• বৃহস্পতিবার, ২২ নভেম্বর ২০১৮, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
BK

মন ও মননের ছোটকাগজ ‘লেখমালা’

মন ও মননের ছোটকাগজ ‘লেখমালা’
সংরক্ষিত ছবি

সতেজ মাসুদ

‘লেখমালা’ সম্কাদনা করেন কবি মামুন মুস্তাফা। ‘মন ও মননের ছোটকাগজ’ এই স্লোগান নিয়ে নতুন কলেবরে আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে ডিসেম্বর ২০১৭-তে প্রকাশিত হয়েছে লেখমালা’র নবম সংখ্যা। এ সংখ্যার মধ্য দিয়ে লেখমালা তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ করেছে। এ সংখ্যার আয়োজন তিনটি অংশে বিন্যাসিত। প্রথম অংশে রয়েছে নির্বাচিত কাব্যের মূল্যায়ন। দ্বিতীয় অংশে রয়েছে নির্বাচিত কাব্যের কবিতা এবং তৃতীয়াংশে আছে শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী আনিসুজ্জামানকে নিয়ে একটি ক্রোড়পত্র।  প্রথমাংশ অর্থাৎ নির্বাচিত কাব্যের মূল্যায়ন অংশে নির্বাচিত আটজন কবির কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আটটি গদ্য রয়েছে। এই আটজন কবির মধ্যে রয়েছেন পাঁচজন নব্বইয়ের দশক ও তিনজন শূন্য দশকের কবি। গদ্যগুলো পড়ার মধ্য দিয়ে আটটি কবিতার বই সম্কর্কে পাঠক জানতে পারবেন। আটজন কবিকেও জানার সুযোগ ঘটবে। কবি মাহবুব কবিরের কাব্যগ্রন্থ ‘আয়নার দিকে’ নিয়ে লিখেছেন লেখমালা’র সম্কাদক ও কবি মামুন মুস্তাফা। ‘‘আমাদের খুব চেনা পরিবেশের ভেতরে কিছু অমীমাংসিত শূন্যতা থাকে। যেসব নিয়ে আমরা কখনো ভাবার অবকাশ পাই না। এমনকি তাকে আলাদাভাবে দেখতেও চাই না। ‘আয়নার দিকে’ কবিতাগ্রন্থে মাহবুব কবির সেই শূন্যস্থানগুলোতে বিবেকের জাগরণ ঘটিয়ে এক ধরনের সাংকেতিক কবিতা নির্মাণ করেন।” কবি আহমেদ স্বপন মাহমুদের কাব্য ‘শ্রীমতি প্রজাপতি রায়’ নিয়ে লিখেছেন ফারজানা আক্তার। তিনি বলেছেন, ‘শ্রীমতি প্রজাপতি রায় আহমেদ স্বপন মাহমুদের অন্যান্য কাব্যের চেয়ে অনেকটাই স্বতন্ত্র। কারণ এই কাব্যে বৈষ্ণব পদাবলী, রাধা-কৃষ্ণের অলৌকিক প্রেমলীলা এবং মানবমন ও প্রাণপ্রকৃতির এক সম্মিলন দেখানো হয়েছে।’

