদের মোকাবেলা করার জন্য হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসছে। ওই সেনাবাহিনীর অধিনায়ক ছিল আবু জেহেল ইবনে হিশাম। পথে পথে উট জবাই করে ভূরিভোজন করে তারা এগিয়ে আসছিল। আর মুসলিম শিবির রোজা ও ক্ষুধা নিয়ে এগিয়ে চলছিল।

যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে কুরাইশদের আসওয়াদ ইবনে আবদুল আসাদ মাখজুমি এগিয়ে এসে মুসলিমদের পানির জলাধার দখল করে নেবে না হয় এজন্য জীবন দেবে বলে ঘোষণা দেয়। এরপর মুসলিমদের পক্ষ থেকে হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব অগ্রসর হয়ে তার সঙ্গে লড়াই করেন। লড়াইয়ে আসওয়াদের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আহত অবস্থায় আসওয়াদ চৌবাচ্চার দিকে এগিয়ে যায় এবং প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্য চৌবাচ্চার সীমানার ভেতর ঢুকে পড়ে। এরপর হামজা তাকে হত্যা করেন। এটি ছিল বদরের প্রথম মৃত্যু।

এরপর তৎকালীন রীতি অনুযায়ী দ্বন্দ্বযুদ্ধের মাধ্যমে লড়াই শুরু হয়। কুরাইশদের মধ্য থেকে উতবা ইবনে রাবিয়া, শাইবা ইবনে রাবিয়া ও ওয়ালিদ ইবনে উতবা লড়াইয়ের জন্য অগ্রসর হন। তাদের লড়াইয়ের আহ্বান শুনে মুসলিম আনসারদের মধ্য থেকে আওফ ইবনে হারিস, মুয়াব্বিজ ইবনে হারিস ও আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এগিয়ে আসেন। কিন্তু কুরাইশ যোদ্ধারা তাদের কটাক্ষ করে বলেন, তারা তাদের যোগ্য না এবং যেন সমশ্রেণির কাউকে লড়াইয়ের জন্য পাঠানো হয়। এরপর তাদের বদলে হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব, উবাইদা ইবনে হারিস ও আলি ইবনে আবি তালিবকে পাঠানো হয়। হামজার সঙ্গে শাইবা, আলির সঙ্গে ওয়ালিদ ও উবাইদার সঙ্গে উতবা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। কুরাইশ পক্ষের তিনজনই লড়াইয়ে নিহত হয়। লড়াইয়ে মুসলিম উবাইদা আহত হন। যুদ্ধের কয়েকদিন পর তার মৃত্যু হয়। তিনজন নেতৃস্থানীয় যোদ্ধার মৃত্যুর ফলে কুরাইশদের মনোবলে ফাটল ধরে।

দ্বন্দ্ব যুদ্ধের পর কুরাইশরা মুসলিমদের ওপর আক্রমণ শুরু করে। যুদ্ধের আগে মুহম্মদ (সা.) নির্দেশ দেন শত্রুরা বেশি সংখ্যায় কাছে এলেই যেন তীর চালানো হয়। মুসলিমরা ‘ইয়া মানসুর আমিত’ স্লোগান দিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধে মক্কার কুরাইশরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং পিছু হটতে বাধ্য হয়। মুয়াজ ইবনে আমর ও মুয়াজ ইবনে আফরা কুরাইশ পক্ষের সর্বাধিনায়ক আবু জাহলকে হত্যা করেন। বিলালের হাতে তার সাবেক মনিব উমাইয়া ইবনে খালাফ নিহত হন। উমর ইবনুল খাত্তাব তার মামা আস ইবনে হিশাম ইবনে মুগিরাকে হত্যা করেন। বিকালের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। কোরআনে উল্লেখ আছে, এই যুদ্ধে হাজারো ফেরেশতা মুসলিমদের সহায়তার জন্য এসেছিলেন।

