• মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১৪ মহররম ১৪৪০
BK

কারসাজিতে দাম বাড়ছে চালের

কারসাজিতে দাম বাড়ছে চালের
সংরক্ষিত ছবি

গত এক বছরে দেশে চালের আমদানি হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ। সঙ্গে এ বছর ইরি-বোরোর বাম্পার ফলনে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন শুধু গত বছরের তুলনায় নয়, ছাড়িয়েছে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রাও। হিসাবে দেশে বর্তমানে চালের মজুত উদ্বৃত্ত। তবু বাজারে চালের দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই। উল্টো আমদানি শুল্ক বাড়ানোর অজুহাতে বাড়ছে চালের দাম।

চলতি বছর ইরি-বোরো ধানের উৎপাদন কত হয়েছে সম্প্রতি তার একটি খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করেছে কৃষি অধিদফতর। খসড়া অনুযায়ী, দেশে এবার ১ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৭ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন বেশি। গত বছর বোরোর উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৩ হাজার মেট্রিক টন। আর এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৯০ লাখ মেট্রিক টন।

এখন শুধু উৎপাদিত বোরো ধানই নয়, চাহিদার উদ্বৃত্ত রয়েছে আমদানি করা চালও। একই সঙ্গে সরকারের গুদামে চালের মজুতও বিগত বিশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরের শেষ পর্যন্ত (২৭ জুন) দেশে সরকারিভাবে ১১ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন ও বেসরকারি খাতে ২৯ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন চাল আমদানি করা হয়। এ ছাড়াও ৪৬ লাখ ৭৬ হাজার মেট্রিক টন চাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। বর্তমানে সরকারি গুদামে ১০ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন চালের মজুত রয়েছে। বাকিটা ব্যবসায়ীদের গুদামে।
গত বছর বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চালের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল। তবে এরপর থেকে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক আমদানি এবং চলতি মৌসুমে বোরো উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় সে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে, এমন বিবেচনায় বাজেটে আবারো আমদানির ওপর ২৮ শতাংশ শুল্ক বহালের ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর থেকেই দেশের মোকামগুলোতে বাড়তে থাকে চালের দাম। যার প্রভাবে বর্তমানে বাজারে চাল কিনতে বাজেটের আগের তুলনায় কেজিপ্রতি চার টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক কেএএস মুরশিদ বাংলাদেশের খবরকে বলেন, উদ্বৃত্ত পরিস্থিতির পরও বাজারে চালের দাম বাড়ার কোনো সুযোগ নেই। তারপরও দাম বাড়ার পেছনে তিনি কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে শুল্ক বৃদ্ধির অজুহাতে ব্যবসায়ীদের চাল মজুত রেখে বাজারে না ছাড়া। আবার দাম পড়ে যাওয়ার শঙ্কায় মিলাররা নতুন ধান না কেনায় এখনো ইরির চাল সেভাবে বাজারে সরবরাহ নাও হতে পারে।

তিনি বলেন, সব মিলিয়ে বেশ দীর্ঘ সময় ধরেই চালের বাজারে নানামুখী সঙ্কট চলছে, যা হয়তো-বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনার ভুল। জরুরি ভিত্তিতে এসব বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে মিলমালিক ও চালের পাইকারি এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা বর্তমানে চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে একে অপরকে দায়ী করছে। মিলমালিকদের বক্তব্য- আমদানি শুল্ক আরোপের অজুহাতে ব্যবসায়ীরা বাজারে চালের দাম বাড়িয়েছে। তবে মিলগুলো থেকে কমদামে এখনও চাল সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব কমদামের চাল ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন আড়তে মজুত করেছে বলে দাবি অটো রাইস মিল মালিক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলমের।
আর পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছে, কমদামে ধান কিনে সে চাল উচ্চমূল্যে বাজারে বিক্রি করে বাজার উসকে দিয়েছে মিলমালিকরাই। তারাই দেশের চালের কারবারের নিয়ন্ত্রক।
সরকারি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলছে, দেশে গত এক মাসে মোটা চালের দাম ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ, মাঝারি চালের দাম ৩ শতাংশ ও চিকন চালের দাম ৩ দশমিক ২৩ শতাংশ বেড়েছে। বাজারে এক কেজি মোটা চাল কিনতে গুনতে হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ূন কবির এ বিষয়ে বলেন, উদ্বৃত্ত সত্ত্বেও চালের দাম বাড়ার কোনোই যৌক্তিক কারণ নেই। কিছু অসাধু মিলমালিক ও ব্যবসায়ী যোগসাজশ করে এমন সিন্ডিকেট করছে। এরা গত বছরও ঘাটতির তুলনায় অস্বাভাবিক দাম বাড়িয়ে মুনাফা করেছিল। সরকারের এ বিষয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও তদারকি প্রয়োজন।