• বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৫ সফর ১৪৩৯
BK

জাদুঘরের শহর ঢাকা

জাদুঘরের শহর ঢাকা
সংরক্ষিত ছবি

জাদুঘর ঐতিহ্য সংরক্ষণের স্থান, এক পলকে যেখানে একই বা বিভিন্ন বিষয়ের অনেক নিদর্শন দেখা সম্ভব। আভিধানিক অর্থে আমরা জাদুঘর বা মিউজিয়াম বলতে বুঝি আজব ঘর বা অদ্ভুত জিনিসপত্রের সংগ্রহশালা। যদ্দূর জানা যায়, আলেকজান্দ্রিয়াতেই গড়ে তোলা হয় প্রথম জাদুঘর। আধুনিক জাদুঘর ব্রিটিশ মিউজিয়াম স্থাপিত হয় ১৭৫৩ সালে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামই পৃথিবীতে জাদুঘর সম্পর্কিত একটি ব্যাপক ধারণা প্রতিষ্ঠিত করে। যার মানে হচ্ছে এটি এমন একটি স্থান, যেখানে কী না থাকতে পারে! পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বিষয়ভিত্তিক জাদুঘর গড়ে উঠেছে বিভিন্ন দেশে। জাদুঘর এখন প্রতিটি দেশেরই একটি পরিচয়ের বাহক। জাদুঘরের একটা প্রধান কাজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ এবং জাতিকে আত্মপরিচয়দানের সূত্র জানানো। সে লক্ষ্যে এই বাংলাদেশে প্রথম জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৩ সালে। সেটি বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর। ১৯৮৩ সালে এটিকে জাতীয় জাদুঘরের মর্যাদা দেওয়া হয়। বাংলাদেশে শতাধিক জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়, ঐতিহ্য, ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে জাদুঘরগুলো পরিচালিত হচ্ছে। এই রাজধানী ঢাকা শহরেই আছে ৩০টির মতো জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা, ঐতিহ্য, বিজ্ঞান, লোকসংস্কৃতি, বিশেষ ব্যক্তি, সামরিক বাহিনীর ইতিহাস, পুরাকীর্তি, টাকা, ডাক, সবকিছু মিলিয়ে এ জাদুঘরগুলো সম্মিলিতভাবে আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাসকে ধারণ করে আছে। নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতিকে বোঝার জন্যই আমাদের জাদুঘরে যেতে হবে। ঢাকার উল্লেখযোগ্য বিশেষ পরিচিত কয়েকটি জাদুঘর নিয়ে আমাদের আয়োজন। গ্রন্থনা ও সম্পাদনা করেছেন কামরুল আহসান

 

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

শাহবাগ গেলে যে বড় দালানটি দেখা যায়, ছাদের কাছে পাখির ঘরের মতো খোপ খোপ, বড় বড় চোখের মতো চেয়ে আছে- সেটিই হচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর। এর পাশেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় গ্রন্থাগার। এ জাদুঘরটির বয়স একশ’ বছরেরও কিছুটা বেশি। ১৯১৩ সালে স্থাপিত হয় এটি। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর স্থাপনার নকশা করেছেন দেশের প্রখ্যাত স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন। এখানে প্রায় এক লাখ রকমের সংগৃহীত নিদর্শন আছে। কী নেই এখানে! বলতে গেলে সারা দেশটাই এখানে খুঁজে পাবেন। বাঙালির যত গৌরব, ইতিহাস, ঐতিহ্য সবই এখানে ফুটে আছে স্বমহিমায়। মূল জাদুঘরটি শুরু হয়েছে দোতলা থেকে। নিচ তলায় গ্যালারি, হলরুম, লাইব্রেরি, অফিস। দ্বিতীয় তলায় ঢুকতেই মুখোমুখি হতে হবে বিশাল এক মানচিত্রের। ভূপৃষ্ঠের মতো সমতলে ছড়িয়ে আছে সারা বাংলাদেশ। আপনার বাড়ি কোন জেলায় চাইলে সুইচ টিপে দেখতে পারবেন। তারপর একে একে চোখের সামনে উন্মোচিত হতে থাকে বাংলাদেশের একেকটি রূপ-বৈচিত্র্য। সুন্দরবন, সুন্দরবনের হাতি-বাঘ-বানর, হরেক রকমের পাখি। তারপর জমিদারদের ব্যবহূত বড় বড় খাট-পালঙ্ক। দেখলেই মনে হবে, আহা একবার যদি এ খাটে শুয়ে একটু ঘুমাতে পারতাম। এমন একেকটি ঘরে ছড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের একেকটি ইতিহাস-ঐতিহ্য। আরেক দিকে গিয়ে দেখতে পাবেন গ্রামীণ সব দৃশ্য, জেলে মাছ ধরছে জাল দিয়ে, কৃষক ধান কাটছে, গৃহিণীরা ঢেঁকিতে ধান ভানছে, যেন সব জীবন্ত দৃশ্য চোখের সামনে ঝলমলিয়ে উঠছে। শুধু স্মরণকালের ইতিহাস নয়, জাতীয় জাদুঘরে আছে প্রাচীন বাংলার অনেক নিদর্শনও। প্রাচীন মুদ্রা, প্রাচীন শিলালিপি, প্রাচীন ভাস্কর্য, মূর্তি। একদিকে আছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর বড় বড় কিছু ছবি, ব্যবহূত কিছু জিনিসপত্র। আরো আছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের হাতের লেখা চিঠিপত্র। একপাশে আছে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আসাদের রক্তমাখা শার্ট। মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারিতে গেলে আপনার মনটাই খারাপ হয়ে যাবে। সেখানে ধারাবাহিকভাবে দেখানো হয় মুক্তিযুদ্ধের তথ্যচিত্র। পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতা দেখলে আপনার চোখ ভিজে যাবে।