যুদ্ধ শেষে নিহত মুসলিমদের যুদ্ধক্ষেত্রে দাফন করা হয়। নিহত কুরাইশদের লাশ একটি কূপে নিক্ষেপ করা হয়। আরবের রীতি অনুযায়ী মুসলিমরা তিনদিন যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করার পর মদিনায় ফিরে আসে। যুদ্ধে কয়েকজন কুরাইশ নেতাসহ ৭০ জন বন্দি হন। বন্দিদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা হয়েছিল। মুসলিমরা নিজেরা খেজুর খেয়ে বন্দিদের রুটি খেতে দেয়।

বন্দিদের ব্যাপারে আবু বকর মত দেন, সবাই মুসলিমদেরই ভাই, একই বংশের সদস্য অথবা আত্মীয়। তাই তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া উচিত যাতে মুসলিমদের তহবিলে অর্থ সঞ্চিত হয় এবং বন্দিরা ভবিষ্যতে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পান। উমর ইবনুল খাত্তাবের মত ছিল বন্দিদের প্রতি কোনো প্রকার অনুকম্পা প্রদর্শন না করে মুসলিমদের প্রত্যেকে বন্দিদের মধ্যে নিজ নিজ আত্মীয়কে হত্যা করে যাতে প্রমাণ হয় যে, মুশরিকদের ব্যাপারে মুসলিমদের মনে কোনো দুর্বলতা নেই। মুহম্মদ (সা.) আবু বকরের মত মেনে নিয়ে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এক হাজার থেকে চার হাজার দিরহাম পর্যন্ত মুক্তিপণ নির্ধারিত হয়। পাশাপাশি মুত্তালিব ইবনে হানতাব, সাইফি ইবনে আবি রিফায়া ও আবু ইজজা জুমাহিসহ কয়েকজন বন্দিকে মুক্তিপণ ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া যারা পড়ালেখা জানত, তারা ১০ জন নিরক্ষর মুসলিমদের শিক্ষা দিলে তা মুক্তিপণ হিসেবে গৃহীত হবে ঘোষণা করা হয়। বন্দিদের মধ্যে মুহম্মদ (সা.)-এর মেয়ে জয়নব বিনতে মুহম্মদের স্বামী আবুল আসও ছিল। জয়নবকে মদিনা আসতে বাধা দেবে না এই শর্তে আবুল আসকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তারা হলেন নাদার ইবনে হারিস ও উকবা ইবনে আবু মুয়াইত। বদর থেকে ফেরার সময় পথিমধ্যে তাদের হত্যা করা হয়।

বদর যুদ্ধের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। যুদ্ধ জয়ের ফলে নেতা হিসেবে মুহম্মদ (সা.)-এর কর্তৃত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। মদিনার অনেকে এ সময় ইসলাম গ্রহণ করে। বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুসলিমদের খুবই সম্মানের চোখে দেখা হতো।

অন্যদিকে, যুদ্ধে আবু জাহলসহ মক্কার অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তির মৃত্যুর ফলে আবু সুফিয়ান নতুন নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। পরবর্তী সময়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে তিনি কুরাইশদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। মক্কা বিজয়ের সময় আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলিম হওয়ার পর আবু সুফিয়ান মুসলিম সাম্রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার ছেলে মুয়াবিয়া উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন।

 

মুসলমানদের স্পেন বিজয়

স্পেন বিজয় ইসলামের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যময় ঘটনা। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে মুসা বিন নুসাইর এবং তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে এক ঐতিহাসিক অভিযানে মুসলমানরা স্পেন জয় করে।

স্পেন মুসলিম আমলে আন্দালুস নামে পরিচিত ছিল। মুসলমানদের আগমনের পূর্বের স্পেন গথিক রাজাদের অধীনে প্রায় ৩০০ বছর ছিল। তখন স্পেনে জনগণের কোনো কল্যাণ হয়নি, বরং তারা ছিল নানা সমস্যায় জর্জরিত। শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারে ভূমিদাস, ক্রীতদাস, বর্গাদার ও ইহুদিদের মধ্যে করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় রাজনৈতিক অবস্থা এক শোচনীয় পর্যায়ে উপনীত হয়। এরূপ নাজুক ও ভয়াবহ অবস্থায় উমাইয়া বংশের শ্রেষ্ঠ খলিফা আল ওয়ালিদের শাসনামলে স্পেনের বিরুদ্ধে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদ ও মুসা বিন নুসাইর।

