• রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ১২ মহররম ১৪৪০
BK

আসামে নাগরিক তালিকা প্রকাশে ভারতে রাজনৈতিক ঝড়

আসামে নাগরিক তালিকা প্রকাশে ভারতে রাজনৈতিক ঝড়
ছবি: ইন্টারনেট

ভারতের আসামে রাজ্যের নাগরিকদের তালিকা প্রকাশের পর ভারতে রাজনৈতিক ঝড় শুরু হয়েছে। সোমবার প্রকাশিত এই তালিকায় বাদ পড়েছে চল্লিশ লাখেরও বেশি মানুষ। সংখ্যাটা রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় আট ভাগের এক ভাগ।

সাউথএশিয়ান পোস্টের উৎপল বদলের করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোয়াহাটিতে সোমবার রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তারা ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স (এনআরসি) প্রকাশ করে। যে ৩২.৯ মিলিয়ন মানুষ আবেদন করেছিল, তাদের মধ্যে এতে জায়গা হয়েছে ২৮.৯ মিলিয়ন মানুষের। বাদ পড়েছে ৪,০০৭,৭০৭ জন মানুষ। এদের মধ্যে ২৪৮,০০০ জনকে আগে সন্দেহভাজন জাতীয়তার লোক হিসেবে আলাদা করা হয়েছিল। ভারতের নির্বাচন কমিশন তাদের ভোটও দিতে দেয়নি।

ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল শৈলেশ বলেন, শুধু নির্বাচন কমিশনই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন যারা বাদ পড়েছে তালিকা থেকে, তারা ২০১৯ সালের নির্বাচনে ভোট দিতে পারবে কি না। দ্বিতীয় তালিকায় যাদের নাম আসেনি, তারা ৩০ আগস্ট থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তালিকাভুক্তির জন্য দাবি জানাতে পারবেন। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে ৩১ ডিসেম্বর।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাদ পড়াদের প্রতি আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এনআরসি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আইনি অধিকার এবং সুযোগ সুবিধা চালু থাকবে।

সিং নয়াদিল্লীতে বলেন, “এটা খসড়া মাত্র, চূড়ান্ত তালিকা নয়। এই তালিকার ভিত্তিতে কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে না। কারোর আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কিছু মানুষ খামাখা আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করছে”।

আসামই ভারতের একমাত্র রাজ্য যেখানে ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আগত অভিবাসীদের নিয়ে কয়েক দশক ধরে যে সঙ্ঘাত ও সহিংসতা চলে আসছে, সেগুলোর প্রেক্ষিতেই এখানে এই তালিকা তৈরি হয়েছে।

রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং সেনসাস কমিশনার অব ইন্ডিয়ার অধীনে রাজ্যের কর্মকর্তারা এই তালিকা তৈরির কাজ করছে। সেনসাস কমিশনার অব ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি বিভাগ। সুপ্রিম কোর্টের আদেশে এই তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আদালত বিষয়টির উপর গভীর নজরও রাখছে।

বাংলাদেশ থেকে আগত জনগোষ্ঠিকে ‘জনসংখ্যাগত আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

বাংলাদেশ সব সময় ভারতে তাদের জনবল প্রবেশের অভিযোগ নাকচ করে এসেছে।

যদিও প্রাথমিকভাবে আসামের জন্য তালিকা করা হচ্ছে, কিন্তু ভারতের অন্যান্য যে সব রাজ্যে বাংলাদেশী অভিবাসী রয়েছে, তারাও এনআরসি তৈরির দাবি জানিয়েছেন।

এনআরসির দ্বিতীয় খসড়া প্রকাশে রাজনৈতিক শোরগোল শুরু হয়েছে। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরোধী দলগুলো পার্লামেন্টে এই তালিকা প্রকাশের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।

বিরোধীদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং অন্যান্য দলগুলো এনআরসি নিয়ে আলোচনার দাবিতে পার্লামেন্টের কার্যপ্রণালীতে বারবার বাধা দেন। ফলে ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার কার্যক্রম সোমবার স্থগিত করতে হয়। তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিচালনা করছে। ভারতের যে রাজ্যগুলোতে বিজেপি ক্ষমতায় নেই, সেগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় বিরোধী দলগুলো কার্যক্রমে বাধা দেয় এবং পার্লামেন্ট থেকে ওয়াক আউট করে।

পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, বাঙ্গালি ও বিহারীদের আসাম থেকে বের করে দেয়ার ষড়যন্ত্র হিসেবে এনআরসি প্রকাশ করা হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গে আগামী রাজ্যসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে বিজেপি। তারা উল্টা পশ্চিমবঙ্গেও এ ধরনের এনআরসি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের প্রেসিডেন্ট দিলীপ ঘোষ বলেছেন, “শুধু আসামেই যদি ৪০ লাখ মানুষ পাওয়া যায়, পশ্চিমবঙ্গে তাহলে কোটি লোক পাওয়া যাবে। বিজেপি যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে পশ্চিম বঙ্গেও এনআরসি তৈরি করা হবে”।

২০১৬ সালের আগে ১৫ বছর ধরে আসামের ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। তারা অভিযোগ করেছে, ভোটের সুবিধার জন্য বিজেপি জনগণের মধ্যে বিভাজন তৈরি করছে।

আসাম রাজ্যের কংগ্রেস দলের প্রধান রিপুন বোরা এনআরসিকে বিজেপির রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাজ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এই দলটি বিভাজনের রাজনীতি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বোরা বলেন, “৪০ লাখ মানুষ অনেক। আমি এটা বুঝতে অক্ষম কিভাবে এত বিশাল সংখ্যক মানুষ এনআরসির দ্বিতীয় খসড়া থেকে বাদ পড়লো”।

নয়াদিল্লীতে কংগ্রেস দলের মুখপাত্র আনন্দ শর্মা এনআরসি নিয়ে নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এবং কোন ভারতীয় নাগরিক যেন তালিকা থেকে বাদ না পড়ে, সেজন্য তৎপর হওয়ার জন্য বিরোধী দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

“এনআরসি বিষয়টির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে। কারণ বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলবে এটি। তাছাড়া এখানে আন্তঃরাজ্য স্বার্থও জড়িত রয়েছে”।

এনআরসি তৈরির জন্য যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, তার কড়া সমালোচনা করেছে কংগ্রেস। এই প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তারা।

১৯৭৯ সালে ছাত্র হিসেবে বিদেশী-বিরোধী আন্দোলন শুরু করেছিলেন প্রফুল্ল কুমার মাহান্ত। তিনি বলেন, “এটা স্পষ্ট যে, কংগ্রেস এনআরসি চায় না। তারা বিদেশীদের অবৈধ ভোটের উপর নির্ভর করে। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ না হলে, এখানে কোন এনআরসিই হতো না”।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মাহান্ত অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (এএএসইউ) প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছর আন্দোলন করেছে এই সংগঠন। বিক্ষোভকারীদের সাথে সরকারের চুক্তির মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনের ইতি ঘটে। এই চুক্তি অনুসারে আসামে বিদেশীদের চিহ্নিত করা, ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেয়া এবং তাদেরকে ভারত থেকে বের করে দেয়ার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে সরকার।

এএএসইউ এক বিবৃতিতে বলেছে, “আসামের জন্য এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। আদিবাসীদের এখানে ছয় বছর ধরে আন্দোলন করতে হযেছে। এবং এরপর চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ৩২ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। চূড়ান্ত এনআরসি যখন প্রকাশিত হলো, এক ধাপের কাজ শেষ হলো মাত্র। দুটো ধাপের কাজ এখনও রয়ে গেছে”।

ছাত্র সংগঠনটি এবং অন্যান্য স্থানীয় গ্রুপগুলোর মতে, পরবর্তী পদক্ষেপ হলো আসামে চূড়ান্ত এনআরসি অনুযায়ী নির্বাচনী ভোটার তালিকা সংশোধন করা এবং যারা বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এর পরে কি হবে?

যারা চূড়ান্ত বিচারে নাগরিকত্ব হারাবে, তাদের নিয়ে আসাম ও ভারত সরকার কি করবে?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যায় প্রত্যাবাসন করা একটি কঠিন কাজ।

গত রোববার আসামের বিভিন্ন আটকাকেন্দ্রে আটক ৫২ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। দুই দেশই যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে এদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাদেরকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

প্রভাবশালী আসাম ট্রিবিউন পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, “এতে বোঝা যাচ্ছে বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এবং দুই দেশের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো সম্ভব”। সম্পাদকীয়তে ভারত সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে যাতে তারা “অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত নেয়ার জন্য বাংলাদেশের উপর ইতিবাচক উপায়ে চাপ দেয়া অব্যাহত রাখে”।