• বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ৯ মহররম ১৪৪০
BK

‘ভারসাম্যের মুদ্রানীতি’ ঘোষণা চলতি সপ্তাহে

ছবি: সংগৃহীত

ব্যাংকঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন ব্যাংকমালিকরা। একই ভাবে তারা আমানত সংগ্রহে সুদ নির্ধারণ করেছেন ৬ শতাংশ। মূলত ঋণের উচ্চসুদে বিনিয়োগ স্থবির যাতে না হয়, সেই প্রেক্ষাপট থেকে এমন সিদ্ধান্ত এলেও তা কার্যকর নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আবার ব্যাংক খাতে চলছে নগদ টাকার টানাটানি। সঙ্কট কাটাতে সরকারি আমানতে বেড়েছে বেসরকারি ব্যাংকের অংশগ্রহণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নগদ জমার হার ১ শতাংশ কমানো হয়েছে। অগ্রিম আমানত হার সমন্বয়ে আগামী মার্চ পর্যন্ত সময় পাবে ব্যাংকগুলো। জিনিসপত্রের দাম সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। নির্বাচনী বছরে দ্রব্যমূল্য স্থিতি রেখে ভোটের রাজনীতিতে সরকার চাইবে জনগণের সমর্থন পেতে। অর্থনীতির এমন বেসামাল পরিস্থিতিতে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থনীতির সব সূচক বিবেচনা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল মুদ্রানীতি প্রণয়ন এরই মধ্যে শেষ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম টেলিফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, চলতি সপ্তাহেই ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে। তবে তার প্রকৃতি কী হবে সেটি এখন প্রকাশ করা যাবে না। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র বলছে, বিনিয়োগ চাঙ্গা করার সব প্রণোদনা দেবে সরকার। তবে উদ্বেগের বিষয় থাকছে সামনের নির্বাচন। সব ঠিক থাকলে নতুন মুদ্রানীতির এই মেয়াদে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনী বছরে সাধারণত অর্থ পাচারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। মূলত বিনিয়োগের আড়ালে সেটি করেন অনেক অসৎ ব্যবসায়ী। তাছাড়া নির্বাচনী খরচ মেটাতেও অনেকে ফন্দিফিকির করে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন। এমন উৎকণ্ঠা মাথায় রেখেই মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুদ্রানীতির আকৃতি থেকে এবার বেশি আলোচনায় এসেছে তা ঠিক রাখা। সম্প্রতি ব্যাংক খাতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে মালিকদের চাপে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি কাগুজে নথিমাত্র। প্রশ্ন উঠেছে এর সুশাসন ও বাস্তবায়ন নিয়ে। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আমদানি ব্যয় সম্প্রতি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। গত এক বছরে দেশের আমদানিব্যয় বেড়েছে শতকরা সাড়ে ২৫ ভাগ। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে ব্যাংকগুলোতে এই মুহূর্তে ডলার সঙ্কট রয়েছে। অপরদিকে আমানত না বাড়িয়ে ব্যাংকগুলো আগ্রাসী ঋণ বিতরণ করায় ব্যাংক খাতে তারল্য সঙ্কটও প্রকট। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। এ রকম নানামুখী সঙ্কটের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০১৮-১৯ অর্থবছরের (জুলাই-জানুয়ারি) প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে মুদ্রা ও ঋণ সরবরাহে সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতি প্রয়োজন বলে নিজেদের মতামতে অর্থনীতিবিদরা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূল্যস্ফীতির ওপর জোর দেওয়া এবার মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্য থাকছে। তবে এবার যেহেতু বাজেটে সঞ্চয়পত্রের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে সরকারি খাতের ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে, তাই বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি যৌক্তিক করতে হবে। তবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার যেখানে ঋণের সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে ঋণ প্রবৃদ্ধি ভারসাম্য কতটা করতে পারে সেটিই প্রশ্ন।

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আসবে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে মূল বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল ২৮ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। কিন্তু ওই অর্থবছরে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে (মূলত সঞ্চয়পত্র থেকে) বেশি ঋণ আসায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে লক্ষ্য অনুযায়ী ঋণ নিতে হয়নি সরকারকে। যে কারণে সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের লক্ষ্য কমিয়ে করা হয় ১৯ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা।

অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য কমিয়ে ২৯ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা করা হয়েছে। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্রসহ জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলো থেকে ২৬ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম গত বৃহস্পতিবার বলেন, ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচনকে সামনে রেখে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়বে। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক টাকার চেয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক বা কালো টাকার প্রবাহ বেশি হবে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। এতেও মূল্যস্ফীতি চাপে পড়বে। তাই এদিকে সজাগ থাকতে হবে মুদ্রানীতিতে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে হচ্ছে। সে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সতর্ক থাকতে হবে। তবে এর সঙ্গে বেশি সতর্ক হতে হবে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলায়। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

গত অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি প্রণয়নের সময় বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। ওই সময় মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কিছুটা কমিয়ে আনে বাংলাদেশ ব্যাংক।