জাতীয় জাদুঘরে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। অনেক বিদেশি দর্শনার্থীও আসেন। দর্শনীর পরিমাণ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২০ টাকা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১০ টাকা। বিদেশিদের জন্য ১০০ টাকা। তবে সার্কভুক্ত দেশের দর্শনার্থীদের জন্য ২০ টাকাই। ঢাকায় বেড়াতে এলে জাতীয় জাদুঘর দেখতে যাওয়া একটা প্রচলিত রেওয়াজ ছিল একসময়। জীবনে একবারও যদি কেউ জাতীয় জাদুঘর প্রদর্শন না করে, তাহলে তার শিক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলা যায় না। জাতীয় জাদুঘর শুধু সৌন্দর্য দর্শন বা অবসর কাটানোজনিত ঘোরাঘুরির জন্য নয়, এটি একটি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যকে এক মুহূর্তে চোখের সামনে নিয়ে আসে। তাই প্রত্যেক নাগরিকেরই উচিত জীবনে একবার হলেও জাতীয় জাদুঘরটি ঘুরে দেখা।

বঙ্গবন্ধু-শেখ-মুজিব-স্মৃতি-জাদুঘর

বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ১০ নম্বর বাড়িটি ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শেষ জীবনের আবাসস্থল। বাড়িটিতে তিনি পরিবার নিয়ে বাস করতেন ১৯৬১ সাল থেকে। এখানে বসেই তিনি রাজনীতির দিকনির্দেশনা ঠিক করতেন। স্বাধীনতার পর ধরতে গেলে এ বাড়িতে বসেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন এবং শেষ পর্যন্ত এখানেই তিনি সপরিবারে শহীদ হন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।

জাতির জনকের স্মৃতিবিজড়িত এ বাড়িটি জাদুঘর হিসেবে রূপান্তর করা হয় ১৯৯৪ সালে। এ বাড়ির প্রতিটি কোনায় ছড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধু আর তার পরিবারের স্মৃতি। এক তলার সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার সময়েই চোখে পড়বে সেই কালরাতের বীভৎস তাণ্ডবলীলার নিদর্শন। নিচ তলার প্রথম কক্ষে আছে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়কের ছবি। দোতলায় তার বাসকক্ষ। তার ব্যবহূত খাট, বিছানা, পাঞ্জাবি, আলমারি, চেয়ার, টেবিল, চশমা, পাইপ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। অন্য একটি ঘরে শেখ রাসেলের খেলার জিনিস- ব্যাট, বল, হকিস্টিক। দমবন্ধ করা অনুভূতির মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের সব স্মৃতিচিহ্ন চোখের সামনে ঝলমলিয়ে ওঠে। তিনতলা ভবনটির এক তলায় অফিস কক্ষ এবং একটি ক্ষুদ্র বিক্রয় কেন্দ্র আছে। এই বিক্রয় কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই এবং ম্যাগাজিন বিক্রি হয়। বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে হাঁটা মানে এ দেশের ইতিহাসের ভেতর দিয়ে পরিভ্রমণ। এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, যিনি একটি জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিলেন, পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যকে নিয়ে এ বাড়িতেই তিনি একরাতে কিছু পথভ্রষ্ট সৈনিকের হাতে খুন হলেন। তারই রক্তমাখা স্মৃতি লেগে আছে এ বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে। জাদুঘরটি বুধবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি ছয় দিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। টিকেট মাত্র ৫ টাকা।

