• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ৮ মহররম ১৪৪০
BK
হিচহাইকিং

ইচ্ছা যেখানে বাস্তব হয়

 হিচহাইকিং করলে ট্রাক বা বাসের চালকরা কোনো খরচ নেন না। অর্থাৎ বিনা খরচে ভ্রমণ। বিনা খরচে এই ভ্রমণের জন্য কেবল ইচ্ছা থাকাটাই যথেষ্ট
ইচ্ছা যেখানে বাস্তব হয়

শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়, জানতাম। বিশ্বাস করতাম না। তারপরও ছোটবেলায় অনেক ইচ্ছা করেছি। ইচ্ছাগুলোকে বলেছি উপায় বের করে দিতে। তখন কোনো উপায় বের হয়নি। এখন আমার বড়বেলা চলছে। নতুন নতুন ইচ্ছা ডালপালা মেলছে। ছোটবেলার ইচ্ছাগুলো যেহেতু উপায় খুঁজে দেয়নি, এখনো দেবে না। তাই নতুন করে ইচ্ছাও করব না, এই সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়েই ফেলছিলাম; কিন্তু বাদ সাধলো হিচহাইকিং।

হ্যাঁ, হিচহাইকিং। এই লেখাটির বিষয় হিচহাইকিং। অদ্ভুত শব্দ। আমাদের কাছে খুব একটা পরিচিতও নয়। অভিধান ঘাঁটলে দেখা যাবে, ‘হিচ’ শব্দের অর্থ হলো বাগড়া দেওয়া, ঝাঁকি দেওয়া। অথবা সাময়িক ব্যাঘাত ঘটানো। আর হাইকিং মানে তো ভ্রমণ করা। তাহলে হিচহাইকিং শব্দের মানেটা কী দাঁড়াল?

‘ভ্রমণে বাগড়া দেওয়া’ নাকি ‘বাগড়া দিয়ে ভ্রমণ করা’?

‘হিচহাইকিং’ শব্দটির সঙ্গে বাগড়া দেওয়ার একটা কিছু যে জড়িয়ে আছে, সেটা নিশ্চিত। কারণ আমি যখন নিশ্চিত হয়ে ছোটবেলার ইচ্ছাগুলোকে দোষারোপ করছিলাম, তখনই এই লেখাটা বাগড়া দিয়ে বসল। লেখাটা লিখতে গিয়েই আমি বাধ্য হলাম ছোটবেলার ইচ্ছাগুলোর একটা তালিকা তৈরি করতে। তালিকা করার পর অবাক হলাম, আমার ছোটবেলার ইচ্ছাগুলোর ৯০ শতাংশই পূরণ হয়েছে। বড়বেলায় এসে এগুলোর উপায় বের হয়েছে এবং এখনো এসবের সুফল ভোগ করছি। ছোটবেলার একটি ইচ্ছা ছিল, একদিন আমার অনেক টাকা হবে, আমি গোটা দেশ ভ্রমণ করতে পারব।

এখন হিসাব মিলিয়ে দেখলাম, বাংলাদেশের প্রায় সবটাই আমার দেখা হয়ে গেছে। ঠিক যেমনভাবে দেখতে চেয়েছিলাম, সেভাবেই। আর এর জন্য টাকা-পয়সা খরচ হয়নি বললেই চলে। তাহলে ইচ্ছাকে খামোখা দোষারোপ করে লাভ নেই। আমার অনেক টাকা হয়নি সত্যি; কিন্তু টাকা হলে যা করতাম, তা কিন্তু হয়ে গেছে।

সুতরাং ধারণা পাল্টে গেল। এখন আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়। কাজে প্রমাণ পেয়েছি। আমাদের একটা ভ্রমণের দল আছে। নাম নিশিদল। নিশিতে ভ্রমণ করে। রাতের অন্ধকার মানেই মাথার ওপর বিপদ ঝুলে থাকা। ভাবছেন বিপদ মাথায় নিয়ে চলতে গেলে প্রতিরক্ষার অনেক আয়োজন রাখতে হয়! আর আয়োজন মানেই খরচাপাতির ব্যাপার। না, খরচাপাতিতে নিশিদলের সদস্যরা উদার নয়। দশ টাকা বাঁচাতে পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতে রাজি। আমরা কেবল জান পুঁজি করে ভ্রমণ করি। সঙ্গে বড়জোর লুঙ্গি-তোয়ালের মতো জরুরি কিছু জিনিস থাকে।