মুসলমানদের অভিযানের পূর্বে স্পেনে কেন্দ্রীয় শাসন ছিল খুবই দুর্বল। রাজপরিবারগুলোর মধ্যে গোত্রীয় কলহ রাজনৈতিক অবস্থাকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। গথিক রাজা রডারিক পূর্ববর্তী রাজা উইটিজারকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করায় উইটিজার ভ্রাতা, পুত্র, জামাতা সবাই বিরোধী হয়ে উঠেছিল।

অপরদিকে, কাউন্ট জুলিয়ানের কন্যা ফোরিন্ডা রাজা রডারিক কর্তৃক শ্লীলতাহানির শিকার হন। ফলে কাউন্ট জুলিয়ান প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উত্তর আফ্রিকার মুসলিম গভর্নর মুসা বিন নুসাইরকে স্পেন আক্রমণের আহ্বান জানান। তবে মুসলমানদের স্পেনে আগমনের ক্ষেত্রে তৎকালীন ধর্মীয় ব্যবস্থাও অনেক সুযোগ করে দিয়েছিল। তৎকালীন স্পেনের রাজা আদেশ জারি করেছিলেন, ইহুদিরা হয় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করবে, নয়তো স্পেন ত্যাগ করবে। এ দুইয়ের ব্যতিক্রম হলে তাদের হত্যা করা হবে। জানা যায়, ৬১২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার ইহুদিকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হয়।

কাউন্ট জুলিয়ান ও উত্তর আফ্রিকার স্পেনীয় উদ্বাস্তুদের অনুরোধে মুসা বিন নুসাইর স্পেনের প্রাথমিক অবস্থা জরিপের জন্য অধীনস্থ সেনানায়ক তারিক বিন যিয়াদকে ৭১০ খ্রিস্টাব্দে চারটি যুদ্ধজাহাজে চারশ’ পদাতিক ও একশ’ অশ্বারোহী বার্বার সৈনিকসহ স্পেনে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তারিক ফিরে এসে অভিযান পরিচালনার অনুকূলে প্রতিবেদন পেশ করেন।

উত্তর আফ্রিকার শাসনকর্তা ও সামরিক অধিনায়ক মুসা ৭১১ সালে তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে সাত হাজার বার্বার ও ৩০০ আরব সৈন্যের একটি বাহিনী দ্বিতীয়বারের মতো স্পেন বিজয়ের জন্য প্রেরণ করেন। পরবর্তীকালে সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ১২ হাজারে পৌঁছে। কাউন্ট জুলিয়ান কর্তৃক প্রেরিত চারটি জাহাজে তারিক জিব্রাল্টার প্রণালি অতিক্রম করে স্পেনের পার্বত্য অঞ্চলে অবতরণ করেন। তারিক যে স্থানে ঘাঁটি স্থাপন করছিলেন তা আজো জাবালুত তারিক (তারিকের পর্বত) নামে পরিচিত। তিনি স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল দখল করেন। এরপর ৭১১ সালের ১৯ জুলাই ওয়াদি লাস্কের নিকটবর্তী সারিস বা জেরেখে মুসলিম ও গথিক বাহিনীর মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়। এ যুদ্ধ ইতিহাসে ওয়াদি লাস্কের যুদ্ধ নামে পরিচিত। এক লাখ সৈন্য থাকলেও রাজা রডারিক শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও নিহত হন। এ অভিযানে স্পেনের ভবিষ্যৎ রাজধানী কর্ডোভার এবং মূল রাজধানী টলেডোর পতন ঘটে।