Liberation_War_Museum,new_building

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে গেলে আপনার চোখের পানি ধরে রাখাই অনেক কষ্টকর হবে। কী পরিমাণ বর্বরতা পাকিস্তানি হানাদাররা আমাদের ওপর চালিয়েছে তার সব নজির আপনি দেখতে পাবেন। শুধু মৃত মানুষের হাড়ের স্তূপ দেখেই তো আপনার বুক হু হু করে উঠবে। আস্ত এক বধ্যভূমি যেন। মিরপুর জল্লাদখানা বধ্যভূমির স্মৃতিসহ এখানে বাংলাদেশের সব বধ্যভূমির স্মৃতিপীঠ গড়ে তোলা হয়েছে। আরো আছে মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য স্মারক। প্রায় ১৫ হাজার স্মারক এ জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। এ জাদুঘর গড়ে তোলার উদ্দেশ্যই হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের ইতিহাস জানানো। ১৯৯৬ সালে এটি গড়ে তোলা হয় বেসরকারি উদ্যোগে। তখন এটি ছিল ঢাকার সেগুনবাগিচায়। ছোট্ট একটি পুরনো বাড়ি ভাড়া নিয়ে জাদুঘরটি তৈরি করা হয়েছিল। তার জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য নেওয়া হয়েছে। পরে কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় জাদুঘরটি ঢাকার আগারগাঁওয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় দুই বিঘা জায়গার ওপর নির্মাণ করা হয় ১ লাখ ৮৫ হাজার বর্গফুটের বিশাল অত্যাধুনিক বিল্ডিং। রয়েছে চারটি বিশাল গ্যালারি। এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।  এ জাদুঘরে মুক্তিযুুদ্ধবিষয়ক বিভিন্ন তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। হাজার বছরের বাঙালি জাতির ইতিহাসও এখানে তুলে ধরা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরটি ভ্রাম্যমাণ আকারেও প্রদর্শিত হয়। বড় আকারের বাসের অভ্যন্তরে প্রদর্শনী সাজিয়ে একে পরিণত করা হয়েছে খুদে জাদুঘরে। বাংলাদেশ জুড়ে পরিভ্রমণ দ্বারা বাসটি জেলা-উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে। সাপ্তাহিক বন্ধ রোববার, টিকেটের মূল্য ২০ টাকা।

