• মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১৪ মহররম ১৪৪০
BK
প্রতিষেধকই এক ও অনন্য উপায়

২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস

ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবছর বিশ্বে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১.৪ মিলিয়ন লোক মারা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বাংলাদেশেও ৪.৪ থেকে ৭.৮ ভাগ লোক তাদের শরীরে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের জীবাণু বহন করছে। হেপাটাইটিসের গুরুত্ব অনুধাবনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে প্রতি বছর জুলাই মাসের ২৮ তারিখ বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহিনুল আলমের নেতৃত্বে এক দল গবেষক সারা দেশে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নির্ণয় করতে একটি গবেষণা কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। এটাই প্রথম গবেষণা যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিনিধিমূলক জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সম্পন্ন হয়েছে। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫.১ শতাংশ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। ০.২ শতাংশের দেহে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস রয়েছে। অর্থাৎ দেশে ৮০ লাখেরও বেশি মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত এবং প্রতি ৫০০ জনে ১ জন হেপাটাইটিস সি ভাইরাস বহন করছে। এই গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাংলাদেশ মধ্যম স্তরের আক্রান্ত এলাকা হিসেবে পরিগণিত হবে। হেপাটাইটিস ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ওপর ভিত্তি করে সারা বিশ্বকে মোট তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে- উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন আক্রান্ত এলাকা। তবে আশার কথা, সফল ইপিআই প্রোগ্রামের কারণে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের প্রবণতা নিম্নগামী।

হেপাটাইটিস বি ও সি মূলত রক্ত কিংবা দেহনিঃসৃত তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। তাছাড়া দূষিত সিরিঞ্জ, খাতনা, নাপিতের ক্ষুর কিংবা মায়ের থাকলে শিশুর দেহে ছড়ায়। যৌনমিলনের মাধ্যমেও হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস ছড়ায়। এ ছাড়া রক্ত আদান-প্রদান, ডায়ালাইসিস, আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে বসবাস, সংক্রমণের হার বেশি এমন স্থানে ভ্রমণ প্রভৃতি মাধ্যমেও এ রোগ ছড়ায়। তবে হাত ধরা, খাবারের তৈজসপত্র শেয়ার করা, চুম্বন, কোলাকুলি করা, হাঁচি-কাশি, কিংবা মাতৃদুগ্ধপানের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায় না।

হেপাটাইটিস বি একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ যা যকৃত বা লিভারকে আক্রমণ করে। হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের (ঐইঠ) আক্রমণে এ রোগ হয়। ভাইরাল হেপাটাইটিস বাংলাদেশে লিভার রোগের অন্যতম কারণ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জন্ডিস নিয়ে যারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন তাদের শতকরা ৪৩ ভাগ হেপাটাইটিস ই ভাইরাসজনিত, শতকরা ২২ ভাগ হেপাটাইটিস বি ভাইরাস, শতকরা ৮ ভাগ হেপাটাইটিস এ ভাইরাস, শতকরা ৩ ভাগ হেপাটাইটিস সি ভাইরাস এবং শতকরা ২৪ ভাগ অন্যান্য কারণ দ্বারা আক্রান্ত। সাধারণত সংক্রমণের প্রথম দিকে বা অ্যাকিউট সংক্রমণে কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না, তবে ক্ষেত্রবিশেষে বমি বমি ভাব, চামড়া হলুদ হওয়া, ক্লান্তি, পেট ব্যথা, প্রস্রাব হলুদ হওয়া প্রভৃতি লক্ষণ দেখা যায়। সাধারণত এই লক্ষণগুলো কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয় এবং কদাচিৎ লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর পরিশেষে মৃত্যু হয়। সংক্রমণের পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে ৩০ থেকে ১৮০ দিন সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি’তে আক্রান্ত রোগীদের বেশিরভাগেরই কোনো প্রাথমিক লক্ষণ থাকে না। যদিও এক্ষেত্রে এটি ধীরে ধীরে সিরোসিস এবং যকৃতের ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।

এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। সাধারণত এর কোনো কার্যকরী চিকিৎসা নেই। চিকিৎসকরা শুধু লক্ষণের উপশম করবেন মাত্র। এর মূল চিকিৎসা হলো রোগীকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখা। গ্লুকোজের শরবত খাওয়ালে উপকার পাওয়া যায়। এ রোগের প্রতিষেধকই একমাত্র ও অন্যতম ব্যবস্থা। প্রতিষেধক হিসেবে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের টিকা এখন সর্বত্র পাওয়া যায়। সব বয়সীরাই এই টিকা নিতে পারবেন এবং হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে পারবেন।

হেপাটাইটিস বি’র প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিনের ডোজ ৪টি। প্রথম ৩টি এক মাস পরপর এবং চতুর্থটি প্রথম ডোজ থেকে এক বছর পর। পাঁচ বছর পর বুস্টার ডোজ নিতে হবে। এর মাধ্যমে শরীরে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। তাছাড়া সুস্থ সংস্কৃতির অনুশাসন ও জীবনযাপন প্রণালিও উত্তম প্রতিষেধক।

ডা. ফজলে রাব্বী খান

সিইও, হেলদি লিভিং ট্রাস্ট