মুসা ৭১২ সালে তারিকের অধিকৃত অঞ্চল ব্যতিরেকে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের খ্রিস্টান অধ্যুষিত শহরগুলোর দিকে অভিযান প্রেরণ করেন। তিনি মাত্র ১৮০০ সৈন্য নিয়ে অতি সহজে মেদিনা, সেভিল, মেরিদা দখল করেন। এরপর তারিক ও মুসার সম্মিলিত বাহিনীর অভিযানে লিও, গ্যালিসিয়া ও সরারগোসা মুসলিম অধিকারে আসে। তারপর তারা আরাগানে উপস্থিত হয়ে লিজিও আমিয়া অধিকার করেন। মাত্র দুই বছরে সমগ্র স্পেনে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজা রডারিকের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে স্পেনে মুসলমানদের আধিপত্য বিস্তারের পর অল্পদিনের মধ্যে স্পেন দামেস্কের উমাইয়া খেলাফতের অধীনে চলে আসে। অবশেষে ধারাবাহিকভাবে খলিফারা স্পেনে খেলাফতের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ৭৫০ সালে জাবের যুদ্ধের মাধ্যমে আব্বাসীয়দের হাতে উমাইয়াদের পতন হলে, আব্বাসীয় খেলাফতের প্রথম দিকে আবদুর রহমান আদদাখিল নামক এক ব্যক্তি দামেস্ক থেকে পালিয়ে গিয়ে স্পেনে আশ্রয় নেন এবং সেখানে তিনি অবস্থান করার পর স্বাধীনভাবে আবার উমাইয়া খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। ধারাবাহিকভাবে ১০৩১ সাল পর্যন্ত এই খেলাফত চলতে থাকে। পরবর্তীতে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হলে স্পেনে মুসলিম আধিপত্য চলতে থাকে।

স্পেনের জনগণের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্পেন বিজয় প্রভাব বিস্তার করে। মুসলমানদের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা, মসজিদ নির্মাণ ও প্রাসাদ স্থাপন করা হয়। খ্রিস্টান ও ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে পালনের অনুমতি লাভ করেন। তিন শতাধিক খ্রিস্টান ভূস্বামীকে তাদের জমিদারি ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং পূর্ব ক্ষমতা ও পদে পুনর্বহাল করা হয়। তাদের রাজদরবারের আনুষ্ঠানিকতা থেকেও রেহাই দেওয়া হয়। ইসলামী জীবনব্যবস্থা চালু হওয়াতে জনগণ দাসপ্রথা থেকে অব্যাহতি লাভ করে এবং সামন্ত প্রথার নাগপাশ থেকে মুক্তি পায়। কৃষকদের মালিকানা স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়া, প্রাচ্যের শস্যাদি চাষাবাদ করা এবং সেচ ব্যবস্থার প্রচলনের ফলে কৃষিক্ষেত্রে এক নবযুগের সূচনা হয়। প্রাচ্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও মুসলমানদের উন্নতমানের জীবনযাপনের দরুন এবং শাসকদের উদারনীতি গ্রহণের জন্য জনজীবনে, বাণিজ্যে ও শিল্পক্ষেত্রে উন্নতিসাধিত হয়। সুয়েভি, গথ, ভ্যান্ডাল, রোমান এবং ইহুদি নির্বিশেষে সবার জন্যই সামাজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হয়। কঠোর ও নির্যাতনমূলক ভিজিগথিক আইনকানুন বাতিল হওয়ায় ইহুদিরা বিশেষভাবে উপকৃত হয় এবং মুসলমানদের মিত্র হিসেবে সরকারি চাকরির সুযোগ লাভ করে। কালক্রমে কর্ডোভা ইহুদিবাদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।

 

 