leberation-war-museum-in-dhaka

বিজয়কেতন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

যখন বিজয়কেতন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে যাই, তখন সেখানে দর্শক ছিলাম একমাত্র আমি। এর আগে ২০০২ সালে যখন প্রথম সেখানে যাই, তখনো আমিই ছিলাম একমাত্র দর্শক। এর কারণ হলো, সাধারণ নাগরিকরা জানে না ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে একটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আছে এবং সেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকারও আছে। জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হয়েছে ২০০০ সালে, কিন্তু কেন এর দর্শনার্থী এত কম জানতে চাইলে দায়িত্বরত সৈনিকরা জানালেন, সিভিলিয়ানদের জন্য ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করাই তো একটু কঠিন। তার ওপর কোনো কাজ না থাকলে এদিকে কেউ আসে না। তবু নাকি গড়ে দুই-আড়াইশ’ দর্শক আসে প্রতিদিন। বিকালের দিকে একটু বেশি দর্শক হয়। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) কাছেই এ জাদুঘরটির অবস্থান। ফলে সিএমএইচে আসা অনেক রোগীর আত্মীয়রাই এর দর্শনার্থী। তা ছাড়া বিশেষ দিনগুলোতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও আসে শিক্ষাসফরে। এ জাদুঘরটি বাইরে থেকেই অপূর্ব দৃষ্টিনন্দন। সামনের চত্বরে শিল্পী হামিদুজ্জমান নির্মিত বিরাট একটি ভাস্কর্য, বিজয়কেতন। এ জাদুঘরে প্রবেশ করতে টিকেট কাটতে হয় না। এ জাদুঘরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়- আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পুরো ট্রায়াল রুমটি এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তা ছাড়া আছে মুক্তিযুদ্ধ সময়কালীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব দলিলপত্রের ফটোকপি, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ১১টি সেক্টরের বর্ণনাসহ স্থিরচিত্র। মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহূত অনেক কামান, বন্দুকসহ পুরো মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটই এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সুন্দরভাবে। এখানে একদিন ভ্রমণে যে কেউ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে খুব সংক্ষেপে একটা স্বচ্ছ ধারণা পাবে। কর্তব্যরত সৈনিকরাও খুব বন্ধুত্বপূর্ণ। যেকোনো প্রয়োজনে তারা নিজেরাই গাইড হিসেবে এগিয়ে আসে, সাধারণ দর্শনার্থীদের ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেয় যা যা প্রয়োজন।

maxresdefault

বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘর

ঢাকার বিজয় সরণিতে অবস্থিত এ জাদুঘরটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। এখানে তুলে ধরা হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাস ঐতিহ্য। সংরক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহূত অস্ত্রশস্ত্রসহ সামরিক কর্মকর্তাদের ব্যবহূত নানা জিনিসপত্র। সেনাবাহিনীর ক্ষমতা, সাহস ও ত্যাগের পরিচয় বহন করছে এ জাদুঘরটি। ১৯৮৭ সালে এ জাদুঘরটি প্রথম স্থাপিত হয়েছিল ঢাকা মিরপুর সেনানিবাসের প্রবেশদ্বারে।

পরে ১৯৯৯ সালে এটি নগরের কেন্দ্রস্থল বিজয় সরণিতে নিয়ে আসা হয়। ২০০৪ সালে এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। প্রতিদিনই অসংখ্য দর্শক এটি পরিদর্শনে যায়। বিশাল এলাকা জুড়ে এ জাদুঘরটিতে অসংখ্য সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শিত হচ্ছে। ঢুকতেই সম্মুখের চত্বরে আছে বিশাল দুটো জাহাজ। এ ছাড়া আছে সাঁজোয়া যান, ট্যাঙ্ক, কামান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের ব্যাজ, পোশাক, অস্ত্র, গোলাবারুদ, ক্যানন, এন্টি এয়ারক্রাফ্ট গান এবং যোগাযোগের জন্য ব্যবহূত বিভিন্ন যানবাহন জাদুঘরটিতে রক্ষিত রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পর তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন যানবাহন এবং অস্ত্রও এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী যে জিপে চড়ে বিভিন্ন যুদ্ধ এলাকা পরিদর্শনে যেতেন সেটিও সংরক্ষিত আছে এখানে। সবার জন্য উন্মুক্ত এই জাদুঘর ঘুরে দেখতে কোনো প্রবেশমূল্য লাগে না।

সপ্তাহের বুধবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শুক্রবার বেলা ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এ ছাড়া ১৬ ডিসেম্বর এবং ২৬ মার্চ ছাড়া অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘর বন্ধ থাকে।

