• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫, ২৪ সফর ১৪৩৯
BK

রফতানি আয়ে ঔজ্জ্বল্য ছড়াচ্ছে ওষুধশিল্প

রফতানি আয়ে ঔজ্জ্বল্য ছড়াচ্ছে ওষুধশিল্প
সংরক্ষিত ছবি

রফতানি আয়ে ঔজ্জ্বল্য ছড়াচ্ছে ওষুধশিল্প। প্রথমবারের মতো এ খাত থেকে ১০ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছে বাংলাদেশ। সরকারের কাছ থেকে আর্থিক ও নীতিগত সহযোগিতা পাওয়া গেলে কয়েক বছরের মধ্যেই এ খাত থেকে রফতানি আয় কয়েক গুণ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে (২০১৭-১৮) ওষুধ রফতানি থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ১০ কোটি ৩৪ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় সোয়া ৮০০ কোটি টাকার বেশি। আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১০ কোটি ডলার। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৩৪ লাখ ৬০ হাজার ডলার বেশি বা ৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি আয় হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৮ কোটি ৯১ লাখ ৭০ হাজার ডলার। এ হিসাবে বিদায়ী অর্থবছরে ওষুধ খাতে রফতানি আয় বেড়েছে ১৬ শতাংশেরও বেশি। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট রফতানি আয় করেছে ৩ হাজার ৬৬৬ কোটি ৬৮ লাখ ১৭ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.৮১ শতাংশ। সার্বিক রফতানি আয়ের তুলনায় ওষুধ খাতে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ গুণ বেশি হয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতির মহাসচিব ও এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক এসএম শফিউজ্জামান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ওষুধশিল্পে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কয়েক বছরের মধ্যেই রফতানি আয় দুই থেকে তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব। তিনি আরো বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে মেধাস্বত্ব আইনের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত থাকায় বর্তমানে যেকোনো ওষুধ উৎপাদন করতে পারছে বাংলাদেশ। এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে ওষুধশিল্পে বাংলাদেশ শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো সঙ্কট মোকাবেলা করেই বাংলাদেশের ওষুধ খাত এগিয়ে যাবে- এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, ওষুধশিল্পে বাংলাদেশের রফতানি আয়ে ধারাবাহিকভাবেই প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ওষুধ রফতানিতে আয় হয়েছিল ৫ কোটি ৯৮ লাখ ২০ হাজার ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ কোটি ৯২ লাখ ৪০ হাজার ডলারে। পরবর্তী অর্থবছরে ৮ কোটি ২১ লাখ ১০ হাজার ডলার আয় হয় এ খাত থেকে। ৮ কোটি ৯১ লাখ ৭০ হাজার ডলার আয় হয় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। ৫ বছরে ওষুধ খাতে রফতানি বেড়েছে প্রায় ৭৩ শতাংশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশের তৈরি ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, ইনজেকশন, ইনহেলারসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ রফতানি হচ্ছে। তবে ক্যানসার, মস্তিষ্কের সমস্যা, হূদরোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধির ওষুধ আমদানি করতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের কয়েকটি কোম্পানি ক্যানসারের ওষুধ তৈরিতে এগিয়ে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, তুলনামূলক কম দামে ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে ওষুধ উৎপাদন করায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ওষুধের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। বেক্সিমকো ফার্মা ও স্কয়ার ফার্মা যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) অনুমোদন পেয়েছে। ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস এফডিএ’র অনুমোদনের প্রতীক্ষায় রয়েছে। এফডিএ’র স্বীকৃতি বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের জন্য একটি বড় অর্জন এবং এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায় বাংলাদেশের ওষুধ। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশেই বাংলাদেশের উৎপাদিত ওষুধ রফতানি হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৫১টি দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি হচ্ছে। প্রায় ৩০টি ওষুধ কোম্পানি তাদের উৎপাদিত পণ্য রফতানি করে থাকে। যদিও ২০০টির মতো ওষুধ কোম্পানি বর্তমানে ওষুধ উৎপাদন করছে। দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশই পূরণ করছে এসব কোম্পানি। বর্তমানে দেশের ওষুধশিল্পের বাজার প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। প্রায় ৯০ শতাংশ বাজারই রয়েছে দেশি কোম্পানিগুলোর দখলে।

সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, ওষুধ রফতানির ধরন অন্য যেকোনো পণ্যের মতো নয়। রফতানির জন্য প্রতিটি উৎপাদিত পণ্য ও কোম্পানির নামের নিবন্ধন করতে হয় সংশ্লিষ্ট দেশে। পণ্যের নিবন্ধন ও প্রমোশন খাতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু অনেক কোম্পানির এ ধরনের বিনিয়োগের সামর্থ্য নেই। ফলে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা পণ্য রফতানি করতে পারছে না।

অন্যদিকে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনে তেমন কোনো শিল্প গড়ে ওঠেনি। ফলে ওষুধ উৎপাদন এখনো পুরোপুরি বিদেশি কাঁচামালনির্ভর। কাঁচামাল আমদানির কারণে তুলনামূলক বেশি ব্যয়ে ওষুধ উৎপাদন করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। ফলে ভারতের মতো যেসব দেশে ওষুধের কাঁচামাল উৎপন্ন হয়, তাদের তুলনায় রফতানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। অবশ্য ওষুধশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঁচামাল উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জনের জন্য মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ২০০ একর জমির ওপর অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রেডিয়েন্স (এপিআই) পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজ সমাপ্ত হয়েছে। চলতি বছরেই এটিতে উৎপাদন শুরু হবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা। কাঁচামাল দেশে উৎপাদিত হলে ওষুধের মূল্য যেমন কমে আসবে, পাশাপাশি ওষুধ ও কাঁচামাল রফতানিও বাড়বে।

স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে (এলডিসি) ২০৩৩ সাল পর্যন্ত মেধাস্বত্বে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ছাড় দিয়েছে। ফলে মেধাস্বত্ব ক্রয়ে কোনো ধরনের অর্থ দিতে হচ্ছে না ওই দেশগুলোকে। এ সুযোগ বেশি কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প। তবে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে রয়েছে। ২০২৪ সালেই বাংলাদেশের এ উত্তরণ ঘটবে- এমনটাই ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ হলেও ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধা পাবে বলেই অনেকে মনে করছেন। ফলে ২০২৭ সালের পর মেধাস্বত্ব ছাড়ের সুবিধা উঠে গেলে সঙ্কটে পড়তে হতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে।

অবশ্য ওষুধ খাতকে এগিয়ে নিতে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু নীতি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মতো চলতি অর্থবছরেও ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক রেয়াত দেওয়া হয়েছে। ওষুধ খাতকে গুরুত্ব দিয়ে ওষুধ ও ওষুধ পণ্য উৎপাদনে ব্যবহূত কাঁচামালকে ২০১৮ সালের প্রডাক্ট অব দি ইয়ার হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।