• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
BK
মহাসড়কে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ

পণ্যমূল্য বাড়ার নতুন অজুহাত

পণ্যমূল্য বাড়ার নতুন অজুহাত
ছবি : বাংলাদেশের খবর

চলতি বছর চালসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ে অস্বাভাবিক হারে। পণ্যের দাম বাড়ার দৃশ্যমান নানা কারণের সঙ্গে মহাসড়কে পণ্যবাহী গাড়ির ওজন নিয়ন্ত্রণকে অজুহাত হিসেবে দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কের স্থায়িত্ব রক্ষায় ওজন নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। এতদিন ধরে ব্যবসায়ীরা নিয়ম না মেনে গাড়িতে অতিরিক্ত পণ্য বহন করেছেন। এ প্রবণতা দুর্ঘটনা ঘটানোর পাশাপাশি সড়ক ও সেতুর স্থায়িত্ব নষ্ট করেছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত নভেম্বর থেকে প্রায় প্রতিটি মহাসড়কে নতুন নতুন ওজন স্টেশন বসানোর কারণে আগের পরিমাণে পণ্য পরিবহন সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে পরিবহন খরচ বাড়ছে। এ ছাড়া তাদের দাবি, এসব লোড (ওজন) নিয়ন্ত্রণের নামে মহাসড়কে নৈরাজ্য চলছে। লোড নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পণ্যবাহী মোটরযান থেকে বিভিন্ন কৌশলে চাঁদাবাজি করছে। চাঁদা দেওয়া হলে অতিরিক্ত ওজন বহনকারীদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়। সেটা যুক্ত হচ্ছে পণ্যের দামের সঙ্গে।

সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে যে পরিমাণ পণ্য দুই গাড়িতে পরিবহন সম্ভব হতো তা এখন তিন গাড়িতে পরিবহন করতে হচ্ছে। উদাহরণ দিয়ে সিমেন্ট কোম্পানির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ছয় চাকার ট্রাকে আগে যেখানে ২০ টন সিমেন্ট পরিবহন করা হতো, এখন সেখানে হচ্ছে ১৩ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ টন। আবার ১০ চাকার ডাম্প ট্রাকে আগে যেখানে ২৫ টন পরিবহন হতো, এখন সেখানে হচ্ছে সাড়ে ১৭ টন। এই খরচও যুক্ত হয়েছে সিমেন্টের দামে। ফলে ফেব্রুয়ারিতে সিমেন্টের দাম বেড়েছিল প্রায় ১৫ শতাংশ।

একই ধরনের তথ্য দিয়ে বাবুবাজারের এসবি রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী একরামুল হোসেন বলেন, চালের দাম বৃদ্ধির একটি বড় কারণ ছিল রাস্তায় ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ। তার দাবি, এই এক্সেল লোড কার্যকর হওয়ার আগে বেনাপোল থেকে আসতে প্রতি ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৭ থেকে ২০ হাজার টাকা। কিন্তু এখন হয়েছে ২২ থেকে ২৫ হাজার। তারপরও একটি ট্রাকে ২০ টনের জায়গায় ১৩ টন চাল পরিবহন সম্ভব হচ্ছে। শুধু চাল, সিমেন্ট নয়, কয়লা, রড, পাথর, বালু, সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে এই লোড নিয়ন্ত্রণকে দায়ী করছেন।

এদিকে সড়কের ক্ষতি এড়াতে অতিরিক্ত পণ্যবাহী যান চলাচলে কড়াকড়িকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অনেকে। কারণ মহাসড়কের ওজন স্কেলগুলোতে অতিরিক্ত পণ্যবাহী যানবাহনকে জরিমানা করা হচ্ছে। রাস্তা সুরক্ষা ও সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে এর বিকল্প নেই। আধুনিক বিশ্বে কঠিনভাবে এ আইন পরিপালন করা হয়।

সড়কের স্থায়িত্ব রক্ষায় ২০১২ সালে এই এক্সেল লোড নীতিমালা প্রণয়ন করে সরকার। নীতিমালা অনুযায়ী, ট্রাক ও কভার্ড ভ্যানে পণ্য পরিবহনের সর্বোচ্চ সীমা ২০ টন। আর প্রাইম মুভার, ট্রেইলারের পণ্য বহন ক্ষমতা ৩৩ টন। দেশে চলাচলরত দুই এক্সেলের ট্রাকের ক্ষেত্রে সামনের চাকায় লোড হবে সাড়ে পাঁচ টন ও পেছনের চাকায় ১০ টন। অর্থাৎ ছয় চাকার ট্রাকের সর্বোচ্চ ওজন বহন ক্ষমতা সাড়ে ১৫ টন। এর অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন করলে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তারপরও গত পাঁচ বছরেও নীতিমালা অনুযায়ী অতিরিক্ত পণ্য বহনের দায়ে জরিমানা আদায় করা যায়নি। সর্বশেষ গত বছর জরিমানার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ধর্মঘটে তা স্থগিত করা হয়। এরপর মালিকদের চাপে নীতিমালাই সংশোধন করা হয়। কিছুটা বাড়ানো হয়েছে ওজনসীমা।

এতে পণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ হচ্ছে তা অমূলক নয়- এ কথা জানিয়ে গত মে মাসে পণ্যের দামবৃদ্ধি ঠেকাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পণ্য পরিবহনে ‘এক্সেল লোড’ নিয়ন্ত্রণ স্থগিত করতে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে চিঠিও দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

ওই চিঠিতে মেয়র বলেন, এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণে বন্দরনগর চট্টগ্রাম থেকে পরিবহন ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল, ভোগ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় কেজিপ্রতি তিন-চার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুই এক্সেলবিশিষ্ট মোটরযানে ১৩ টন ওজন পরিবহনের বাধ্যবাধকতা শিথিল করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রীকে অনুরোধও জানান মেয়র নাছির।