মক্কা বিজয়

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ৬৩০ সালে রক্তপাতহীনভাবে মক্কা নগরী দখল করেন। ইতিহাসে এই ঘটনা ‘মক্কা বিজয়’ নামে খ্যাত। ঐতিহাসিকদের মতে, এটাই ইসলামের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়। প্রকৃতপক্ষে হুদাইবিয়ার সন্ধি এবং মক্কা বিজয় দুটিই মুহাম্মদ (সা.)-এর অতুলনীয় দূরদর্শিতার ফল। মক্কা বিজয়ের ফলে মুসলমানদের পক্ষে আরবের অন্যান্য এলাকা জয় করা সহজ হয়ে যায়। হুদাইবিয়ার সন্ধি মোতাবেক সন্ধির পরবর্তী বছর মুহাম্মদ (সা.) দুই হাজার সাহাবা নিয়ে মক্কায় উমরা পালন করতে যান এবং কুরাইশদের মধ্যে নেতৃত্বের শূন্যতা লক্ষ করেন। অপেক্ষায় ছিলেন মক্কা বিজয়ের জন্য। এক বছরের মাথায়ই তিনি সেটাকে সম্পন্ন করার জন্য মনস্থির করে ফেলেন।

হুদাইবিয়ার সন্ধির অল্প কিছুদিন পরই ইসলাম ব্যাপকভাবে প্রসারিত হতে শুরু করে যা কুরাইশদের শঙ্কিত করে তোলে। তাই তারা তায়েফের সাকিফ গোত্র এবং হুনায়নের হাওয়াজিন গোত্রদ্বয়ের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে মদিনা আক্রমণের পরিকল্পনা করে। কিন্তু ১০ বছরের এই চুক্তির কারণে তারা আক্রমণ করতে পারছিল না। তাই তারা প্রথমে চুক্তি বাতিলের ষড়যন্ত্র শুরু করে। সন্ধির চুক্তি মতে, বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সঙ্গে এবং বনু খুযাআ গোত্র মদিনার ইসলামী সরকারের সঙ্গে মৈত্রীসূত্রে আবদ্ধ হবে। তাদের মধ্যে অনেক আগে থেকেই শত্রুতা চলছিল। এর কারণ ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে বনু হাদরামি গোত্রের জনৈক এক ব্যক্তি খুযাআ গোত্রের এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় খুযাআ গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করে। এরপর বনু বকরের লোকেরা খুযাআ গোত্রের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আবার খুযাআ গোত্রের লোকেরা বনুবকরের একাংশ বনু দায়েলের সরদার আসওয়াদের তিন সন্তান সালমা, কুলসুম এবং যুবাইরকে হারাম শরিফের সীমানার কাছে হত্যা করে। ইসলামের আবির্ভাবের ফলে এসব বিরোধ অনেকটা থেমে যায়। কিন্তু হুদাইবিয়ার সন্ধির পর আবার বনু বকর সুযোগ খোঁজে। একদিন বনু দায়েল পরিবারের প্রধান নাওফেল ইবনে মুয়াবিয়া বনু খুযাআ গোত্রের মুনাব্বিহ নামক এক ব্যক্তিকে ওয়াতির নামক জলাশয়ের নিকট ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করেন এবং এতে পূর্বশত্রুতা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ফলে দুই গোত্রের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়।