রাতে চলতে গেলে পরিবহন সঙ্কট হবে, এটাই স্বাভাবিক। আমরা রাস্তার পাশে দাঁড়ালাম। হঠাৎ হঠাৎ কিছু ট্রাক আসছে। আমরা হাত তুলছি কিন্তু থামছে না। গতি আরো বাড়িয়ে আমাদের পাশকেটে চলে যাচ্ছে। এরকম করে একটি-দুটি-তিনটি। এবং আরো কয়েকটি। কিন্তু একসময় একটি ট্রাক থামল। কথা হলো। আমরা বুঝিয়ে বললাম। প্রথ ম দিকে কিছুটা অবিশ্বাস থাকলেও পরে ওরা আমাদের বিশ্বাস করল। আমরা ট্রাকের ডালা বেয়ে পেছন দিকটায় উঠলাম। বিকট গন্ধ। বুঝতে পারলাম, গরুর চালান নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এই ট্রাকে। ট্রাক ছাড়ল, মধ্যরাতের বাতাস কেটে আমরাও এগিয়ে চললাম। যেখানে নামতে চাইলাম, সেখানেই আমাদের নামিয়ে দিলেন ট্রাকচালক। বিনিময়ে টাকা-পয়সা নিতে চাইলেন না। আমরাই জোর করে কিছু ধরিয়ে দিলাম।

খুব সম্ভবত আমরা ‘হিচহাইকিং’ শব্দটা কি, সেটা জানার কাছাকাছি চলে এসেছি। ওই যে আমরা সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে বাগড়া দিয়ে ট্রাকের গতি থামালাম। তারপর এই ট্রাকে করে ভ্রমণ করলাম। এটাকেই বলা হয় ‘হিচহাইকিং’। অর্থাৎ ‘বাগড়া দিয়ে ভ্রমণ করা’।

আমাদের দেশে এই শব্দটি খুব পরিচিত না হলেও পশ্চিমা দেশ এবং ইউরোপে এই ভ্রমণ পদ্ধতিটা প্রচলিত। আমরা তো জোর করে হলেও ট্রাকচালককে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়েছি। কিন্তু হিচহাইকিং করলে ট্রাক বা বাসের চালকরা কোনো খরচ নেন না। অর্থাৎ বিনা খরচে ভ্রমণ। বিনা খরচে এই ভ্রমণের জন্য কেবল ইচ্ছা থাকাটাই যথেষ্ট। এর মানে কী বলতে চাইছি, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন- ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়, এই কথাটা একেবারে কল্পনাপ্রসূত নয়।

এই উপায়টা কীভাবে হয়। এর জন্য প্রথমেই প্রস্তুত রাখতে হবে আপনার বুড়ো আঙুলকে। হিচহাইকিংয়ের প্রতীক হলো বুড়ো আঙুল। সড়কের পাশে সুবিধাজনক কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে বুড়ো আঙুল দেখালে যারা বোঝার তারা ঠিক বুঝে যাবেন। তবে আমাদের দেশে এখনই বুড়ো আঙুল দেখানোর ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। যারা ইউরোপ অথবা পশ্চিমা কোনো দেশে যাবেন, কিন্তু বিনা খরচায় ঘুরতে চান তারা এই সুযোগটা নিতে পারেন। যেসব চালকের ইচ্ছা হবে না, তারা আপনাকে দেখে গাড়ি থামাবে না। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন, দেখবেন দয়ালু কোনো চালক আপনার পাশে গাড়ি থামাবে এবং আপনাকে নিরাপদে তুলে নেবে।

চালকের সঙ্গে চলতে চলতে অনেক কিছুই হতে পারে। হতে পারে খারাপ কিছুও। ওই চালক আপনাকে ভয়ঙ্কর কোনো বিপদে ফেলতে পারে। আবার এমন অনেক প্রতারকও আছে, যারা হিচহাইকার সেজে গাড়ি ছিনতাই করে। এসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থাটা জরুরি। ওই চালকবন্ধুর মাধ্যমে অপরিচিত সেই জায়গায় আরো অনেক সহযোগিতাও পেতে পারেন। জানতে পারেন স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের কথা। পেতে পারেন থাকা কিংবা খাওয়ারও সুবিধা। গাড়িচালকরা নিজেদের দেশ দেখাতে পারলে খুশি হন। নিজেদের প্রিয় জায়গাগুলো দেখানোর জন্য সোজা না গিয়ে ঘুরপথে যেতেও দ্বিধা করেন না অনেকে। প্রতিবছর হাজার হাজার হিচহাইকার এভাবে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। মাটি ও মানুষের সঙ্গে পরিচিত হন।

হিচহাইকিং করে আপনি সবচেয়ে বড় যে সুবিধাটা পাবেন, সেটা হলো পয়সা বেঁচে যাওয়া। এ ছাড়া এটি পরিবেশবান্ধবও। হিচহাইকিং পরিবেশের বাড়তি দূষণ কমায়। আপনি যে গাড়িতে চড়েছেন, সেটি তো তার গন্তব্যে যেতই। ফলে বাড়তি দূষণের দায় আপনাকে নিতে হচ্ছে না। যানজটও কমে। কিছু কিছু দেশ আছে, সেখানে ভাড়া দিয়ে গাড়িতে চলার চেয়ে পর্যটকদের জন্য হিচহাইকিং করাই বেশি সুবিধা। তবে এর জন্য হাতে সময় রাখতে হবে। আপনি তো ভ্রমণে যাবেন অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্যই, মানুষের সঙ্গে মেশার জন্য। সেক্ষেত্রে সময় নিয়ে হিচহাইকিং করতে পারেন। তুরস্ক, আর্জেন্টিনা, চিলি ও উরুগুয়েতে এটি ব্যাপক প্রচলিত। এসব দেশে গাড়ির জন্য লাইনে দাঁড়ানোর চেয়ে বুড়ো আঙুল তুলে দাঁড়ালে দ্রুত গাড়ি পাওয়া যায়।

