• সোমবার, ২২ অক্টোবর ২০১৮, ৭ কার্তিক ১৪২৫, ১১ সফর ১৪৪০
BK

ছিটমহল : ইতিহাসের পুনঃপাঠ

ছিটমহল : ইতিহাসের পুনঃপাঠ
সংরক্ষিত ছবি

দেশহীন মানুষের আবাসস্থল ছিটমহল (Enclave)। যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নিরপেক্ষ অঞ্চলের নামে বিগ্রহের কারণে এমনকি অপরাধীদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখার কৌশলে অবরুদ্ধ বিভিন্ন জনপদের সৃষ্টি করা হয়। ছিটমহল হলো রাষ্ট্রের এক বা একাধিক ক্ষুদ্র অংশ, যা অন্য রাষ্ট্র দ্বারা আবদ্ধ বা পরিবেষ্টিত। সেখানে যেতে হলে অন্য রাষ্ট্রের জমির ওপর দিয়ে যেতে হয় অর্থাৎ অন্য একটি দেশের মূল ভৌগোলিক সীমানার অভ্যন্তরে বিরাজমান জনপদ। যদি কোনো একটি জনপদ দুটি দেশ দ্বারা ঘেরা থাকে, তাহলে সেটা Exclave. যেমন- কালিনইনগ্রাদ বা রাশিয়ার Enclave নয় Exclave. কারণ এটি লিথুয়ানিয়া এবং পোল্যান্ড দুটি দেশ দ্বারা বেষ্টিত। সেখানে শুধু সাগরের মাধ্যমে প্রবেশ করা যায়। পর্তুগাল স্পেনের ছিটমহল নয় অথবা গাম্বিয়া সেনেগালের।

ছিটমহল নানা ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক কারণে সৃষ্টি হয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের জন্য অনেক জায়গায় ছিটমহল সৃষ্টি হয়েছে। কিছু অঞ্চল এর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একখণ্ড মরুভূমি বা ওই অঞ্চলে কোনো জলস্রোত দ্বারা সংযুক্ত থাকে। ফলে এ অঞ্চলগুলোতে মূল ভূখণ্ডের চেয়ে কোনো প্রতিবেশী দেশ দ্বারা সহজে প্রবেশ করা যায়। এ ধরনের অঞ্চলকে ব্যবহারিক ছিটমহল বলে। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে উত্তর-পশ্চিম কোণে স্পেনীয় গ্রাম ওয় ডেসিডিস, যা স্পেন থেকে পাহাড়ের কারণে বিচ্ছিন্ন। প্রতিবেশী দেশ অ্যানডোরা থেকেই কেবল এ গ্রামে প্রবেশ করা যায়।

আবার জাতিগত ছিটমহল হলো একটি বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে আরেকটি বৃহৎ সমাজ বা গোষ্ঠী। উদাহরণস্বরূপ- ঘেটো, লিটল, ইতালি, ব্যারিওস, চায়না টাউন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এ অঞ্চলগুলোর ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি ভিন্ন। সভ্যতার আদিতে রোমান সভ্যতার পথ ধরে রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রচলন হয়। সম্রাট জুলিয়াস সিজারের পালিত পুত্র বলদর্পী অক্টোভানের দোর্দণ্ড প্রতাপ ছিল। তিনি ‘অগাস্টাস-সিজার’ পদবির পরিবর্তে ‘ইম্পারেটর’ অর্থাৎ রাজ্যের প্রভু উপাধি গ্রহণ করে রাজ্য শাসন করেন। তার অত্যাচার-নির্যাতনে পাঠানো দেশে চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এমন হয় যে, জনগণ তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। তাকে যে স্থানে নির্বাসনে পাঠানো হয়, তা রোম সাম্রাজ্যের প্রান্তসীমাবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন অঞ্চল বা concentrate land হিসেবে পরিচিতি পায়। সম্ভবত এটাই পৃথিবীর প্রথম বিশেষ অবরুদ্ধ জনপদ বা ছিটমহল। ১৯১৫ সালে ম্যাক-মোহন ও শরীর হোসেনের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিতে প্যালেস্টাইন আরব রাষ্ট্রের বাইরে আন্তর্জাতিক এলাকা বা ছিটমহল হিসেবে অনিষ্পত্তি অবস্থায় রেখে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের জন্য পরাশক্তির দুরভিসন্ধি বাস্তবে রূপলাভ করে। ‘হাইফা’ ও ‘আকরা’কে ব্রিটিশ বন্দর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তার পরের ঘটনাপ্রবাহ আমরা জানি।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, আজ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিরা নিজ ভূমে পরবাসীর মতো জীবনযাপন করছে। আরেকটি মজার তথ্য হলো, গোয়া ছিল ঐতিহাসিক ছিটমহল। ১৫০০ সাল থেকে পর্তুগিজ ভারতের রাজধানী ছিল গোয়া। ১৬৬১ সালে পর্তুগিজ রাজকুমারী ক্যাথরিনের সঙ্গে ব্রিটিশ রাজপুত্র দ্বিতীয় চার্লসের বিয়ে হয়। বিয়েতে চার্লসকে যৌতুক দেওয়া হয় মুম্বাই। সেই থেকে ব্রিটিশ-পর্তুগিজ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। ছিটমহল, দামান, দিউ দাদরা, নগর, হ্যাভেনিসহ গোয়া যুদ্ধের মাধ্যমে ভারতের অধীনস্থ হয়। সামন্তবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কূটকৌশল ও জিদের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে তথাকথিত নিরপেক্ষ অঞ্চল এবং করদ রাজ্যের ধারণা ছিটমহলের উদ্ভব ঘটিয়েছে। প্রভুত্ব, প্রবঞ্চ, সাম্রাজ্যবাদ, বশ্যতা ইত্যাদি অণুঘটক হিসেবে সক্রিয় ছিল।

