• মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫, ২৩ সফর ১৪৩৯
BK

ঝিঁঝিঁ পোকা শুধু খাবার নয় অন্ত্রের দাওয়াই

ঝিঁঝিঁ পোকা শুধু খাবার নয় অন্ত্রের দাওয়াই
সংগৃহীত ছবি

খাওয়ার সময় পাতে পোকা দেখলেই অনেকের খাবার রুচিই চলে যায়। খাবার বদল করলেও খেতে পারেন না। আসলে আমাদের চারপাশে যত ধরনের প্রাণী আছে, তার সবগুলো সম্পর্কে আমাদের ধারণা না থাকার কারণেই এমনটা হয়। এ ছাড়া সংস্কৃতিভেদে মানুষের খাদ্যাভ্যাসও পোকামাকড় খাওয়ার বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ইতোমধ্যে ১৯০০ প্রজাতির পোকামাকড় খাদ্য হিসেবে একশ’র বেশি দেশে মানুষের প্লেটে জায়গা করে নিয়েছে। আদিবাসী, শহুরে রেস্তোরাঁ মিলিয়ে পৃথিবীর প্রায় ২০০ কোটি মানুষ তাদের প্রতিদিনের তালিকায় রাখছেন কোনো না কোনো পোকামাকড়। কারণ আমাদের চারপাশে যত ধরনের খাবারযোগ্য পোকামাকড় আছে, তাদের শরীরে আছে প্রচুর পরিমাণ আমিষ, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ। তাই পোকামাকড় কীভাবে আরো বেশি পরিমাণে খাওয়ার যোগ্য করা যায়, সে বিষয়ে চিন্তা করারও আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা।

গবেষকদের দাবি, আমাদের চারপাশে চেনা-অচেনা যত পোকামাকড় আছে, তার বেশিরভাগই মানুষের জন্য সহায়ক। এর সবগুলোই জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে। আবার কোনোটা খাবার হয়েই সহায়তা করে আমাদের, সহায়তা করে প্রাকৃতিক ওষুধ হয়েও। যেমন, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঝিঁঝিঁ পোকা খাওয়া অন্ত্রের জন্য বেশ ভালো।

ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের এক পিএইচডি গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য। বিজ্ঞান ও গবেষণা বিষয়ক পত্রিকা সায়েন্স ডেইলিতে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত এক নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, ক্রিকেট পোকা বা যাকে আমরা ঝিঁঝিঁ পোকা নামে চিনি তা খাওয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ভালো। গবেষণার আওতায় পরিচালিত একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, ঝিঁঝিঁ পোকা খেলে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তবে বেশি মাত্রায় এই পোকা খাওয়া যে নিরাপদ নয়, সে তথ্যও জানা গেছে ওই ট্রায়ালে। শুধু তা-ই নয়, এই ট্রায়ালে আরো জানা গেছে, পরিমিত ঝিঁঝিঁ পোকা খেলে শরীরের অভ্যন্তরে প্রদাহ অনেক কমে। বিশ্ববিদ্যালয়টির নেলসন ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ওই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মূলত খতিয়ে দেখা হয় যে, ঝিঁঝিঁ পোকা খেলে মানুষের মাইক্রোবায়ামের বা অন্ত্রের উপকারী অণুজীবের ক্ষেত্রে কী ঘটে?

গবেষকরা দেখেন, যারা ঝিঁঝিঁ পোকা খেয়েছেন তাদের অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়া জন্মেছে তুলনামূলক বেশি। তবে যারা মাত্রাতিরিক্ত ঝিঁঝিঁ পোকা খেয়েছেন, তাদের অন্ত্রের জন্য সেটা যে ভালো ফল বয়ে আনেনি, সে বিষয়টিও এই ট্রায়ালে উঠে আসে। গবেষকদের একজন অধ্যাপক টিফানি ওয়াইর বলেন, এ গবেষণাটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সম্প্রতি বিশ্বজুড়েই পোকামাকড় খাওয়ার এক চল শুরু হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের অনেকেই বিকল্প খাবার হিসেবে পোকামাকড়ে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। এ অবস্থায় সেটা স্বাস্থ্যগত বিষয়টিতে গুরুত্ব সহকারে নজর দেওয়ার সময় এসেছে। এ বিষয়ে আরো গবেষণার প্রয়োজনীয়তা যখন একান্ত প্রয়োজন, তখনই সবচেয়ে পরিচিত খাদ্য হিসেবে ব্যবহূত ঝিঁঝিঁ পোকা নিয়ে এই গবেষণাটি করা হয়েছে। তিনি বলেন, অন্ত্রের মাইক্রোবায়াম ও মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে যে সম্পর্ক আছে, সে বিষয়েই এই গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাতে দেখা গেছে, ঝিঁঝিঁ পোকা খাওয়া মাইক্রোবায়ামের জন্য দারুণ উপকারী। এটি শুধু মানুষের শরীরে পুষ্টিই সরবরাহ করবে না, একই সঙ্গে মাইক্রোবায়ামের জন্য হরমন হিসেবেও কাজ করবে। কারণ এই পোকার শরীরেও অন্যান্য পোকামাকড়ের শরীরের মতো এক ধরনের ফাইবার আছে। শাকসবজি বা ফলমূলে এই ফাইবার নেই। আর ফাইবারটিই অন্ত্রে বাস করা মাইক্রোবায়ামের জন্য ভালো খাবার হিসেবে কাজ করে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে গবেষকরা টানা দুই সপ্তাহ ধরে ১৮ বছর থেকে ৪৮ বছর বয়সের ২০ জন নারী ও পুরুষকে তাদের সকালের নাশতায় ঝিঁঝিঁ পোকার পাউডার খেতে দেন। অন্যান্য খাবারের সঙ্গে ২৫ গ্রাম পরিমাণ পাউডার গ্রহণ করেন গবেষণায় অংশ নেওয়া ওই নারী-পুরুষরা। তবে পরের দুই সপ্তাহ তারা স্বাভাবিক খাবারই গ্রহণ করেন। গবেষকরা অংশগ্রহণকারীদের মল ও রক্ত সংগ্রহ করেন। ঝিঁঝিঁ পোকা খাওয়ার সময়কার আর স্বাভাবিক খাবার খাওয়ার সময়কার মল ও রক্ত পরীক্ষা করে তারা এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, ঝিঁঝিঁ পোকা খেলে মাইক্রোবায়াম বেড়ে ওঠার ভালো পরিবেশ পায়। শুধু তা-ই নয়, গবেষকরা দেখেন এ সময়ে অংশগ্রহণকারীরের পরিপাকতন্ত্রেও কোনো ধরনের খারাপ প্রভাব পড়েনি। তবে এ সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে আরো গবেষণা করতে হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক টিফানি। পরবর্তী গবেষণায় যদি সত্যিই ঝিঁঝিঁ পোকা খাওয়ার উপকারিতার স্থির প্রমাণ মেলে, তবে সেটা হয়তো আমাদের জীববৈচিত্র্যের জন্যও সহায়ক হয়ে উঠবে। আমিষের উৎসব হিসেবে ঝুঁকির মুখে থাকা অনেক প্রাণীকে আর মানুষের খাবারের টেবিলে যেতে হবে না। কারণ ২০৫০ সাল নাগাদ মাংসের চাহিদা বর্তমানের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। তবে এই পরিমাণ মাংস উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষিজমি এবং প্রাণীখাদ্য তখন থাকবে কি-না তা একটি বড় প্রশ্ন। তাই এসব পোকামাকড়ই সে সময় আমিষের উৎস হিসেবে খাওয়া হবে।