89902_56342_5783

বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জাদুঘর

বিমানবাহিনী জাদুঘরে যাবেন, বিমানে উঠবেন। যারা বিমান শুধু আকাশেই উড়তে দেখেছেন, কাছ থেকে দেখার বা চড়ার সুযোগ হয়নি, তাদের জন্য এ এক অনন্য সুযোগ। মাত্র ৩০ টাকার বিনিময়েই আপনি বিমানের ভেতর দেখে আসতে পারবেন। এ জাদুঘরটি ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত, ঠিক আইডিবি ভবনের উল্টো দিকে পুরনো বিমানবন্দরে। এর উত্তর দিকে রয়েছে সুদৃশ্য লেক আর দক্ষিণ দিকে সবুজ বনানী। চারদিক মনোরম পরিবেশ। বিশাল এলাকায় জাদুঘরটি গড়ে উঠেছে। শুধু আকাশের যান্ত্রিক পাখি নয়, চারদিকের নিসর্গ দেখেও আপনি মুগ্ধ হবেন। ২০১৪ সালে এ জাদুঘরটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। প্রতিদিনই প্রচুর ভিড় হয়। অসংখ্য দর্শনার্থী আসেন ঢাকার আশপাশের এলাকা থেকে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাফল্য ও উন্নয়নের ক্রমবিকাশকে সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়াসেই এ জাদুঘরটি নির্মাণ করা হয়। বিভিন্ন সময়ের হেলিকপ্টার ও বিমান দিয়ে জাদুঘরটি সাজানো হয়েছে। বাংলাদেশে আসা প্রথম দিকের বিমানগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে। আছে বাংলাদেশের প্রথম যাত্রীবাহী বিমান বলাকা, যেটি ১৯৫৮ সালে রাশিয়া থেকে আনা হয়েছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহূত এয়ারটেক কানাডিয়ান বোমারু বিমানটি সংরক্ষিত আছে। জাদুঘরের প্রবেশপথের পাশেই ‘নীলাদ্রি’ দোকানে পাওয়া যাবে বিমানবাহিনীর স্মারক।

মুক্তিযুদ্ধে বিমানবাহিনীর শহীদদের স্মরণ করতে তৈরি করা হয়েছে শহীদ কর্নার। এছাড়া বাচ্চাদের খেলাধুলার জন্য ছোট একটি পার্ক তৈরি করা হয়েছে। জাদুঘরে প্রবেশমূল্য ২০ টাকা। সাপ্তাহিক বন্ধ রোববার।

photo-1434449652

আহসান মঞ্জিল

আহসান মঞ্জিল ঢাকার নবাব বাড়ি। এই মনোরম বাড়িটি পুরনো ঢাকার ইসলামপুরে বুড়িগঙ্গা নদীর একেবারে তীর ঘেঁষেই অবস্থিত। আহসান মঞ্জিলের পূর্বনাম ছিল রংমহল। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় জালালপুর পরগনার জমিদার শেখ ইনায়েতউল্লাহ রংমহল নামে একটি প্রমোদভবন তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে তার পুত্র রংমহলটি এক ফরাসি বণিকের নিকট বিক্রি করে দেন। বাণিজ্য কুটির হিসেবে এটি দীর্ঘদিন পরিচিত ছিল। এরপর ১৮৩৫ সালে বেগমবাজারে বসবাসকারী নওয়াব আবদুল গণির পিতা খাজা আলীমুল্লাহ এটি ক্রয় করে বসবাস শুরু করেন। নওয়াব আবদুল গণি ১৮৭২ সালে প্রাসাদটি নতুন করে নির্মাণ করান। নতুন ভবন নির্মাণের পরে তিনি তার প্রিয় পুত্র খাজা আহসান উল্লাহর নামানুসারে এর নামকরণ করেন আহসান মঞ্জিল। আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের নাম ঢাকা মহানগর জাদুঘর। এটি জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা। ১৯৯২ সালে আহসান মঞ্জিলকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়। ঢাকা, বাংলাদেশ এবং ভারতবর্ষের ইতিহাসের সঙ্গে এই বাড়িটির অনেক স্মৃতি জড়িত। ১৯০৬ সালে এ বাড়িতে বসেই মুসলিম লীগ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা নগর গড়ে তুলতে নবাব পরিবারের অনেক ভূমিকাও এ বাড়ি থেকে পরিচালিত হয়।

সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও বাড়িটি উজ্জ্বল। নবাব পরিবারের ব্যবহূত জিনিসপত্র, জীবনযাপন পদ্ধতি দেখাই এ বাড়িটির প্রধান আকর্ষণ। পুরো বাড়িটিকে কয়েকটি গ্যালারিতে ভাগ করে সে সময়ের দৃশ্যাবলি খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গ্রীষ্মকালে এটি সকাল ১০ থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সাপ্তাহিক বন্ধ বৃহস্পতিবার। টিকেট মূল্য বিশ টাকা।