 

প্রাচীন নগর রাষ্ট্র থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায়ও এর পরিব্যাপ্তি লক্ষ করা যায়। উল্লেখ করা যেতে পারে, ছিটমহলের বৈশিষ্ট্য ভ্যাটিকান সিটির অবস্থান হয়েও তা সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। গ্রিনল্যান্ডের ছিটমহলের সমস্যা ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে সমাধান করা হয়। চিলি ও আর্জেন্টিনার উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ছিটমহল বিউগল আইল্যান্ডের সমস্যা বহু যুদ্ধবিগ্রহের পর নিষ্পত্তি হয়। পাক-ভারত উপমহাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এলাকা ছিল হিমালয়ের পাদদেশ, নেপাল, ভুটান, দার্জিলিং, পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) উত্তরাঞ্চল ও আসাম সংলগ্ন এলাকার চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশ, নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। মাটির নিচে অফুরন্ত খনিজসম্পদ আর কৃষিক্ষেত্রে উর্বরতায় সমৃদ্ধ এ অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশবিভাগের পর হিজিবিজি সীমান্ত রেখায় এ অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহল বিধ্বস্ত বলয়ে আবদ্ধ রেখে এই জনপদকে অকার্যকর জনপদে আবদ্ধ রেখে পর্যবসিত করা হয়। কুড়িগ্রামে ভারতের ছিল দাশিয়ারছড়া ছিটমহল। এর ভেতরেই ছিল চন্দ্রখানা নামে বাংলাদেশের ছিটমহল। এটি পৃথিবীর একমাত্র ছিটমহল ছিল, যার অভ্যন্তরে অন্য দেশের আরেকটি ছিটমহল।

আরেকটি সূত্রমতে, কোচবিহারেও সম্ভবত বাংলাদেশের ছিটমহল ছিল আবার এর ভেতরে ছিল ভারতের ছিটমহল। তিস্তার পাড়ে কোচবিহারের রাজা এবং রংপুরের মহারাজার মধ্যে দাবা, তাস ও পাসা খেলায় বাজির পুরস্কার হিসেবে এই এলাকাগুলো আদান-প্রদান হতো। ফলে কোচবিহার এবং রংপুর একটির ভেতর অপরটির কিছু অংশ ঢুকে যায়।

১৯৪৭ সালে লর্ড মাউন্টব্যাটেন বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমানা রেখা টানার পরিকল্পনা করেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র্যাডক্লিফকে প্রধান করে সে বছরই গঠন করা হয় সীমানা নির্ধারণ কমিশন। ওই বছরের ৮ জুলাই লন্ডন থেকে ভারতে এসে মাত্র ৪০ দিনে অর্থাৎ ১৬ আগস্ট তিনি সীমান্ত নির্ধারণী চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। ১৬ আগস্ট জনসমক্ষে তা প্রকাশিত হয়। সীমানারেখা আঁকার সময় তিনি বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করেননি। যেমন পরস্পরবিরোধী পরামর্শক, সেকেলের মানচিত্র এবং ভুলে ভরা আদমশুমারির তথ্য। ভারত ছেড়ে যাওয়ার আগে তার কাজের যাবতীয় দলিলপত্র তিনি পুড়িয়ে ফেলেন এবং বলেন, ‘৮ কোটি মানুষ চরম দুঃখ-দুর্দশা ও অভিযোগ নিয়ে আমাকে খুঁজবে। আমি চাই না তাদের সঙ্গে আমার দেখা হোক।’ বিভাজনের কারিগর আর কখনোই ভারত বা পাকিস্তানে ফিরে যাননি। ফলে সীমানারেখা অনেক স্থানে ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের ভেতর অর্থাৎ একে অন্যের দখলে পড়ে, যাকে অপদখলীয় ভূমি বলা হয়। দীর্ঘ ৬৮ বছরে ছিটমহলগুলো ছিল উভয় দেশের অপরাধীদের অভয়ারণ্য। বাস্তবে তারা ছিল নিজ দেশেই পরবাসী। নিজ দেশের পরিচয় দিলেও তারা অন্য দেশের ভেতরে থাকা নাগরিকত্বহীন এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন এক ধরনের বাসিন্দা। ইতিহাসের পাতায় তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে। শান্তিতে না ঘুমানোর বর্ণনা, বিকালেই খাওয়া-দাওয়া সেরে সবাই চলে যেত জঙ্গলে। না হলে ঘরের সম্পত্তি, মেয়ে, বউ লুট হবে অথবা বাড়িতে ঢুকে মেয়েদের হাত ধরে টেনে নিয়ে যাবে। ছিটমহলবাসীদের মধ্যে কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় ছেলে-মেয়েদের পরিচয় গোপন রেখে পড়াশোনা করাতো কিন্তু নাগরিকত্বের অভাবে ওই শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা অর্থাৎ চাকরি পেত না। হাসপাতালে ডাক্তাররা তাদের পরিচয় জানতে পারলে তাদের চিকিৎসা দিতেন না, বলতেন দুদিন পরে এসো। সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও মৌলিক অধিকার থেকে তারা ছিল বঞ্চিত। ১ নং দহলা খাগড়াবাড়ি ছিটমহলের একজন বাসিন্দার খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অসহায় ছিটমহলবাসীর আবেদন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদাধিকারী বিভিন্ন ব্যক্তি এবং কোচবিহার জেলার প্রশাসনিক পদাধিকারীদের পাঠানো হয়েছিল কিন্তু বিচার হয়নি। দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহল ও দক্ষিণ বেরুবাড়ী সম্পর্কে অনেকেরই জানা। এই ছিটমহল দুটি বাংলাদেশের কিন্তু চারদিকে ভারত। ফলে এখানে থাকা লোকজন মাত্র একটি করিডোর তিনবিঘার (১৭৮ বাই ৮৫ মিটার) জন্য বন্দি ছিল।