হিচহাইকিংয়ে ঝুঁকি ও আনন্দ দুটোই থাকে। এক্ষেত্রে একা হাইকিং করার চেয়ে দুইজন বা কয়েকজন মিলে করাটা বুদ্ধিমানের কাজ। সংবাদমাধ্যমে মাঝে-মধ্যেই হিচহাইকারদের ধর্ষণ হওয়ার খবর প্রকাশ হয়। শোনা যায় ডাকাতি ও রোমহর্ষক ঘটনার কথা। এসব নিয়ে কিছু ভৌতিক কাহিনীও প্রচলিত আছে। হিচহাইকিং নিয়ে তৈরি হয়েছে কিছু রোমাঞ্চ সিনেমাও। এতসব জেনেও হাইকাররা পথে বের হন। ভ্রমণ যার নেশা, ঘর তাকে আটকে রাখতে পারে না। অনেক মেয়েও একা পথে নেমে যান। তাদের নানা ধরনের বিব্রতকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখিও হতে হয়। একটা মেয়েকে যদি ফাঁকা সড়কে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, লোকজন তাকে অন্য দৃষ্টিতে দেখে, বাজে মন্তব্যও করে। কিন্তু সঙ্গে একজন পুরুষ থাকলে সেটা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। নিরাপত্তাও কিছুটা বাড়ে। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এখন অনেক হিচহাইকার গাড়িতে ওঠার আগেই এসএমএস পাঠিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের গাড়ির নাম্বার জানিয়ে দেয়। তাছাড়া গাড়ির চালককে যতটা সম্ভব পড়ে নেওয়া ভালো।

হিচহাইকিং প্রথম শুরু করেছিল সত্তরের দশকে মার্কিন কয়েকজন ছাত্র। এরা ইউরোপে গিয়ে খালি পকেটে যে ঢ্যাঙ-ঢ্যাঙ করে ঘুরে বেড়ানো যায়, সেটা কিছু লোককে শেখান। এদের সঙ্গে নিয়ে তারা তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান হয়ে ভারতে পর্যন্ত পৌঁছান। তাদের এই ভ্রমণপথটার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘হিপ্পি ট্রেইল’।

এখন সময় বদলে গেছে। অনেক দেশেই এটি প্রচলিত। কোনো গাড়িকে ইশারা করে বুঝিয়ে বলতে হয় না। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষও বদলেছে, রাজনীতি বদলেছে। পৃথিবীও অনেকটা জটিল হয়ে উঠেছে। কিন্তু হিচহাইকাররা সেই আগের মতোই আছে। তারা কেবল রাস্তার পাশে বুড়ো আঙুল পেছনে কাত করে দাঁড়িয়ে থাকেন।

অথচ আমাদের দেশে এখনো এর প্রচলন হয়নি। পাশের দেশ ভারতেও একই অবস্থা। তবে ভারতে পশ্চিমা অনেকে এসে কিন্তু হিচহাইকিং করে যান। পাকিস্তানের অবস্থা আরো কিছুটা উন্নত। সেখানেও সাধারণ লোকদের হিচহাইকিংয়ের সঙ্গে পরিচয় নেই। কিন্তু কেউ হিচহাইকিং করতে চাইলে তেমন সমস্যাও হয় না। কয়েকজন পর্যটক নিজেদের অভিজ্ঞতায় জানিয়েছেন, পাকিস্তানের চালকরা সহযোগিতা করেন। পাশাপাশি সতর্কও করেন। তারা জানিয়ে দেন, এবার আমার মতো ভালো চালক পেয়েছ বলে বেঁচে গেছ। পরে কিন্তু এই ঝুঁকিটা নেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু যারা ঝুঁকি নিতে অভ্যস্ত, তারা পরের বারও ঝুঁকি নেন এবং বেশিরভাগ হিচহাইকার নিরাপদেই হাইকিং করতে পারেন। বাংলাদেশের অবস্থাও তা-ই। আমরা নিশিদলের হয়ে যখন ভ্রমণ করতে যাই, সবাই সতর্ক করেন পরেরবার যেন এমন ঝুঁকি না নিই, উপদেশ দেয়। সবিনয়ে তাদের উপদেশ গ্রহণ করি। কিন্তু পরেরবার আবার একইরকম ঝুঁকি নিই। ঝুঁকি নিতে নিতে কিছু বিপদেও পড়ি। তারপরও ঝুঁকি নিই, কেবল রোমাঞ্চকর কিছু অভিজ্ঞতার জন্য।