কুরাইশরা সন্ধি বাতিলের জন্য একে একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। তারা ভেবেছিল, বিস্তারিত তথ্য মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে পৌঁছাবে না। তাই তারা রাতের আঁধারে বনু বকরের পক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। খুযাআ গোত্রের ওপর রাতের অন্ধকারে নিরস্ত্র অবস্থায় আক্রমণ করা হয় এবং নিরুপায় হয়ে তারা হারাম শরিফে আশ্রয় গ্রহণ করে। হারাম শরিফে রক্তপাত নিষিদ্ধ। কিন্তু নাওফেল সবকিছু অমান্য করে কুরাইশ এবং বনু বকরকে নিয়ে হারাম শরিফের অভ্যন্তরে খুযাআ গোত্রের অনেক লোককে হত্যা করে। তা ছিল হুদায়বিয়া চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই ঘটনার পর খুযাআ গোত্রের আমর ইবনে সালিম মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে এসে সব ঘটনা বর্ণনা করেন এবং সাহায্যের আবেদন জানান। মুহাম্মদ (সা.) তাদেরকে সাহায্য করা হবে বলে আশ্বাস দেন এবং তখনই মক্কা বিজয়ের ব্যাপারে মনস্থির করেন। এর পর পরই মুহাম্মদ (সা.) হত্যাকাণ্ডের কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে তিনটি শর্তারোপ করে কুরাইশদের কাছে একজন দূত প্রেরণ করেন। কথা ছিল, শর্তগুলোর যেকোনো একটি মানতে হবে। শর্তানুযায়ী, খুযাআ গোত্রের নিহতদের রক্তপণ শোধ করতে হবে, নয়তো কুরাইশদের দ্বারা বনু বকরের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি বাতিল ঘোষণা করতে হবে বা এই ঘোষণা দিতে হবে যে, হুদাইবিয়ার সন্ধি বাতিল করা হয়েছে এবং কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। কুরাইশদের পক্ষ থেকে কারতা বিন উমর তৃতীয় শর্তটি গ্রহণ করেন। কিন্তু সিদ্ধান্তটি ভুল হয়েছে বুঝতে পেরে কুরাইশরা হুদাইবিয়ার চুক্তি নতুন করে নবায়ন করার দাবি জানায়। কিন্তু মুহাম্মদ (সা.) এ ব্যাপারে তাদের কোনো সাড়া দেননি।

মুহাম্মদ (সা.) মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি সর্বোচ্চ গোপনীয়তার মাধ্যমে শুরু করেন। বনু সুলাইম ও বনু আশজা এবং বনু মুযায়না ও বনু গিফার এবং বনু আসলাম গোত্রের অনেকেই প্রস্তুতি নিয়ে মদিনা থেকে মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে বের হন। এই দলের সঙ্গে খালিদ বিন ওয়ালিদও ছিলেন। আবার অনেকেই পথিমধ্যে মিলিত হন। এভাবে মুসলমানদের মোট সৈন্যসংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার জনে। মুসলিম বাহিনী ৮ম হিজরি সালের ১০ রমজান তারিখে মদিনা থেকে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করে। তখন মুসলমানদের সবাই রোজা রেখেছিলেন এবং কাদিদ নামক স্থানে কুদাইদ এবং উসফান নামক এলাকার মধ্যবর্তী একটি ঝরনার কাছে আসার পর তারা রোজা ভঙ্গ করেন। এরপর ওই রমজানে আর কেউ রোজা রাখেননি। দশ হাজার মুসলিম নিয়ে রসুল (সা.) মক্কার নিকটে এসে ছাউনি ফেলেন। মুসলিম সেনাদের শক্তি সম্পর্কে ধারণা পেতে কুরাইশ সরদার আবু সুফিয়ান গোপনে সেই ছাউনির কাছে আসেন। মুসলিম প্রহরীরা তাকে গ্রেফতার করে এবং রসুল (সা.)-এর সামনে নিয়ে যায়। রসুল (সা.) তাকে মুক্ত করে দেওয়ার নির্দেশ দেন প্রহরীকে। আবু সুফিয়ানকে যখন ছেড়ে দেওয়া হলো, তখন তার অন্তর কেঁদে উঠল। এতদিনের অন্যায় কাজগুলোর স্মৃতি তার হূদয়ে তীরের মতো বিঁধতে লাগল। অনুশোচনায় ভরে উঠল তার মন। মুক্তি পেয়েও তিনি মক্কায় না ফিরে ইসলাম গ্রহণ করলেন।

যখন মক্কায় প্রবেশ করে মুসলিমরা, তখন ছোট্ট একটি সংঘর্ষ হয়। একদল মুশরিক তীর ছুড়ে তিনজন মুসলিমকে শহীদ করেন। পাল্টা আক্রমণে তাদের ১৩ জন প্রাণ হারায়। বাকিরা পালিয়ে যায়। রসুল (সা.)-এর পরিচালিত বাহিনীর সামনে আসেনি কেউই। বিনা বাধায় মুসলিম বাহিনী শহরে প্রবেশ করে। মক্কায় প্রবেশ করেই রসুল (সা.) মক্কা বিজয়ের ঘোষণা দেন।

