• সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১৩ মহররম ১৪৪০
BK

ডুবেছে ছয় জেলার নিম্নাঞ্চল

নদীভাঙন বেড়েছে সিরাজগঞ্জ ও লালমনিরহাটে
ডুবেছে ছয় জেলার নিম্নাঞ্চল
ছবি : বাংলাদেশের খবর

টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে দেশের কোথাও কোথাও বন্যা দেখা দিয়েছে। দেশের বেশ কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। তীব্র হয়েছে সিরাজগঞ্জের নদীভাঙন। 

গতকাল বৃহস্পতিবার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় সিলেটসহ দেশের কয়েকটি অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। এ কারণে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া, উজানে মৌসুমি ভারী বর্ষণের কারণে চলতি মাসের মধ্যভাগে সিলেটসহ দেশের অধিকাংশ স্থানে বন্যা দেখা দেবে। বাংলাদেশের খবরের সিলেট ব্যুরো এবং গোয়াইনঘাট (সিলেট), ছাতক (সুনামগঞ্জ), সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট প্রতিনিধির পাঠানো খবর-

সিলেট : সিলেট জেলার নিম্নাঞ্চলে ফের বন্যা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশলীর অফিস সূত্র জানায়, বর্ষণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সিলেটের সুরমার পানি কানাইঘাট, সিলেট কুশিয়ারার পানি শেরপুর-সিলেটে; সারিগোয়াইনের পানি সারিঘাটে; টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কয়েক হাজার ঘরবাড়িসহ অনেক ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্কুল-কলেজ পানিতে ডুবে গেছে। কোম্পানীগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাসুদ রানা জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার বন্যার্ত অসহায় ও গরিব লোকদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হবে।

গোয়াইনঘাটে অব্যাহত রয়েছে পানি বৃদ্ধি। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। পিয়াইন, সারী, গোয়াইনসহ সবকটি নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিশ্বজিৎ কুমার পাল জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গোয়াইনঘাটের প্রায় সবকটি এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। বিপদগ্রস্ত মানুষজনকে উদ্ধারে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে। ত্রাণ বিতরণ চলছে। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম চৌধুরী জানান, আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় গোয়াইনঘাটের ৯টি ইউনিয়নের প্রায় সবকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

ছাতক (সুনামগঞ্জ) : ছাতক উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। ভারতের সীমান্তবর্তী উপজেলার ইসলামপুর ও নোয়ারাই ইউনিয়নসহ ছাতক সদর, কালারুকা, চরমহল্লা, দোলারবাজার, ভাতগাঁও, উত্তর খুরমা, দক্ষিণ খুরমা, সিংচাপইড়, গোবিন্দগঞ্জ-সৈদেরগাঁও, ছৈলা-আফজলাবাদ ইউনিয়নসহ পৌরসভার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে সুরমা, চেলা নদীর পানি ৬৫ সেন্টিমিটার ও পিয়াইনের পানি বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যান অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল জানান, পৌরসভাসহ উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের অনেক ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরুরিভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জের কাছে যমুনা নদীতে পানি বাড়ার ফলে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। চৌহালীর ব্রাহ্মণগ্রাম হতে শাহজাদপুরের হাট পাঁচিল পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীভাঙন আরো তীব্র হয়েছে। গত এক সপ্তাহে তিন শতাধিক বাড়িঘর যুমনা গর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনকবলিত কয়েকশ মানুষ বাড়িঘর ভেঙে নিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। এদিকে গত এক সপ্তাহ যাবৎ পানি বাড়ার ফলে নদী তীরবর্তী নিচু এলাকা ও বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিরাজগঞ্জ পরিচালন ও সংরক্ষণ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী রণজিত কুমার গতকাল বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ২২ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার সামান্য নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এনায়েতপুর থানার ব্রাহ্মণগ্রাম হতে শাহজাদপুর উপজেলা ভেড়া পর্যন্ত ভয়াবহ নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

নীলফামারী :  নদী তীরবর্তী নীলফামারী জেলার দুই উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ১৫টি চরগ্রাম প্লাবিত হয়ে পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারীর ডালিয়া ডিভিশনের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বরাত দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড হাইড্রোলজি বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম জানান, তিস্তায় বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজেরে সবকটি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।

এদিকে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীর তীরবর্তী জেলার ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ী, খগাখড়িবাড়ী, খালিশা চাঁপানী, পূর্বছাতনাই, ঝুনাগাছ চাঁপানী, গয়াবাড়ী, জলঢাকা উপজেলার, গোলমুণ্ডা, ডাউয়াবাড়ী, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের অন্তত পাঁচ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারীর ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল আলম চৌধুরী বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বেলা ৩টায় বিপদসীমা অতিক্রম করে।

কুড়িগ্রাম : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ও অতি বৃষ্টিপাতের ফলে কুড়িগ্রামের ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রসহ সব নদনদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বন্যার আশঙ্কা দখা দিয়েছে। গত তিন দিন যাবৎ নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদে চিলমারী পয়েন্টে ৩১ সেন্টিমিটার, নুনখাওয়া পয়েন্টে ৩৮ সেন্টিমিটার, ধরলা নদীতে সেতু পয়েন্টে ৩৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

লালমনিরহাট : লালমনিরহাটে তিস্তা গোবর্ধন চরঘেঁষা স্পার বাঁধের ভাটিতে গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে ১০টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বাস্তুহারা মানুষগুলো বাঁধের উঁচু স্থানে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে।

এদিকে পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, সিঙ্গিমারী, সিন্দুনা, পাটিকাপাড়া ও ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়ন এবং আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়ন ও সদর উপজেলার রাজপুর, খনিয়াগাছ ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী এলাকাসহ ২৫ গ্রামের ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, বৃহস্পতিবার তিস্তার পানি বেড়ে সন্ধ্যা ৬টা থেকে বিপদসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোর মেরামত কাজ চলমান রয়েছে।