lal-bag-kella20151124110441

লালবাগ কেল্লা

পুরনো ঢাকার আজিমপুর গেলে আপনি লালবাগের কেল্লা দেখতে পাবেন। এটি একটি দুর্গ এবং মুঘল আমলের স্থাপত্যকীর্তির নিদর্শন। এর নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র আজম শাহ। ১৬৭৮ সালে আজম শাহ বুড়িগঙ্গার তীরে লালবাগ দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেন। কিন্তু তিনি কাজ শেষ করতে পারেননি। এর আগেই দিল্লি থেকে পিতা আওরঙ্গজেব ডাক পাঠালেন। তিনি কাজ ফেলে চলে গেলেন। এর মধ্যেই এখানে একটি সুরম্য মসজিদ ও দরবার হল তৈরি হয়েছিল। সুবাদার শায়েস্তা খাঁ ১৬৮০ সালে ঢাকায় এসে পুনরায় দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেন।

১৬৮৪ সালে এখানে শায়েস্তা খাঁর কন্যা ইরান দুখত রাহমাত বানুর (পরী বিবি) মৃত্যু ঘটে। এখানেই পরী বিবিকে সমাহিত করা হয় এবং নির্মাণ করা হয় পরী বিবির মাজার। লালবাগ কেল্লার বর্তমান প্রধান আকর্ষণ এই পরী বিবির মাজার। এ ছাড়া আছে ছোট একটি সংগ্রহশালা, যেখানে সংগৃহীত আছে মুঘল আমলের মুদ্রা, অস্ত্রশস্ত্র, তৈজসপত্র, মৃৎশিল্প, সে সময়ের হাতে লেখা কোরআন শরীফ। আর আছে সুন্দর একটি পুকুর।  মুঘল আমলের জীবনধারা সম্পর্কে আরো আলোকপাত করার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর লালবাগ দুর্গে জাদুঘর নির্মাণ করে। দরবার হলের দোতলা জুড়ে জাদুঘরটির অবস্থান। প্রতিদিনই এখানে অসংখ্য দর্শনার্থীর সমাগম হয়। কেল্লার দেয়ালের পাশ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আপনি এখনো সেই প্রাচীন গন্ধ পাবেন। হয়তো এ দেয়াল ধরে একদিন হেঁটে গেছে পরী বিবি। কেল্লায় প্রবেশমূল্য ২০ টাকা। রোববার সাপ্তাহিক বন্ধ।

 

আরো কিছু জাদুঘর

ডাক জাদুঘর : এখন আর  িডাকপিয়ন এসে হাঁক দেয় না- এই চিঠি এসেছে, চিঠি।  চিঠির সঙ্গে জড়িত আমাদের অনেক স্মৃতি। চিঠি আমাদের সংস্কৃতিরই একটা অংশ। বাংলাদেশ ডাক জাদুঘর সেই স্মৃতি ও সংস্কৃতি ধরে রেখেছে জেনারেল পোস্ট অফিসের (জিপিও) দোতলায়। এ জাদুঘরটি শুরু হয় ১৯৬৬ সালে। এখানে সংগৃহীত আছে বিভিন্ন সময়ের ডাক কার্যক্রমের জিনিসপত্র।

উর্দি পরিহিত লণ্ঠন হাতে রানারের এক অবয়ব আছে। আছে রানি ভিক্টোরিয়া আমলের বিশালাকৃতির একটি ডাক বাক্স। বায়তুল মোকাররম মসজিদের গহনা মার্কেটের দিক দিয়ে ডাক ভবনে ঢুকলে এ জাদুঘর পাওয়া যাবে। শুক্র, শনি বন্ধ। প্রবেশমূল্য নেই।

টাকা জাদুঘর : কেমন ছিল টাকার বিবর্তন! কত যুগ পার হয়ে কুষাণ মুদ্রা, হরিকেল মুদ্রা, দিল্লি ও বাংলার সুলতানদের মুদ্রা, মুঘল ও ব্রিটিশ শাসকদের মুদ্রা পার হয়ে আজকের আধুনিক টাকার আবির্ভাব। সেসব দেখতে চাইলে ঘুরে আসুন ঢাকার মিরপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেনিং একাডেমিতে। এখানে গেলে দেখতে পাবেন মুদ্রা সংরক্ষণের কাঠের ও লোহার নির্মিত প্রাচীন সিন্দুকও। গ্যালারিতে প্রাচীন থেকে শুরু করে আধুনিককাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তনের ধারাও বর্ণিত হয়েছে। বিনা টাকাতেই আপনি টাকার জাদুঘরে প্রবেশ করতে পারবেন।

