• বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
BK

হেপাটাইটিসে ভুগছে এক কোটি মানুষ 

হেপাটাইটিসে ভুগছে এক কোটি মানুষ 
ছবি: সংগৃহীত

জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমেই ভয়ানক হয়ে উঠছে হেপাটাইটিস রোগ। ‘নীরব ঘাতক’ রোগটিতে দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ আক্রান্ত। তাদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের সংক্রমণে লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে প্রতিবছর ২০ হাজারের বেশি রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। অথচ আক্রান্ত ১০ জনের মধ্যে নয়জনই জানে না তাদের শরীরে বাসা বেঁধেছে ঘাতক এই ভাইরাস।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি উদ্যোগে হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিতে যথাযথ কর্মসূচি ও নিরাপদ পানির অভাবে রোগটিতে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগটি পরীক্ষার ‘ভাইরাল মার্কার’ ও ‘টোটালের’ ব্যবস্থা নেই। ফলে আক্রান্ত দরিদ্র লোকজনের ক্ষেত্রে রোগটি চিহ্নিত হচ্ছে না। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে রোগটি প্রতিরোধ ও নির্মূলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে কর্মসূচি নিয়েছে সরকার। অথচ লক্ষ্য পূরণে এখন পর্যন্ত জাতীয় নীতিমালাই করা হয়নি। শিশুর জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস প্রতিরোধে ডোজ দিতে হয়। এ দেশে অনেক ক্ষেত্রে শিশু জন্মের ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে এ টিকা দিতে। ফলে শশুরাও রোগটিতে আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তদের অধিকাংশই আবার চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শুধু সচেতনতার অভাবে। অনেকেই একে ‘সাধারণ জন্ডিস’ মনে করে কবিরাজি ও স্থানীয় পদ্ধতিতে চিকিৎসা নেন। অথচ হেপাটাইটিস হচ্ছে ভাইরাসজনিত লিভারের রোগ। একপর্যায়ে যা লিভারে ক্যানসার সৃষ্টি করে রোগীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত ৩২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে প্রায় চার হাজার মানুষ এ রোগে মারা যাচ্ছেন।

এ পরিস্থিতিতে আজ শনিবার পালিত হবে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য- ‘হেপাটাইটিস নির্মূল করা’। হেপাটোলজি সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি ডা. শাহিনুল আলম জানান, হেপাটাইটিস ‘ই’ ও ‘এ’ পানিবাহিত রোগ। হেপাটাইটিস ‘সি’ রক্তবাহিত। ‘বি’ ভাইরাসে দেশের মোট ৮৫ লাখ মানুষ আক্রান্ত। প্রতি ৫০০ জনের একজন ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত। হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে আক্রান্তদের তিন শতাংশ মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হয়।

হেপাটোলজি সোসাইটির তথ্য মতে, দেশে একিউট হেপাটাইটিসে (প্রচলিত জন্ডিসের) আক্রান্তদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ হেপাটাইটিস ‘ই’ ভাইরাসে, ১৫ শতাংশ ‘বি’ ভাইরাস, ৮ শতাংশ ‘এ’ ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। লিভার সিরোসিসের জন্য ‘হেপাটাইটিস বি’ ভাইরাস ৬০ শতাংশ, ‘সি’ ভাইরাস ৩০ শতাংশ দায়ী। লিভার ক্যানসারের জন্য ‘হেপাটাইটিস বি’ ভাইরাস ৬৫ শতাংশ এবং ‘সি’ ভাইরাস ১৭ শতাংশ দায়ী।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) জরিপ মতে, কয়েক বছর ধরে দেশে পানি ও খাদ্যবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে হেপাটাইটিস। ‘রিভার পলিউশন মিটিগেশন কমিটি’ (আরপিএমসি) দুই বছর আগে ঢাকার আশপাশের নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য বিষয়ে জরিপ করে। এতে বলা হয়, নদীতীরের বাসিন্দারা হোপাটাইটিসসহ প্রায় ২০ রকমের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। তাদের উপার্জনের একটা মুখ্য অংশ খরচ হয়ে যাচ্ছে এসব রোগের চিকিৎসায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকায় চলতি বছর হঠাৎ করে বেড়ে যায় হেপাটাইটিসের প্রাদুর্ভাব। রোগটি ছড়িয়ে পড়ার পেছনে চট্টগ্রাম ওয়াসার দূষিত পানি দায়ী বলে মনে করে জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়। আইইডিসিআরের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থলে গিয়ে আক্রান্ত রোগীদের রক্তের নমুনা ও ওই এলাকার ওয়াসার পানি সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে। এতে প্রমাণিত হয়, দূষিত পানি পানের কারণেই হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন সেখানকার বাসিন্দারা। বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বেশিরভাগ খরচ হচ্ছে পানিবাহিত রোগের চিকিৎসায়। এক্ষেত্রেই স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় ৭৫ শতাংশ খরচ হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘আগে দূষিত পানির কারণে সংক্রামক রোগ ছড়ালেও এখন অসংক্রামক রোগের প্রকোপও বাড়ছে। পানিবাহিত রোগগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব হলে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বেশিরভাগ অর্থ অন্য রোগের চিকিৎসায়ও ব্যয় করা যেত।’