১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হলেও ছিটমহলসহ তিনবিঘার সমাধান হয়নি। ১৯৫৮ সালে নূন-নেহরু চেষ্টা করেও ভারতের উচ্চ আদালতের আদেশের কারণে এগুলো আলোর মুখ দেখেনি। তিনবিঘার বিনিময়ে ভারত ১২ নং দক্ষিণ বেরুবাড়ী ইউনিয়নের দক্ষিণের অর্ধাংশ এবং সংলগ্ন এলাকার দখল পায়। কিন্তু করিডোর ভারত দেয়নি। কথা ছিল উভয় দেশ নিজ নিজ সংসদে চুক্তি অনুমোদন করবে। বাংলাদেশ অনুমোদন করলেও ভারত তা করেনি। ১৯৯০ সালে ভারতীয় উচ্চ আদালত তিনবিঘা করিডোর ব্যবহারের অনুমতি দেয়। দিনের বেলা এক ঘণ্টা পরপর মোট ছয় ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশকে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তা খুলে দেওয়া হয়। বহুদিন পর ১৯৯২ সালের ২৬ জুন এই করিডোরটি ইজারা দেয়। ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি করলেও ভারত তা কার্যকর করেনি। ১৯৯৬ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির সূত্র ধরে বর্তমান সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। ২০১১ সালে সীমান্ত চুক্তির ফলে সই হয় প্রটোকল। মোদি সরকার বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ভারতের সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করে। ২০১৫ সালে স্থল সীমান্ত চুক্তি (ছিটমহল বিনিময়) ৩১ জুলাই ২০১৫-তে তা কার্যকর হয়। বাংলাদেশ পায় লালমনিরহাটে ৫৯টি, পঞ্চগড়ে ৩৬টি, কুড়িগ্রামে ১২টি, নীলফামারীতে ৪টিসহ মোট ১১১টি ছিটমহলের মোট ১৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৬৩ একর জমি এবং প্রায় এক লাখ লোক। ভারত পায় কোচবিহারে ৪৭টি, জলপাইগুড়িতে ৪টিসহ মোট ৫১টি, ৭ হাজার ১১০ দশমিক ০২ একর জমি এবং জনসংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। অপদখলীয় জমি অর্থাৎ জোর করে দখলে রাখা বাংলাদেশ পায় ২ হাজার ২৬৭ দশমিক ৬৮ একর এবং ভারত পায় ২ হাজার ৭৭৭ দশমিক ৩৮ একর জমি। তিনবিঘা করিডোর চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকল। দীর্ঘ ৬৮ বছর পর ওই ছিটমহলগুলো আজ বাসযোগ্য। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, আকাশ সংস্কৃতি, বিদ্যুৎ সংযুক্তিসহ আধুনিক রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা তাদের কাছে স্বপ্ন নয়, বাস্তবে দৃশ্যমান হচ্ছে। এই অসম্ভব কাজটি সমাধান হওয়ায় ভারত ও বাংলাদেশ সরকারপ্রধানের নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। এই ছিটমহল বিনিময় স্থল সীমান্ত চুক্তি সারা বিশ্বের কাছে আজ রোল মডেল। সদ্যবিলুপ্ত (নতুন মানচিত্র) সীমান্ত চুক্তি কার্যকর হওয়ায় আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ১ আগস্ট ২০১৫ সাল থেকে ওই দিনটিকে বিজয় দিবস হিসেবে পালন করছে আর মনে মনে বলছে, ‘আর নয় ছিটমহলবাসী- আমরা সবাই বাংলাদেশি’।

মো. কায়ছার আলী

শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

kaisardinajpur@yahoo.com