• মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫, ২৩ সফর ১৪৩৯
BK
নারী উদ্যোক্তা

আত্ননির্ভরশীল নিলুফা ইয়াসমিন

আত্ননির্ভরশীল নিলুফা ইয়াসমিন
সংরক্ষিত ছবি

সোহানুর রহমান

উন্নয়নশীল বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ নারীই উদ্যোক্তা হন প্রতিবন্ধকতাকে সামনে রেখে। তেমনই এক প্রতিবন্ধকতা থেকে শুরু হয় নিলুফা ইয়াসমিনের গল্পটা। এইচএসসি পাস করে ডিগ্রি পরীক্ষার সময় বিয়ে হয় তার। তাই আর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। স্বামী আর তিন সন্তান নিয়ে সুখেই দিন কাটছিল। বড় ছেলের এইচএসসি পরীক্ষার সময় হঠাৎ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন তার স্বামী। পরিবারটির ওপর নেমে আসে অন্ধকার। তিন সন্তান নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন নিলুফা। এক দিকে স্বামী অসুস্থ। তার চিকিৎসার খরচ চালাতে হবে, অন্যদিকে দুই সন্তানের পড়ালেখার খরচ, সংসার খরচ- সবকিছুই তার কাঁধে এসে পড়ে। কিন্তু নিজের উপার্জনের তখনো কোনো ব্যবস্থা ছিল না। শুরু হয় এক কঠিন সংসারযুদ্ধ। স্বামীকে বাঁচাতে হবে আবার সন্তানদের মুুখে আহারও তুলে দিতে হবে। নিরুপায় নিলুফা তখনই নিজের ভিটাবাড়ি বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পরে সবার পরামর্শ এবং ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত বদল করেন। চেষ্টা করেন অন্য কিছু করার। একটি চাকরির জন্য ছুটতে থাকেন আত্মীয়পরিজন সবার কাছে। স্বামীর অসুস্থতা আর পারিবারিক এমন বিপর্যয়ের সময় নিলুফা তার বাবা-মাকেই পাশে পেয়েছেন। বড় ছেলেও টিউশনি করতে শুরু করে। সে টাকাতে চলত ছোট দুই ভাইয়ের পড়ালেখার খরচ। প্রায় দুই বছর অসুস্থতায় ভুগে ২০১১ সালে তার স্বামী মারা যান। তিন সন্তানকে নিয়ে আরো একবার অকুল পাথারে পড়েন নিলুফা ইয়াসমিন। মাথায় তখন প্রতিনিয়ত একটাই চিন্তা, কীভাবে তার সংসার চালাবেন এবং সন্তানদের মুখে আহার তুলে দেবেন। এ সময়েই দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের ‘নারী নেতৃত্ব এবং বিকাশ সহায়ক ট্রেনিং’-এর ৫৪তম ব্যাচে অংশগ্রহণ করেন নিলুফা। যেখান থেকে তিনি বুঝতে পারেন, তার সব পথ এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। নিজেই আবার পথ তৈরি করতে পারেন। আত্মবিশ্বাসটা মূলত তৈরি হয় এখান থেকেই। তারপর থেকেই নিলুফা নিজে কিছু করার প্রতি মনোযোগ দেন। আত্মনির্ভরশীল হওয়ার লক্ষ্যে পাশের বাড়ির এক মহিলার কাছ থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ নেন। প্রথমে তিনি নিজেই সেলাই করতেন। ধীরে ধীরে এখন তার বাসায় চারটি মেশিন। তিনজন কর্মী নিয়ে এখন তিনি নিজস্ব ডিজাইনে মেয়েদের থ্রি-পিস, নকশিকাঁথা, শাড়ি, পুঁতির ব্যাগ ইত্যাদি তৈরি করে বরিশালসহ বিভিন্ন উপজেলায় মার্কেটিং করেন। এমনকি অনলাইনেও তার ব্যবসার পরিধি ছড়িয়ে দিচ্ছেন। শুধু স্থানীয় মার্কেট নয়, দেশের বাইরে এবং ঢাকাতে তার উৎপাদিত পণ্য মার্কেটিং করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ ছাড়াও তিনি এসএমই মেলা, নারী উদ্যোক্তা মেলা এবং উন্নয়ন মেলাগুলোতে অংশগ্রহণ করছেন। নিলুফা বলেন, তিনি বর্তমানে খুব ভালো আছেন। আর্থিকভাবে অসচ্ছলতা নেই আর। তার বড় ছেলে স্নাতক শেষ করে এখন চাকরির অপেক্ষায় আছে। মেজ ছেলে সরকারি তিতুমীর কলেজে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে। আর ছোট ছেলে জিলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। তাই সন্তানদের নিয়েও দুশ্চিন্তা নেই বললেই চলে। তিনি আরো বলেন, পদ্মা সেতুটা হয়ে গেলে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হবে। আর তখন কাঁচামাল সহজলভ্য এবং পরিবহন খরচ কম হবে। এতে আমাদের ব্যবসা আরো ভালো হবে। নিলুফা এখন একজন সফল উদ্যোক্তা। তিনি শুধু সফল উদ্যোক্তাই নন নিজেকে জড়িয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক কাজের সঙ্গেও। এলাকার ঝরে পড়া শিশুদের স্কুলগামী করতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করেছেন দুটি। এ ছাড়াও হাঙ্গার প্রজেক্টের নারীনেত্রী হিসেবে এবং বরিশাল উইমেন চেম্বার অব কমার্সের মেম্বার হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করে যাচ্ছেন। তার এই উদ্যমে অনুপ্রাণিত হয়ে অন্য মহিলারা এখন এই ব্যবসায় উদ্যোগী হচ্ছেন। তাদের প্রতিও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন নিলুফা ইয়াসমিন।