• শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১০ মহররম ১৪৪০
BK

পাট উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা

পাট উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা
সংগৃহীত ছবি

বিগত মৌসুমে দেশে ৭ লাখ ৫৮ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল। এ বছর পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ লাখ ৫ হাজার ৩৪ হেক্টর জমিতে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে বপন মৌসুম শেষে এ বছর পাট চাষ হয়েছে ৬ লাখ ৫০ হাজার ৯৪৯ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ লাখ ৫৫ হেক্টর কম জমিতে চাষ হয়েছে। ফলে এ বছর পাটের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি অধিদফতর (ডিএই) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সংস্থাটির ‘মাঠ ফসলের আবাদি জমির পরিমাণ ও উৎপাদন’ প্রতিবেদন অনুসারে, এ বছর পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৮৮ লাখ ৪০ হাজার বেল। আর গত বছর (২০১৬-১৭ অর্থবছরে) উৎপাদন হয়েছিল ৮৮ লাখ ৯৪ হাজার বেল। কিন্তু আবাদি জমির পরিমাণ কমায় এ বছর লক্ষ্যমাত্রা দূরের কথা গত বছর থেকেও উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

ডিএই’র সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ ড. আলহাজ উদ্দিন আহাম্মেদ বাংলাদেশের খবরকে বলেন, পাট বপন শুরু হওয়ার সময় দেশের অধিকাংশ এলাকায় অতিবৃষ্টি ও কিছু এলাকায় বন্যার কারণে এ পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে। সে সময় অনেক চাষি পাট বুনতে পারেননি। অনেক এলাকায় বপনের পর তা নষ্ট হওয়ায় ওই জমিতে রোপা আমন চাষ করা হয়েছে।

এদিকে দেশে এবার পাটের উৎপাদন কম হলে তা বিগত কয়েক বছরের ক্রমবর্ধমান উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির ধারাকে ব্যাহত করবে। কারণ গত কয়েক বছর দ্রুত বেড়েছিল পাটের উৎপাদন। দেশে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পাটের উৎপাদন ছিল ৭৪ লাখ ৩৬ হাজার বেল। এর পর থেকে ক্রমাগত বেড়ে গত বছর তা ৮৮ লাখ ৪০ হাজার বেলে পৌঁছায়। 

দেশে পাটের আবাদ কমা নিয়ে কথা হয় বিভিন্ন এলাকার পাটচাষি ও সম্পৃক্তদের সঙ্গে। তারা জানিয়েছেন, ভারতে পাটে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের কারণে দাম না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে অনেক এলাকার চাষিদের। এ ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় পাট পচানোর পানির অভাবে এর আবাদে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন অনেকে। আবার অনেকে সার, বীজ, সেচ, কীটনাশকসহ শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির ফলে এ বছর পাটের আবাদ করেননি।

দেশে পাট উৎপাদনের একসময়ের অন্যতম এলাকার একটি নওগাঁ জেলা। নানা প্রতিকূলতায় এ জেলায় পাট চাষ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের নওগাঁ জেলার উপপরিচালক মনোজিত কুমার মল্লিক জানান, গত মৌসুমে এ জেলায় ৮ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছিল। কিন্তু চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৭ হাজার হেক্টর করা হলেও তা অর্জিত হয়নি।

নওগাঁর একটি উপজেলা বদলগাছির কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, একসময় এ এলাকায় পাটই ছিল প্রধান ফসল। কিন্তু এখন আর সেরকম পাটের আবাদ চোখে পড়ে না। বর্তমানে উৎপাদন খরচ বেশি কিন্তু বাজারমূল্য কম হওয়ায় পাট চাষে লাভ হয় না। পক্ষান্তরে সবজি চাষ অনেক লাভজনক। আরেক চাষি জানান, পাট চাষ করলে এখন পচানোর জায়গা ও পানি পাওয়া যায় না। এ কারণে আঁশ ভালো হয় না, ফলে দামও পাওয়া যায় না। এজন্য তিনি এ বছর পাট চাষ করেননি।

তবে কিছুটা ভিন্ন প্রেক্ষাপট দেশের সর্বোচ্চ পাট উৎপাদনকারী জেলা ফরিদপুরের। এ বছর ফরিদপুরে পাটের আবাদ হয়েছে ৮৩ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমিতে। ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কার্তিক চন্দ্র চক্রবর্তী জানান, এ জেলায় এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার হেক্টর বেশি। তবে পাট চাষ বেশি হলেও এবার উৎপাদন কম হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে পাট বপনের পর প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাটের গাছ বাড়েনি। কারণ বেশি বৃষ্টিপাতে পাট গাছ কম বাড়ে। গত বছর এই সময়ে পাট গাছ যে পরিমাণ লম্বা হয়েছিল এ বছর সেই তুলনায় এক-দেড় ফুট কম হয়েছে। এজন্য গত বছরের তুলনায় উৎপাদন ঘাটতির সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে আবাদ কমায় সার্বিক উৎপাদনে তেমন প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মনজুরুল আলম। তিনি বলেন, এখন সার্বিক উৎপাদন নির্ভর করছে ফলনের ওপর। দেশে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে বিগত কয়েক বছর ধরে পাটের ফলন খুব ভালো হচ্ছে। এ বছরও পাটের বাম্পার ফলন হলে উৎপাদনের ঘাটতি অনেকটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

(প্রতিবেদন প্রস্তুতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ফরিদপুর ও নওগাঁ প্রতিনিধি।)