• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৬ সফর ১৪৩৯
BK

রেলের এত টাকা গেল কোথায়

রেলের এত টাকা গেল কোথায়
সংরক্ষিত ছবি

২০১১-১২ সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের সচল লাইনের দৈর্ঘ্য ছিল ২ হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার। পরবর্তী ছয় বছরে ৪৯ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে শুধু উন্নয়ন প্রকল্পে ৩৩ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা ব্যয় করেও রেলপথের দৈর্ঘ্য এক কিলোমিটারও বাড়াতে পারেনি রেলপথ মন্ত্রণালয়। এ সময়ে ইঞ্জিনের সংখ্যা ৭টি বাড়লেও যাত্রীবাহী কোচ ৯১টি ও পণ্যবাহী ওয়াগন ১ হাজার ৭৭টি কমেছে। ফলে বরাদ্দ এত টাকা কোথায় গেছে এ প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ মুহূর্তে রেলপথের উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। দেশের সড়কপথের দৈর্ঘ্য অনেক বেড়েছে। বিদ্যমান সড়কের মান রক্ষা করে এখন ব্যয় ও স্বস্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রেলপথের উন্নতি করতে হবে। তিনি বলেন, ট্রেনে পণ্য পরিবহনের খরচ অনেক কম। রেলের প্রত্যাশিত উন্নতি নিশ্চিত করতে পারলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদন সর্বোপরি বিদেশি বাণিজ্য বাড়বে।

এ বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জল হোসেন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, মানুষের আস্থা থাকায় রেলের চাহিদা বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিতে রেলওয়েকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। আধুনিক রোলিং ইঞ্জিন ও বগি যোগ করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে অনেক ইঞ্জিন ও বগি মেয়াদোত্তীর্ণ। নতুন ইঞ্জিন কিনে যাত্রী সেবা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পুরনো যন্ত্রপাতি অবসরে পাঠানো হচ্ছে।

তিনি জানান, এডিবির সহায়তায় ৪০ রেল ইঞ্জিন কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলমান রয়েছে আরো অন্তত ৭০টি ইঞ্জিন কেনার প্রক্রিয়া। তবে দরপত্র ডাকা, মূল্যায়ন ও চুক্তি শেষ করে কারখানায় ইঞ্জিন নির্মাণের কাজ শেষ করতে আড়াই থেকে ৩ বছর সময় লাগে। এ দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষ হলে রেল পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সর্বশেষ প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষা (২০১৮) পর্যালোচনায় দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে দেশে ট্রেনের ইঞ্জিন ছিল ৫১৬টি। এর মধ্যে বাষ্পচালিত ৩৩৮ ও ডিজেলচালিত ১৭৮টি। ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে কয়লাচালিত ইঞ্জিনের সংখ্যা শূন্যে নেমে আসে আর ডিজেল ইঞ্জিনের সংখ্যা ২৮৮টিতে উন্নীত হয়। সর্বশেষ হিসাবে ইঞ্জিনের সংখ্যা ২৭৩। এ হিসাবে ৭৫ বছরে রেলওয়ের ইঞ্জিন কমেছে ২৭৩টি।

স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬১ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছর দেশে রেললাইন ছিল এক হাজার ৭৮৬ কিলোমিটার। ৪৫ বছরে রেলপথের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৮৭৭ কিলোমিটারে উন্নীত হয়েছে। তবে গত ছয় বছরে রেললাইন এক মিটারও বাড়েনি।

৪৫ বছরে ওয়াগনের সংখ্যা ৫৫ শতাংশ কমে গেছে। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে এর সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৮১টি। চলতি অর্থবছরে সংখ্যা নেমে এসেছে ৮ হাজার ৮৯৭টিতে। অর্থাৎ ওয়াগন কমেছে ৭ হাজার ১৮৪টি।

৪৫ বছরে যাত্রীবাহী কোচের সংখ্যা বেড়েছে ১৩৪টি। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে যাত্রীবাহী বগি ছিল ১ হাজার ২৪৭টি। বর্তমানে তা ১ হাজার ৩৮১। ৪৫ বছরে যাত্রীবাহী কোচ ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ বাড়লেও শেষ ছয় বছরে কমেছে ৯১টি।

৪৫ বছরে অন্যান্য কোচের সংখ্যা তলানীতে নেমে এসেছে। বর্তমানে যাত্রী ও পণ্যবাহী ওয়াগনের বাইরে রেলের অন্যান্য কোচ আছে ২৯টি। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে এর সংখ্যা ছিল ৪৫৩টি।

তবে ৪৫ বছরে রেলযাত্রী বেড়েছে ২২ দশমিক ২২ শতাংশ।  এ সময়ে যাত্রী সংখ্যা ৬ কোটি ৩৬ লাখ ৫৫ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৭৮ লাখ ১ হাজারে। এ হিসাবে যাত্রী বেড়েছে ১ কোটি ৪১ লাখ ৪৬ হাজার। পণ্য পরিবহনের হার বেড়েছে আরো বেশি। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছর ট্রেনে ২৮ লাখ ৩০ টন পণ্য পরিবহন হলেও বর্তমানে এর পরিমাণ প্রায় ৩৭ লাখ ৮০ হাজার টন। পণ্য পরিবহন সাড়ে ৩৩ শতাংশ বাড়লেও ওয়াগন কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।

রেলে যাত্রী বাড়লেও সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে লাভ লোকসানের হিসাবে। গত অর্থবছর বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের নিট লোকসান ছিল ১ হাজার ৮৫২ কোটি ৯৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, টঙ্গী থেকে ভৈরববাজার পর্যন্ত ডবল লাইনের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০৬ সালে। পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে সে কাজ শেষ হচ্ছে না। দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণের কাজই এখনো শেষ হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সালে। লাকসাম থেকে চিনকী আস্তানা ডবল লাইনের নির্মাণকাজ ১০ বছরেও শেষ হয়নি। এখন নতুন করে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০০৭ সালে পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপ উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজে অগ্রগতি নেই।

