• সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
BK

নিষ্পাপ জীবনের সওগাত পবিত্র হজ

নিষ্পাপ জীবনের সওগাত পবিত্র হজ
সংরক্ষিত ছবি

হজ - ইসলামের ফরজ বিধান। সামর্থ্যবান ব্যক্তির অবশ্য করণীয় আমল। আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলামের অন্যতম খুঁটি। ধর্মের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে হজ স্তম্ভে।

হজ প্রাণের ধর্ম ইসলামের মৌলিক সংস্কৃতি। যে ঘরকে কেন্দ্র করে হজব্রত পালন করা হয় তা পৃথিবীর প্রথম ঘর। সৃষ্টির সূচনার আত্মপ্রকাশ হয়েছে কাবার পথ ধরে। পৃথিবী পাড়ার সুপ্রাচীন ও ঐতিহাসিক নিদর্শন পবিত্র কাবাঘর। এ ঘরের নির্মাতা মহান অধিশ্বর আল্লাহ। ঘরের ডিজাইনার স্বয়ং আমাদের প্রভু। সৃষ্টির প্রথম ভোর থেকে স্বমহিমায় জাগ্রত উদ্ভাসিত এবং মানব হূদয়ের দীপ্তিময় মিনার কাবাঘর। কাবা বরকতের ছবি। মন ভালো করা রবি। কাবা-সূচনার ঊষা থেকে আলোকোজ্জ্বল দিশারী মানবজাতির। মানব হূদয়ের। মোমিন হূদয় ছুটে চলে কাবার পানে। কাবার কথা মনে হলে মোমিনের ‘মন’ মনে থাকে না।

অর্থে স্বাবলম্বী ব্যক্তির জন্য কর্তব্য হজ পালন করা। হজকে উপেক্ষা করলে ব্যক্তির জীবনে ধ্বংস অনিবার্য। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর নির্মিত হয়েছে, তা বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারী। এতে অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন আছে। যেমন মাকামে ইবরাহিম। যে কেউ সেখানে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ। মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশে সে ঘরের হজ করা তার অবশ্য কর্তব্য। আর কেউ প্রত্যাখ্যান করলে সে জেনে রাখুক, নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশ্বজগতের মুখাপেক্ষী নন।’ (সুরা আল ইমরান, ৯৬-৯৭)

শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম যে পাঁচটি স্তম্ভের ওপর সুপরিচিত এবং দাঁড়িয়ে আছে- তাদের অন্যতম এই হজ। ভিত্তি ছাড়া যেমন সভ্য পাড়ায় কোনো কিছু নির্মিত হয় না, তেমনি হজ ছাড়া নির্মিত হয় না মোমিন হূদয়ে ভালোবাসার কাবাঘর। হজ যে ইসলামের খুঁটি এ কথা বাঙ্ময় হয়েছে রসুল (সা.)-এর একটি কথায়। তিনি বলেন, ‘ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পাঁচটি বিষয়ের ওপর। যথা- ১. এই মর্মে সাক্ষ্যদান- আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও রসুল। ২. যথাযথভাবে নামাজ আদায় করা। ৩. জাকাত প্রদান। ৪. হজ। ৫. রমজান মাসের রোজা পালন।’ (বুখারি ০৮)

হজ পুণ্য ও সফলতার আশিস। অর্জনের ঝুলি সওয়াবে টইটম্বুর করার মহাতিথি। জীবনকে সফলতার সাম্পানে চালানোর শুভক্ষণ। হজের সওয়াবে ভরা এ মৌসুমে রবের দরবারে হাজিরা দিতে পারলে জীবন সফল। শুভ্র পোশাকে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে কাবার বুকে চুমো দিয়ে ব্যক্তিজীবনকে করবে সাফল্যমণ্ডিত। হজ আদায়কারী ব্যক্তি বিরত থাকবে পাপ থেকে। অযথা কথা বলা থেকে। পাপ কাজ ও অযথা কথনের বাহুল্য থেকে বিরত থাকতে পারলে হাজির জীবন হবে পাপ পঙ্কিলতাহীন সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর মতো। প্রভাতে ফোটা প্রথম লাল গোলাপের মতো। বিশুদ্ধ মননের হাজির উপমা দিতে গিয়ে ইসলামের নবী বলেন, ‘যে ব্যক্তি হজ করল এবং হজরত অবস্থায় কথা ও কাজে পাপ থেকে বিরত রইল, সে হজ শেষে সেদিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে ঘরে ফিরবে যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল।’ (বুখারি ১৫২১, মুসলিম ১৩৫০)

প্রাণের নবীর আরেকটি হাদিসের কথা আরো বাঙ্ময় এবং সুস্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘কবুল হজের একমাত্র প্রতিদান বেহেশ্ত।’ (বুখারি ১৭৭৩, মুসলিম ১৩৪৯)

