• শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১০ মহররম ১৪৪০
BK

নগরজীবনে বর্ষা...

নগরজীবনে বর্ষা...
সংরক্ষিত ছবি

সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন

ঋতুরানি বর্ষায় ধূসর রং পাল্টে প্রকৃতি সাজে সজীবতায়। জ্যৈষ্ঠের খরতাপে চারপাশ যখন রুক্ষ হয়ে ওঠে, তখনই পরম স্নিগ্ধতায় প্রকৃতিতে হাজির হয় বর্ষা। কদম ফুলের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ মুগ্ধ করে মানুষকে। অনেকেই তখন বৃষ্টিবিলাসে মেতে ওঠেন। কিন্তু নগরজীবনে বর্ষা মানেই যেন জলাবদ্ধতায় ডুবে যাওয়া কিংবা ভিন্ন মাত্রার এক যন্ত্রণার সঙ্গে বসবাস! টানা বর্ষণে নগরীর বিভিন্ন সড়কে পানি জমে সৃষ্ট যানজট নগরবাসীর দুর্দশা কল্পনাতীতভাবে বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা ও যানবাহন সঙ্কটের কারণে সকাল থেকেই রাজধানীবাসীকে চলাফেরায় পোহাতে হয় অশেষ দুর্ভোগ, জনজীবন হয়ে পড়ে প্রায় স্থবির। সবচেয়ে বিপাকে পড়তে হয় অফিসগামী পথচারী ও শিক্ষার্থীদের। অনেককে কাকভেজা হয়ে অফিস কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাজির হতে হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি যেন থমকে দাঁড়ায়। বলতে হয়, জনজীবনকে স্থবির করার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভারসাম্যও বিনষ্ট করে। বিশেষ করে বৃষ্টির পানি, মেডিকেল বর্জ্য ও গৃহস্থালির বর্জ্য পয়োপ্রণালির সঙ্গে মিশে গিয়ে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটায়। ফলে জনস্বাস্থ্য বিপন্ন হয়ে ওঠে। এ চিত্র শুধু রাজধানী ঢাকায় নয়, দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতেও বিদ্যমান।

দুঃখজনক হলেও সত্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর মানুষের অদূরদর্শী কর্মকাণ্ডে নগরের প্রকৃতি আজ আর চেনার উপায় নেই। একসময় রাজধানীর বৃষ্টির পানি বিভিন্ন খাল-নালা দিয়ে আশপাশের নদীতে চলে যেত। প্রায় ৫০টিরও বেশি খাল ধরে রাখত বৃষ্টির পানি। কিন্তু খাল-নালাগুলো দখল-ভরাট হয়ে বর্তমানে পানি নিষ্কাশন প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। প্রসঙ্গত, যেকোনো শহরের মোট ভূমির কমপক্ষে ১২ ভাগ জলাধার থাকা দরকার হলেও ঢাকায় আছে মাত্র ২ ভাগ। ফলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জায়গা নেই। এ ছাড়াও শহরের শতকরা প্রায় ৮০-৯০ ভাগ জায়গা কংক্রিটে ঢাকা থাকায় বৃষ্টির পানি মাটির নিচে যেতে পারে না। আর এসব কারণেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং খানাখন্দে ভরা রাস্তাগুলো দুর্ঘটনার অদৃশ্য এক ফাঁদে পরিণত হয়। বিশেষ করে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হওয়া স্থানগুলোতে পানির নিচে অদৃশ্য হয়ে যায় গর্তগুলো। এতে যত্রতত্র পথচারী ও নানা ধরনের যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হয়। অবশ্য জলাবদ্ধতা দূর করতে রাজধানীর কিছু এলাকায় খালের উপরে বিপুল অর্থ ব্যয় করে বক্স কালভার্ট তৈরি করা হয়েছিল। এগুলোও এখন ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। এমন বাস্তবতায় জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকার আশপাশের খাল, নদ-নদীসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো রক্ষণাবেক্ষণে উদ্যোগী হতে হবে এবং উদ্ধার করা খাল-নালাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। একই সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

নগরে জলাবদ্ধতা একটি ভয়াবহ দুর্যোগ হওয়ায় এজন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। কার্যকর উদ্যোগ ও যথাযথ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে ঢাকা শহর হতে পারে পৃথিবীর অন্যতম সৌন্দর্যমণ্ডিত শহর। আমরা চাই বর্ষা যেন নগরজীবনেও কাব্যের আমেজ আনে। কদম ফুলের হাসি-ঘ্রাণে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও যেন জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণা ভুলে থাকতে পারি।