কবি মামুন মুস্তাফার কবিতাগ্রন্থ ‘একাত্তরের এলিজি’র ব্যাখ্যায় মামুন রশীদ বলেন, “মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে কবিতার যে স্বাতন্ত্র্য ধারা তৈরি হয়েছিল, সেই ধারারই অংশ ‘একাত্তরের এলিজি’। ...কবিতাগ্রন্থটিতে চল্লিশ জন মুক্তিযোদ্ধার চিঠি অবলম্বনে কবি মামুন মুস্তাফা তুলে এনেছেন স্বাধীনতাকাঙ্ক্ষী মানুষের উপলব্ধি।” কবি ওবায়েদ আকাশের কাব্যগ্রন্থ ‘প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায়’ নিয়ে লিখেছেন চাণক্য বাড়ৈ। তিনি বলেছেন, ‘ওবায়েদের কবিতাগুলো যে শুধু প্রিয় কবিদের নিয়েই রচিত, তা নয়; প্রত্যেক কবির নিজস্ব শব্দচয়ন, শব্দবন্ধ, উপমা-অলংকারের প্রয়োগ প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য নিখুঁত পর্যবেক্ষণ করে অত্যন্ত সতর্কতা ও নৈপুণ্যের সঙ্গে কবিতাগুলোয় তা ব্যবহার করা হয়েছে।’ কবি মোস্তাক আহমদ দীনের কবিতার বই ‘ভিখিরিও রাজস্থানে যায়’ নিয়ে লিখেছেন আবিদ ফয়সাল। তিনি বলেছেন, ‘দীনের কবিতায় আছে শব্দকে অনুভবের ভাষা দিয়ে বাজিয়ে নেবার খেলা, আছে রহস্যময়তা আর আছে গদ্যের মোচড়। ছন্দের শাসন মান্য করেও আছে প্রথা-কবিতার বিপক্ষে বিদ্রোহ।’  শূন্য দশকের তিনজন কবির একজন জুয়েল মোস্তাফিজ। এই কবির কাব্যগ্রন্থ ‘ভাতের ভূগোল’ নিয়ে লিখেছেন রজত সিকস্তি। ব্যক্তিগত বোধের ফরমায় ফেলে নিপুণভাবে ‘ভাতের ভূগোল’ পরখ করেছেন রজত সিকস্তি। এর পরের কবি তুষার প্রসূন। তার কাব্যগ্রন্থ ‘হাড়ের কোরিওগ্রাফি’ নিয়ে লিখেছেন গালিব রহমান। কবি তুষার প্রসূন বিজ্ঞানমনস্ক ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন কবিতায়। অন্যদিকে কবি গালিব রহমানের কাব্যগ্রন্থ ‘যে সুতোয় বোনা যায় সমতল আবাস’ নিয়ে লিখেছেন সৌম্য সালেক। তিনি বলেছেন, “গালিব রহমানের ‘যে সুতোয় বোনা যায় সমতল আবাস’ কাব্য পাঠ শেষে এটুকু বলতে পারি, জীবনের বিচ্ছিন্ন অভিঘাত থেকে বেছে নেয়া অনুষঙ্গ প্রকাশে তিনি সযত্ন ও রুচিবান।”  লেখমালা ছোটকাগজটির দ্বিতীয়াংশ অর্থাৎ নির্বাচিত কাব্যের মূল্যায়নে যে আটটি কবিতাগ্রন্থের আলোচনা করা হয়েছে, সেই আটজন কবির আটটি কাব্যগ্রন্থ থেকে কয়েকটি করে কবিতা তুলে দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়াংশে এই আট কবির নির্বাচিত কাব্য থেকে কবিতা থাকার দুটি ভালো দিক রয়েছে। একটি হলো, প্রথম অংশে নির্বাচিত কবিদের কাব্য নিয়ে মূল্যায়নমূলক যে গদ্য রয়েছে, কবিতাগুলো পড়লে সেই গদ্যের মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। অপরটি হলো, নির্বাচিত কবিদের কবিতা সম্কর্কে পাঠক ধারণা পাবেন। কবিদের সব কবিতা ভালো লাগবে এমন কিন্তু নয়, তবে নির্বাচিত এই আটজন কবির কবিতা, কবিতার পাঠকের কাছে ভালো লাগবে বিষয়-বৈচিত্র্যের নিপুণতার জন্য। সবশেষে অর্থাৎ তৃতীয় অংশে রয়েছে ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে নিয়ে ক্রোড়পত্র। এই গুণীজনকে নিয়ে লিখেছেন পশ্চিমবঙ্গের যশস্বী কবি ও লেখক প্রবালকুমার বসু, সরকার আবদুল মান্নান, শহীদ ইকবাল, ওবায়েদ আকাশ, পিয়াস মজিদ এবং দিদার হাসান। একই সঙ্গে পাঠক পাবেন লেখমালার সম্কাদক ও কবি মামুন মুস্তাফার নেওয়া অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের বিশেষ সাক্ষাৎকার। এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে শিক্ষা, সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্র ইত্যাদি সম্কর্কে শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক আনিসুজ্জামানের দিকদর্শন ও চিন্তাচেতনার সারসংক্ষেপ সম্কর্কে আমরা অবগত হই, যা আমাদের আগামী দিনের পাথেয় হয়ে থাকবে। শুদ্ধ সাহিত্যচর্চার এই সঙ্কটময় মুহূর্তে লেখমালা’র বহুল প্রচার কামনা করি।