হজ আমাদের উভয় জীবনে দান করে সফলতা। করে মহিমান্বিত। জীবনের জমিনকে করে উর্বর। জীবন উদ্ভিদে বর্ষণ করে রহমতের বারিধারা। আখেরাতের জীবনে রয়েছে যেমন সওয়াবের ভান্ডার তেমনি দুনিয়ার জীবনে রয়েছে অর্থে বুকটান দিয়ে দাঁড়ানোর স্লোগান। দুনিয়ার রিজিকে এনে দেয় সমৃদ্ধি। দূর করে দেয় অভাব। অনটন। পার্থিব অপার্থিব জীবনের এই পুরস্কার ব্যক্তিকে বেঁধে দেয় কাবার কালো গিলাফের সুতোয় সুতোয়। হজের প্রতি মানবকে উৎসাহিত করে খোদার পয়গম্বর মোহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘তোমরা বরাবর হজ ও ওমরা করো। হাপর যেমন লোহা সোনা ও রুপার কলঙ্ক দূর করে ফেলে, হজ এবং ওমরাও তেমনি অভাব ও পাপ মুছে ফেলে। আর কবুল হজের একমাত্র পুরুস্কার হলো বেহেশ্ত।’ ( তিরমিজি ৮১০)

হজ মানুষকে শিক্ষা দেয় ভাতৃত্ব বন্ধনের। সহমর্মিতা প্রদর্শনের। তৃষিত হূদয়েরর পুষিত স্বপ্নকে নিয়ে বান্দা হাজির হয় তার প্রতিপালকের ঘরের সামনে। কালো গিলাফে আচ্ছাদিত জগতের শ্রেষ্ঠ ঘরের সামনে ঝুঁকে যায় তার মস্তক। হূদয় জায়নামাজ সিঞ্চিত হয় ভালোবাসায়। শুদ্ধতার শহরে শুভ্রতার মেলা বসে। মার্জিত শরীরে সাদা সাদা কাপড়। খোদার প্রেমে উপস্থিত সবার পোশাক এক ও অভিন্ন। তাদের লক্ষ্য রবকে খুশি করা। ভালোবাসার মালি হওয়া। শাশ্বত বিশ্বাস, পরিশুদ্ধ বাসনা আর মনের আকুলতা নিয়ে প্রতিদিন হাজির হয় কাবা প্রাঙ্গণে। প্রেমের কোমল দৃষ্টিতে ঘুরে ঘুরে দেখে শুদ্ধ ভালোবাসার ঘরকে। সেজদায় নাক কপাল উজাড় করে দেয় রবের জমিনে। মোনাজাতে মোনাজাতে প্রার্থনা করে মালিকের সন্তুষ্টির।

হজ ভালোবাসা প্রকাশের সদর দরজা। এখানে আগত সবার পোশাক, ভাষা, উচ্চারণ এক। সবাই সমস্বরে আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে হাজিরা দিচ্ছে উপস্থিতির। অভিন্ন ভাষায় ঘোষণা করছে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।’

আল্লাহর এই পবিত্র ঘর সবার জন্য অবারিত এবং সাদরিত। কোনো ব্যক্তি গোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ নয়। এই ঘরে আগত মানুষেরা আল্লাহর আমন্ত্রিত মেহমান। দয়া অনুগ্রহ ও ভালোবাসা দিয়ে আল্লাহ তাদের মেহমানদারী করেন। তার দাওয়াতে সাড়াদানকারী ব্যক্তির জীবনকে সজীবতা তরতাজা এবং চূড়ান্ত সফলতা দান করেন সব জীবনে।

যার ভালোবাসায় প্রেমিকের মন উথলে ওঠে, যার দর্শনে তৃষিত হূদয়ে আগুন জ্বলছে, সে খোদার দর্শনে ব্যগ্র ব্যক্তি যখন তাঁর ঘর দর্শন করে তখন অন্তর প্রশান্ত হয়। মাহবুবের পাঠানো পাথরে চুমো খেয়ে ব্যক্তি অনুভব করে বন্ধুর দেশের অপার ছোঁয়া। তাঁর প্রত্যাদেশে দৌড়ে যায় সাফা-মারওয়া। অবস্থান করে আরাফায় এবং মনে মনে প্রার্থনা করে রবের ভালোবাসার চিঠি।

বান্দার সরল বিশুদ্ধ প্রচেষ্টায়, মজনু হয়ে প্রেমের শহরে ঘুরে বেড়ানো এবং আল্লাহকে পাওয়ার বাসনায় তীব্র মন দেখে আল্লাহ খুশি হন। তাকে মাফ করে দেন। রহমতের শীতল চাদরে আবৃত করেন। আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী হজব্রত পালন করতে পারলে ব্যক্তি লাভ করে ক্ষমার জীবন। মানুষের কল্যাণকামী নবী মোহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘তুমি যখন হজ সমাপনকারীর সাক্ষাৎ লাভ করবে, তখন তাকে সালাম দেবে। তার সঙ্গে মুসাফাহ করবে এবং তার কাছে পাপ মোচনের দোয়া চাইবে তার ঘরে প্রবেশের আগে। কারণ সে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে ফিরে এসেছে। (মুসনাদে আহমদ, ৫৩৭১)

আল্লাহ আমাদের সব মুসলমানকে কাবা জিয়ারতের তৌফিক দান করুন।

রায়হান রাশেদ