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হিসাবে সদ্য সমাপ্ত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) রেলপথ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ১ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে (আরএডিপি) এ বরাদ্দ নামিয়ে আনা হয় ১০ হাজার ৮১৭ কোটি টাকায়। ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ বরাদ্দ নিয়ে শীর্ষ অগ্রাধিকারের চতুর্থ অবস্থানে ছিল রেল মন্ত্রণালয়। বিপুল বরাদ্দের বিপরীতে অর্থবছরের ১১ মাসে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৩৩২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। শতকরা হিসাবে রেলের আরএডিপি বাস্তবায়ন মাত্র ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ।

সূত্র জানায়, রেলওয়ের কালুখালী ভাটিয়ারা সেকশন পুনর্বাসন এবং কাশিয়ানী থেকে টুঙ্গিপাড়া হয়ে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত নতুন রেল লাইন নির্মাণে প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১০ সালে। ২০১৩ সালের জুনে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। গত বছরের শেষ মাসে পুনর্নির্ধারিত মেয়াদেও শেষ হয়নি কাজ। এ অবস্থায় আরেক দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ফলে ১ হাজার ১০১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্প উন্নীত হয়েছে ২ হাজার ১১০ কোটি ২৭ লাখ টাকায়।

ইঞ্জিন ও বগি কেনায় নেওয়া বেশ কিছু প্রকল্পেও স্থবিরতা চলছে। ১ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকায় ৭০টি মিটারগেজ ডিজেল ইঞ্জিন সংগ্রহে নেওয়া প্রকল্পের কাজ ২০১১ সালে শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ভারতীয় ঋণে ৯৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২০ যাত্রীবাহী ব্রডগেজ বগি কিনতে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল ২০১৪ সালে। ২০১৭ সালে প্রকল্পের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। একই সময়ে পশ্চিমাঞ্চলের জন্য ৫০টি মিটারগেজ ও সমসংখ্যক ব্রডগেজ বগি কেনার প্রকল্পও শেষ হয়নি। ২০১৫ সালে ৫৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয় ধরে ১০০ মিটারগেজ বগি কেনার প্রকল্পে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯ লাখ টাকা। ৯২৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ২০১৬ সালে ২০০ মিটারগেজ বগি কেনায় নেওয়া প্রকল্পে এ পর্যন্ত একটি পয়সাও খরচ হয়নি।

প্রকল্প বাস্তবায়নে অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ : যথাযথ সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ, অপরিকল্পিত ব্যয় নির্ধারণ, পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ না দেওয়া, প্রকল্প পরিচালকের ঘন ঘন বদলি, দরপত্রে বাড়তি সময় ক্ষেপণের কারণে রেলের উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্পে বাড়তি সময় ও অর্থ লাগছে বলে দাবি করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। বিভাগের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রকাশ করা ২০১৫-১৬ অর্থবছরের সমাপ্ত প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছর শেষ হওয়া চারটি প্রকল্পের কোনোটিই নির্ধারিত সময় ও মেয়াদে হয়নি। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ৮০ শতাংশ থেকে আড়াইগুণ পর্যন্ত বাড়তি সময়ে লেগেছ। বাড়তি অর্থ ব্যয় হয়েছে ১৩ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে ৪৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত।

৩০ ইঞ্জিন সংগ্রহ প্রকল্পের আওতায় কেনা হয়েছে ১৬টি : রেলওয়ের জন্য ৩০টি ব্রডগেজ ইঞ্জিন সংগ্রহের লক্ষ্যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল ২০১০ সালের ডিসেম্বরে। ৬০৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল। ৫২৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয় করে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ২০১৬ সালের ৩০ জুন। আড়াই বছরের কাজে অতিরিক্ত ৩ বছর লাগলেও ইঞ্জিন কেনা হয়েছে মাত্র ১৬টি। এর আগেই প্রকল্পটি দুই বার সংশোধন করা হয়েছে। ৫০ কোটি বা এর বেশি টাকা ব্যয়ের যেকোনো প্রকল্পে পূর্ণকালীন পিডি নিয়োগের নিয়ম থাকলেও সাড়ে পাঁচ বছর ধরে রেলের দুই কর্মকর্তা নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে এ প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পালন করেছেন।

সীমিত জোগানে মিটছে না চাহিদা : বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে রেলের জন্য ইঞ্জিন এবং যাত্রী ও পণ্যবাহী ওয়াগন কেনা হলেও প্রকৃত চাহিদা মিটছে না। যে পরিমাণ ওয়াগন ও ইঞ্জিন কেনা হচ্ছে, অবসরে পাঠানো হচ্ছে তার চাইতে বেশি। সর্বশেষ হিসাবে ৯৪টি ব্রডগেজ ইঞ্জিনের মধ্যে আয়ুষ্কাল আছে মাত্র ৪০টির। অবশিষ্ট ৫৪টি ইঞ্জিন চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এ অবস্থায় রেলের জন্য আরো অন্তত ১১০টি ব্রডগেজ ইঞ্জিন প্রয়োজন। বিপুল চাহিদার বিপরীতে ৪০টি ব্রডগেজ ইঞ্জিন কেনার উদ্যোগের অংশ হিসেবে সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এর আওতায় ব্রডগেজ ও মিটারগেজ মিলে ১ হাজার ১২৫টি বিভিন্ন ধরনের ওয়াগনও কেনা হবে। ৩ হাজার ৬০২ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে ২ হাজার ৮৩৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে এর কাজ শেষ করার কথা।