ভাষা আন্দোলন জাদুঘর : বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের দোতলায় গড়ে তোলা হয়েছে ‘ভাষা আন্দোলন জাদুঘর’। এই জাদুঘরে রয়েছে ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক আলোকচিত্র, সংবাদপত্র, স্মারকপত্র, ব্যঙ্গচিত্র, চিঠি, প্রচারপত্র, পাণ্ডুলিপি, বইয়ের প্রচ্ছদ এবং ভাষাশহীদদের স্মারকচিহ্ন। চার কক্ষবিশিষ্ট এই জাদুঘরের দেয়ালে দেয়ালে ঝোলানো এসব আলোকচিত্র, দর্শককে ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ২০১০ সালে এটি চালু করা হয়। ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। 

নগর জাদুঘর : কীভাবে গড়ে উঠল এই ঢাকা শহর, কী ছিল এই নগরে? সেই ইতিহাসকে ধারণ করার জন্যই নগর ভবনের ছয়তলায় গড়ে তোলা হয়েছে নগর জাদুঘর। জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৮৭ সালে। এখানে সংরক্ষিত আছে ঢাকা নগরীর স্মৃতি সংক্রান্ত জানা-অজানা নানা বিষয়। ১০০ বছর আগের ঢাকার একটি মানচিত্র, মুঘল আমলে আগে থেকে বাংলাদেশ আমল পর্যন্ত ঢাকার সীমানার ধারাবাহিক বৃদ্ধির নকশা, ঢাকার ইতিহাস সংবলিত ১০১টি দুর্লভ আলোকচিত্র এই নগর জাদুঘরে।  ঢাকার ইতিহাসটি সম্পূর্ণভাবেই ধরে রেখেছে এই জাদুঘর। ছুটির দিন বন্ধ থাকে। প্রবেশমূল্য ২ টাকা হলেও সারা দিনে তেমন দর্শনার্থী এখানে আসে না। না আসার কারণ অনেকেই জানে না বিশাল এই নগর ভবনে একটি জাদুঘর আছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর : জনসাধারণের মধ্যে বিজ্ঞান অনুরাগ ও বিজ্ঞান সচেতনতা সৃষ্টি করাই এর প্রধান লক্ষ্য। এখানে মোট সাতটি গ্যালারি আছে। গ্যালারিতে রাখা প্রকৃতির স্থির ও সচল প্রদর্শনী সামগ্রী, চার্ট, ডায়াগ্রাম, পোস্টার ইত্যাদির মাধ্যমে দর্শনার্থীদের বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। প্রদর্শনী সামগ্রীগুলো বিদ্যুৎ, তাপ, আলো, চুম্বকশক্তি, শব্দ, যোগাযোগ, গতিশক্তি ও জ্বালানির মতো ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আবিষ্কারের তথ্য সরবরাহ করে। এখানে প্রতিসরণকারী দূরবীণের মাধ্যমে গ্রহ, নক্ষত্র, সৌরজগৎ ও চন্দ্রগ্রহণ দেখার নিয়মিত কর্মসূচি রয়েছে। বৃহস্পতি ও শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি। প্রবেশমূল্য মাত্র ১০ টাকা।

স্বাধীনতা জাদুঘর : সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতর দিয়ে হেঁটে গেলেও অনেকেই জানে না এই উদ্যানের ভেতরেই সুন্দর এক বিশাল জাদুঘর আছে। না জানার কারণ জাদুঘরটি মাটির নিচে। শিখা চিরন্তন ধরে সোজা এগিয়ে গেলে জলাধারের নিচেই এটি অবস্থিত। তার উপরে কাচের নির্মিত স্বাধীনতা স্তম্ভ। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসন ভাষণ, গণসভা থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবস পর্যন্ত ইতিহাস তুলে ধরাই এ জাদুঘর তৈরির মূল উদ্দেশ্য।  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষিত হলেও মুঘল আমল থেকে বাঙালি জাতির সমস্ত সংগ্রামের ইতিহাস এখানে তুলে ধরা হয়েছে ধারাবাহিকভাবে। এ জাদুঘরে পরিদর্শনে প্রবেশ মূল্য লাগে না।