 

হুনাইনের যুদ্ধ

 

হাওয়াযেন গোত্র যখন মুসলমানদের মক্কা বিজয়ের সংবাদ পেল তখন মালেক বিন আওয়াফ হাওয়াযেন গোত্রকে ইসলামের বিরুদ্ধে একত্রিত করে। তাদের সঙ্গে সাকিফ, জুশাম এবং অন্যান্য গোত্রও এসে যোগ দেয়। বিরাট এক বাহিনী প্রস্তুত করে রাসুল (সাঃ)-এর বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধের ঘোষণা দিল।

তাদের ভিতরে বিদ্বেষ ও বিরুদ্ধতার আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। এ প্রস্তুতির কথা জেনে নবী করিম (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলেন, এই ক্রমবর্ধমান ফিতনাকে সময় থাকতেই মিটিয়ে ফেলতে হবে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অষ্টম হিজরির ১০ শাওয়াল প্রায় ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে হজরত (সা.) শত্রুর মোকাবেলার জন্য রওনা হন। ওই সময় মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যার পাশাপাশি যুদ্ধ-সরঞ্জামও ছিল প্রচুর। এটা দেখেই সৈন্যদের মনে বিশ্বাস জন্ম নিল যে, শত্রুরা কিছুতেই তাদের সঙ্গে পেরে উঠবে না।

হুনাইন হচ্ছে মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী একটি উপত্যকা। এখানেই ওই ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলমানরা সামনে আসা মাত্র শত্রুরা আশপাশের পাহাড় থেকে এলোপাতাড়ি তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করে। এমন পরিস্থিতির জন্য মুসলমান সৈনিকরা মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ফলে সৈন্যদলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং কিছুক্ষণের জন্য তারা ময়দান ত্যাগ করে। অনেক বেদুইন গোত্র যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে গেল। এদের মধ্যে সবেমাত্র ইমান এনেছে এবং পূর্ণ প্রশিক্ষণ পায়নি এমন অনেক নও-মুসলিমও ছিল। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে হজরত (সা.) অত্যন্ত দৃঢ়তা ও প্রশান্ত চিত্তে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে রইলেন এবং শত্রুর মোকাবেলা না করে ময়দান থেকে না পালানোর জন্য মুসলমানদের প্রতি ক্রমাগত আহ্বান জানাতে লাগলেন। তার এই অপূর্ব ধৈর্য এবং তার চারপাশে বহু সাহাবির অকৃত্রিম দৃঢ়তা দেখে মুসলিম সৈন্যরা আবার ময়দানে আসতে শুরু করল এবং নবতর উৎসাহ-উদ্দীপনা ও শৌর্য-বীর্যের সঙ্গে দুশমনদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। যুদ্ধে শত্রু শিবিরের ৭০ জন নিহত এবং সহস্রাধিক বন্দি হলো। যারা পালিয়ে গেল, তারা তায়েফে আশ্রয় নিল। কারণ তায়েফকে একটি নিরাপদ স্থান মনে করা হতো। হজরত (সা.) তাদের পশ্চাদ্ভাবন করলেন এবং তায়েফ অবরোধ করলেন। তায়েফে একটি মশহুর ও মজবুত দুর্গ ছিল। এর ভেতরই কাফিররা আশ্রয় নিয়েছিল। অবরোধ প্রায় বিশ দিন অব্যাহত রইল। হজরত (সা.) সে সময় অনুধাবন করলেন, দুশমনদের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে এবং এখন আর তাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর উপায় নেই। তাই তিনি অবরোধ তুলে নিলেন এবং তাদের জন্য দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! সাকিফ গোত্রকে সুপথ প্রদর্শন কর এবং তাদের আমার কাছে হাজির হওয়ার তাওফিক দাও।’