• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪, ৮ মহররম ১৪৪০
BK

পোশাক শিল্পে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা মজুরির প্রস্তাব

 বিদেশি ক্রেতাদেরও দায় রয়েছে : রেহমান সোবহান দ্বৈতনীতি অবলম্বন করছে আইএলও : শ্রম প্রতিমন্ত্রী
পোশাক শিল্পে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা মজুরির প্রস্তাব
সংরক্ষিত ছবি

পোশাক শিল্পে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ২০ টাকা নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে শ্রমিকপক্ষ। অন্যদিকে মালিকপক্ষ দিতে চাইছে ৬ হাজার ৩৬০ টাকা। যদিও বেশকিছু শ্রমিক সংগঠন ১৬ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছে। এ অবস্থায় পোশাক শিল্পে সর্বনিম্ন মজুরি ১০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। পোশাক শ্রমিকদের জীবিকা পরিস্থিতি ও ন্যূনতম মজুরি শীর্ষক ডায়ালগে এমন প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গতকাল রোববার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে সিপিডির আয়োজনে ডায়ালগটি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু। সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং পোশাক খাতের  উদ্যোক্তা ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

অনুষ্ঠানে রেহমান সোবহান বলেন, পোশাক শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ক্রেতাদেরও দায় রয়েছে। এখানে শুধু মালিকদের দায় দিলে হবে না। পাঁচ ডলারে একটি পোশাক কিনে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে তা ২০ ডলারে বিক্রি করে। মাঝের এই ১৫ ডলার চলে যায় বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের পকেটে। এ বিষয়ে আরো আলোচনা করতে হবে। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে তাদেরকেও দায় নিতে হবে। শ্রমিকদের বাস্তবভিত্তিক বেতনের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন (আইএলও) সব সময় দ্বৈতনীতি অবলম্বন করে থাকে। ক্রেতাদের বিষয়ে তারা কিছুই বলতে পারে না। তাদের সব নজরদারি শুধু শিল্প মালিকদের ওপর। তারা নিরাপত্তা নিয়ে শুধু কথা বলে। পোশাকের দাম বাড়ানোর বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বলা হলে তারা পিছিয়ে যায়।

মূল প্রবন্ধে গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, অঞ্চল ভেদে পোশাক শ্রমিকদের ব্যয়ে তারতম্য রয়েছে। ঢাকার বাইরে গাজীপুরে জীবনযাত্রার ব্যয় সবচেয়ে বেশি। আর ঢাকার ভেতরেও ব্যয়ের ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। তাই মিরপুর আর তেজগাঁওয়ের শ্রমিকের বেতন এক হওয়া ঠিক নয়। বিদ্যমান মজুরি কাঠামোর ৭ গ্রেড থেকে ৬ গ্রেডে নামিয়ে এনে ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার ২৮ টাকায় নির্ধারণের প্রস্তাব দেন তিনি। তিনি এ সময় বলেন, শ্রমিকদের বাড়ি ভাড়াই সবচেয়ে বড় ব্যয় নয়। সন্তানদের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যেও তাদের বেতনের বড় অংশ চলে যাচ্ছে। মূল প্রবন্ধে আরো বলা হয়, পোশাক খাতের ৮৬ শতাংশ শ্রমিক এখনো টয়লেট শেয়ার করেন। ৮৫ শতাংশ শ্রমিক রান্নাঘর শেয়ার করেন। ৪০ শতাংশ শ্রমিকের ঘরে কোনো টেবিল নেই। ৪৪ শতাংশ শ্রমিকের ঘরে চেয়ার নেই। মাত্র ৫ শতাংশ শ্রমিক বেতন পান মোবাইল বা ব্যাংকিং চ্যানেলে। আলোচনায় বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বেতন নির্ধারণে শ্রমিকদের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের সামর্থ্যের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। এমন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে, যেন মালিকের সক্ষমতা ও শ্রমিকের ন্যায়তা দুটাই হয়। শ্রমিক সংগঠনগুলোর জোট বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, সিপিডি থেকে শ্রমিকদের মজুরির সুপারিশ করা অযৌক্তিক। মজুরি নিয়ে প্রস্তাবনা দেওয়া সিপিডির কাজ নয়। মজুরি বোর্ডে এ বিষয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে। দুই পক্ষ আলোচনা করছে।

গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কার্যকরী সভাপতি রুহুল আমিন বলেন, ১৬ হাজার টাকার দাবি নিয়েই কথা বলা উচিত। সাত মাসে মজুরি বোর্ডের মাত্র তিনটি বৈঠক হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

শ্রমিক নেতা বাবুল আক্তার বলেন, ১৬ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতেই শ্রমিকরা অটল আছেন। মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের প্রতিনিধি প্রকৃতপক্ষে শ্রমিক নেতা নন। তিনি আরো বলেন, মজুরি বোর্ডে কী সিদ্ধান্ত হবে তা বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে শেষ পর্যন্ত  প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হবে বলেও তিনি জানান।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের শুরুতে প্রথমবারের মতো মালিকদের প্রস্তাবে গঠন করা হয় ন্যূনতম মজুরি বোর্ড। পর্যালোচনা শেষে পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির বিষয়ে চূড়ান্ত প্রস্তাব জমা দিতে শ্রম মন্ত্রণালয় কমিশনকে ছয় মাসের সময়সীমা বেঁধে দেয়। কমিটি এ পর্যন্ত তিনটি বৈঠক করেছে। ইতোমধ্যে চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরি করতে নভেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়েছে কমিটি।

১৬ জুলাই বোর্ডের তৃতীয় সভায় ৬ হাজার ৩৬০ টাকা ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাব দেন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান।

একই সভায় মহিলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক বেগম শামসুন্নাহার ভূঁইয়া শ্রমিকদের পক্ষে ১২ হাজার ২০ টাকা ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাব দেন। এর আগে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড আর রানা প্লাজা ধসের পেক্ষাপটে শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকায় নির্ধারণের দাবিতে ২০১৩ সালে আন্দোলনে নামে। সরকার নির্ধারিত বোর্ড ১০টি সভা শেষে ওই বছরের নভেম্বরে ৫ হাজার ৩০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে।